Showing posts with label স্মৃতিকথন. Show all posts
Showing posts with label স্মৃতিকথন. Show all posts

Sunday, October 29, 2023

পুঁথি থেকে ই-বুক



এ পুঁথিগুলো জন্মাবধি দেখে আসছি। ঠাকুর্দার কাছেই প্রথম দেখি। ঠাকুর্দা, মানে স্বর্গীয় শ্রী সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, তাঁর বাবা স্বর্গীয় শ্রী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, এবং তাঁর বাবা স্বর্গীয় শ্রীরামচন্দ্র ভট্টাচার্যের আমলের এ পুঁথিগুলো। সংস্কৃতে মন্ত্রের পর মন্ত্র লেখা। ছোটোবেলায় এগুলোতে হাত দেওয়ায় আমাদের নিষেধ ছিল। ঠাকুর্দাই হাতে করে দেখাতেন। আমরা আলতো করে ছুঁতাম। আবার গুটিয়ে রাখা হত।

আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট দিন হিসাবে হার্পার কলিন্স একটা বিজ্ঞাপন দেয়, সেখানে লেখে যে ইন্টারনেট আসার পর থেকে একেকটা বাড়ি লাইব্রেরি হয়ে উঠছে।

কথাটা আমার বেশ লাগে। কারণ সত্যিই তো তাই। আজ যত না কাগজে ছাপা বই পড়ি, তার চাইতে বেশি পড়ি ইবুক। তাছাড়া বিভিন্ন বাংলা ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনে বই পড়ি। যেমন টেগোরওয়েব থেকে গোটা রবীন্দ্রনাথ, অদ্বৈত আশ্রম থেকে গোটা স্বামীজি, এমকে.ওআরজি থেকে গোটা মহাত্মা গান্ধী, ইবাংলালাইব্রেরি.কম থেকে বাংলার বহু সাহিত্যের বই…. ইত্যাদি ইত্যাদি। সত্যিই তো ইন্টারনেট আসার পর অনলাইনে শুধু কি বই? কাগজে ছাপা মড়মড়ে খবরের কাগজের বদলে ই-পেপারে গ্রাহক হচ্ছি।

পড়াটা থেমে থাকছে না। পুঁথি থেকে ই-বুকের রাস্তাটা তো বড় কম নয়। এখন আবার কথকের মত অডিওবুক-ও এসে গেছে। তবু নিজের মনে পড়াটার আরামই আলাদা। নইলে অন্যের আবেগের উপর নির্ভর করতে হয় খানিক। তবু সেও একরকম ভালো, বিশেষ করে যাদের পড়তে অসুবিধা আছে শারীরিক কারণে।

তবে শুধু গল্পটা তো পুঁথির থেকে ই-বুকের নয়। গল্পটা একটা সমাজেরও। সেও তো গড়িয়েছে অনেকটা রাস্তা। আমি তো এক্কেবারে পূজারী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেছি। ছোটোবেলাতেও দেখেছি বাবা, জেঠু সরকারি চাকরি করেন যদিও, কিন্তু ঠাকুর্দা পূজারীর কাজ করে চলেছেন। আসলে ওটাই তো তাঁর পরিচয়ও, শুধু তো পেশা নয়। ঠাকুর্দা দুর্গাপুজো, কালীপুজো করে শাড়ি, ধুতি নিয়ে আসতেন। শ্রাদ্ধশান্তি ইত্যাদিও করতেন। পৈতে, গীতা ইত্যাদি নিয়ে আসতেন। একটা ট্রাঙ্কই ছিল তাতে গীতা ভর্তি। ঠাকুর্দা ক'দিন পর বাড়ি ফিরলে আমি উৎসুক হয়ে দেখতে যেতাম কি এনেছেন। শাড়ি ঠাকুমা, কি মা-জেঠিমার মধ্যে ভাগ হয়ে যেত। কি কোনো আত্মীয়ের জন্য, কি কারোর দরকার, তাকে দেওয়ার জন্য ঠাকুমা তুলে রাখতেন। আমাদের ভাইবোনেদের জন্য বরাদ্দ হত মিষ্টি। একটু বড় হলে আমার নজরে আসত গীতা। বেশিরভাগই অবশ্য শুধুই সংস্কৃতে লেখা পাতলা বই। তবে একটা গীতা পেয়েছিলাম মনে আছে তাতে বাংলা অনুবাদ ছিল। সেটা বহুদিন আমার সঙ্গে ছিল।

জেঠু মারা যান আকস্মিক। তখন ঠাকুর্দা, ঠাকুমা বেঁচে। এমনকি দেশ ভাগ হওয়ার পর ঠাকুর্দার যে ভাই রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য'র হাত ধরে বাবা, জেঠু আর ঠাকুমা এদেশে আসেন, সেই তিনিও বেঁচে। আমরা ওঁকে ডাকতাম মণিকাকা দাদু। কারণ বাবা-জেঠু, মা-জেঠি সবাই যেহেতু মণিকাকা বলতেন, আমরা ডাকতাম মণিকাকা দাদু।

জেঠুকে যখন বাইরে শোয়ানো হয়েছে, বাড়িতে গিজগিজ করছে লোক। চারদিকে কান্নার হাহাকার। জেঠিমা, ঠাকুমা বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন। তখন ঠাকুর্দাকে দেখেছিলাম ছাদে ওঠার সিঁড়ির কয়েক ধাপ উপরে বসে গীতা পড়ছেন। চোখদুটো টকটকে লাল। আমি সামনে দাঁড়ালাম। ঠাকুর্দা আমার দিকে তাকালেন, চোয়ালদুটো শক্ত করে উচ্চারণ করলেন, বলো তো দাদু,

 

"ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন

নায়ং ভুত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ

অজ নিত্যঃ শ্বাশ্বতহয়োং পুরাণো

ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে"

 

আত্মার জন্ম হয় না, মরণ হয় না, আত্মা অবিনশ্বর, চিরকালের। দেহটাই নষ্ট হয়, আত্মা নয়।

সেই আমার গীতার সঙ্গে আত্মিক পরিচয়। সেদিন বুঝেছিলাম আস্তিক, নাস্তিকতার পারে মানুষের আরেকটা পরিচয় হয়, যেটা তার জীবন্ত বিশ্বাস। বৌদ্ধিক সমর্থন, বা বৌদ্ধিক অসমর্থনের বাইরে আরেকটা কিছু আছে, যা ভীষণ গভীরের, সেটা তার বিশ্বাসেরও গভীরে, সে তার সান্ত্বনা। সে তার মৃত্যুকে জয় করার স্পর্ধা!

জেঠুর শ্রাদ্ধ হচ্ছে, আমার এই মণিকাকাদাদুকে দেখছি চোখের জলে ভাসতে ভাসতে কলাগাছের গোড়া কেটে ডোঙা বানাচ্ছেন। আর বলছেন, দাদুভাই, যাকে হাতে ধরে মানুষ করেছি, এ দেশে এনে পড়াশোনা শিখিয়েছি, মিলে চাকরি তখন আমার, ক'টা টাকাই বা দিত, টিফিনের কেকটা পকেটে লুকিয়ে নিয়ে এসেছি, যাতে ওদের খেতে দিতে পারি, ওদের চাকরি হয়েছে, বিয়ে দিয়েছি… আজ এই কাজটাও আমাকেই করতে হবে!!….

আমি পাশে বসে বেহাল হয়ে কেঁদেছি। গীতার শ্লোক, ঠাকুমার বিহ্বল শূন্যদৃষ্টি, জেঠিমার ভাঙা শাঁখা, সিঁদুর মোছা কপাল, বাবার পাথরের মত বসে থাকা…. সব মিশে গিয়ে বুঝেছি জীবনের গভীরে একটা নদী আছে। অবিনশ্বর নদী। ভালোবাসা আর অনুকম্পার নদী। শত বিপদেও সে নদীর জল শোকায় না। তাই যে চলে গেছে তাকে ঘিরে এত আয়োজন করার আস্পর্ধা মানুষ দেখায়। এই তার ধর্ম। ভালোবাসাকে বর্ম পরিয়ে রাখার।

আমি বড় হয়েছি। আমার বিশ্বাস, অনুরাগ বদলেছে। একদিন পৈতে ছেড়েছি। কিন্তু একটা দিক দেখেছি আমাদের পরিবারে গোঁড়ামিটা কখনোই প্রধান সুর ছিল না জীবনযাত্রার। যে বছর জেঠু মারা যান, সেই বছর আমাদের ভাইফোঁটা হয়। ঠাকুমা বলেছিলেন বোনেরা ভাইদের মঙ্গলকামনা করবে, এর সঙ্গে অশৌচের সম্পর্ক কই?

মণিকাকাদাদু, মানে একটু আগে যার কথা বললাম, আমার ঠাকুর্দার ভাই, তাঁর নবাগতা পূত্রবধূকে বরণ করতে হবে। কেউ কেউ বিধান দিলেন আমার বিধবা জেঠিমা যেন না আসেন বরণ করতে। মণিকাকাদাদু বললেন, তবে বরণই হবে না। জেঠিমা এলেন, বরণ হল।

এরপর আরো দিন গেল। একে একে ঠাকুমা, ঠাকুর্দা, মণিকাকাদাদু, মা, ভাই….. সব গেল। আমার চারদিক শূন্য হতে হতে দিগন্ত ছুঁলো।

আজ আমার এক প্রাক্তন ছাত্র, তথা ভাই-বন্ধু যখন এই পুঁথির একটা একটা দড়ি খুলছে সকৌতুহলে, আমার জীবনেরও অনেকগুলো প্রাক্তন পাক খুলে সামনে এসে দাঁড়ালো। একটা কথাই মনে হল, সঙ্কীর্ণতা থেকে বড় ব্যর্থতা জীবনে আর কিছু নেই। অনেক পণ্ডিত, অনেক উচ্চপদস্থ মানুষ দেখলাম। সেই সঙ্গে তাদের অনেক ছলচাতুরীও দেখলাম। আস্তিক, বা নাস্তিকতা নয়, কথাটা সঙ্কীর্ণতা আর উদারতার। আস্তিকতার বিশ্বাসে গোটা জগত এক পরিবার হতে পারে। আবার সঙ্কীর্ণতায় বাড়ির উঠানই ম্লেচ্ছ হয়ে যায়। তেমনই নাস্তিকতার যুক্তির সংকীর্ণতায় দাসপ্রথাকেও গৌরবান্বিত করে তোলা যায়, পরিবেশের দফারফা করে দেওয়া যায় আবার যুক্তির উদারতায় মানবাধিকারের ভিত্তিও স্থাপন করা যায়।

কথাটা উদারতা, আর সঙ্কীর্ণতার। ভাগ্যের আশীর্বাদে এমন একটা পরিবারে জন্মেছি, সেখানে আমার তথাকথিত সার্টিফিকেটহীন ঠাকুমা থেকে শুরু করে আমার উচ্চ শিক্ষিতা মাকে একটাই সুরে জীবনকে বাঁধতে দেখেছি, যার মোদ্দা কথাটা হল --- সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই। তাই জেঠিমাকে বৈধব্যের অত্যচারে পড়তে হয়নি, আর আমাকেও ব্রাহ্মণ হওয়ার সুবাদে আমি যে অন্যদের থেকে শুদ্ধ, এ বিষ মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়নি। শিক্ষা পুঁথি থেকে ই-বুক হোক, যে মাধ্যমেই হোক, এই উদারতার আলোটাই যেন জ্বালিয়ে যায়। 





Thursday, July 13, 2023

ধবলী

 


ঠাকুমা, তোমার মনে আছে, তুমি সেই গ্রামের বন্যার গল্প বলতে। তোমার শ্বশুর মশায় নাকি হাঁড়িকড়াই, ছাতা নিয়ে ভাসতে ভাসতে বলেছিলেন, বউমা..... ধবলীর গলার দড়িখান খুইল্যা এইসোনে....

ধবলী তোমাদের গরু ছিল। আর ফিরে আসেনি। তুমি সাঁতার কাটতে কাটতে খাটালে ঢুকে ধবলীর গলার দড়ি খুলে দিয়েছিলে। কেঁদেছিলে। ধবলীও কেঁদেছিল। তুমি বলোনি, আমি ভেবে নিয়েছিলাম।

আমি কতদিন রাতে স্বপ্ন দেখেছি জানো, ধবলী ভাসতে ভাসতে এ নদী, সে নদী পেরিয়ে কোথায় গিয়ে পড়েছে। কাউকে চিনতে পারছে না। কাঁদছে। ধবলী আমায় যেন চেনে। আমি গিয়ে ধবলীকে নিয়ে আসছি।

কিন্তু এনে কোথায় রাখব? আমাদের সালকিয়ার বাড়িতে ঘাস কই? সব তো সিমেন্ট। এমনকি মাঠেও কয়েক ছটাক ঘাস ছেড়ে দিলে শুধু ধুলো আর মাটি। ধবলী খাবে কি?

জানি গরু বললে লোকে রেগে যায়। কিন্তু আমার নিজেকে ধবলীর মত লাগত। যেন হারিয়ে গেছি। আমাকে কেউ চিনতে পারছে না। আমি ধবলীকে বুঝতে পারতাম।

আজ সারা পৃথিবী জুড়ে কি বন্যা গো ঠাকুমা। সব ভেসে যাচ্ছে। ঘর, বাড়ি, রাস্তাঘাট, গাড়ি, মানুষ, পশু সব। মনে আছে খুব জোর বাজ পড়লে, বৃষ্টি হলে তুমি পিঁড়ি পেতে দিতে কুয়োপাড়ে। শাঁখ বাজাতে জোরে জোরে। আমার মনে হত তোমার সেই শাঁখের আওয়াজেই বাজ বৃষ্টি কমে যেত।

এখন নাকি সব ক্লাইমেট চেঞ্জের জন্য হচ্ছে বলছে জানো। মানে আমাদের পৃথিবীটা বদলে যাচ্ছে। সে শাঁখ বোঝে না, পিঁড়ি বোঝে না। কি সব জটিল জটিল অঙ্কের হিসাব করে, আলোচনা করে, আর খালি খালি বই ছাপে।

জানো ঠাকুমা, আমি একটা কথা স্পষ্ট বুঝেছি, এরা সব করে, কিন্তু কেউ ভয় পায় না তোমার মত, তাই এদের কাজে কিচ্ছু হয় না। এরা শুধু কথা বলে, আর বই ছাপে, আর নিয়ম বানায়। তোমার মত আন্তরিকতায় পিঁড়ি না পাতুক, শাঁখ না বাজাক, কিন্তু ভয়টা তো পাক! কিচ্ছু পাচ্ছে না গো। বাচ্চারা রিলে বন্যার ভিডিও দেখেই, ইস, বলেই পরেরটায় গানের, কি নাচের, কি হাসির ভিডিওতে চলে যাচ্ছে। আর বড়রা হাসি হাসি মুখে হ্যান করেঙ্গে, ত্যান করেঙ্গে বলে আবার আগের মত হয়ে যাচ্ছে। চাট্টি বোক্তিতা করেই পার্টি করতে শুরু করে দিচ্ছে।

আসলে এদের ধবলী হারায়নি তো ঠাকুমা। তাই এদের প্রাণে ভয় নেই গো। আমাদের এইটুকু বাড়ি, আমরা ক'টা গাছ লাগাবো গো? টবে ক'টা গাছ হয়? বড়জোর প্লাস্টিক নিলাম না। তুমি তো সব ঠোঙায় আনতে। অত প্লাস্টিক কোথায় থাকত বলো দোকানে? আমরা কি আর করি তবে ঠাকুমা? ধবলী হারানোর ব্যথা যার প্রাণে নেই, সে যত আলোচনাই করুক, কাজের কাজ তো কিছুই হবে না।

আমরা বরং ভয় দেখাই সবাইকে। বাচ্চাদেরকে বিশেষ করে। ভয় দেখানো মানে সাবধান করা ভয় দেখানো। যেমন বলি, খেতে খেতে হাসবি না… গলায় আটকে যাবে…. তেমন। তুমি ধবলীর গল্প বলো। আমি ধবলীকে নিয়ে দেখা দু:স্বপ্নের গল্প বলি। মিটিং করে, বই ছাপিয়ে, কঠিন কথা বলে কি লাভ বলো? আমাদের কি তা সাজে? না আমাদের অত বুদ্ধি আছে? আমাদের শুধু শূন্য খাটাল, আর ধবলী হারানোর স্মৃতি আছে। যারা আজ সবটুকু হারিয়ে মারা যাচ্ছে, নি:স্ব হচ্ছে, তারাও জানে না এত হিসাব। কাদের গা জোয়ারিতে এসব হচ্ছে তারা কিচ্ছু জানে না। কিন্তু তা বলে তো হাল ছাড়লে চলবে না ঠাকুমা। আমি ন্যাশেনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে দেখেছি, একটা হরিণকে বাঘ পেছনের দিকে কতটা খেয়ে ফেলেছে, সব নাড়িভুড়ি জঙ্গলের ঘাসে রক্তারক্তি হয়ে লুটিয়ে, তবু সে দাঁড়িয়ে আছে, নিজেকে বাঁচাতে চাইছে। সেই তো জীবন ঠাকুমা… আমাদের অনেক ধবলীকে বাঁচাতে হবে…. আমরাও যে ধবলী বুঝতে হবে…. ভেসে গেলে গরুই বা কি, আর মানুষই বা কি….











Friday, June 9, 2023

বনানী ঘোষ

 


শূন্য প্রাণ কাঁদে সদা.... এখনও তারে চোখে দেখিনি.... কে দিল আবার আঘাত.... বসন্ত প্রভাতে এক মালতীর ফুল... যা হারিয়ে যায়... গভীর রজনী..... আরো আঘাত.... যেতে যেতে চায় না যেতে...

বনানী ঘোষ, আপনার গায়কীতেও এ গানগুলো শুনেছি। মনে হয়েছে গানের কথাগুলো আমার ঘরের চেয়ারে, খাটে বসে। হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে। শ্বাস নিচ্ছে। আমার সঙ্গে মিশছে। আমাকে ছাপিয়ে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও।

আজ পড়লাম, আপনি নেই। খারাপ লাগছে। আমার মনে হচ্ছে আমার কিশোরবেলার একখণ্ড আপনার সঙ্গে ওদিকে কিছুটা এগিয়ে গেল। আমার সেই রেলকলোনির গাছপালা, আকাশ বাতাস, মাটিঘাস...পাখির ডাক..বৃষ্টির শব্দ.... আপনার সুরের আঁচলে আশ্রয় পেয়েছে কতবার। শূন্য প্রাণ কাঁদে সদা..... কতবার যে শুনেছি.... কেন জানি না। এই গানটায় আপনাকে এত কাছের মনে হয়েছে, সেদিনের এক গভীর বিপর্যয়ে আপনিই তো ছিলেন.....  আজ খবরটা পড়া ইস্তক এই গানটাই তো বাজছে।

আপনি দেশের বাইরে থাকতেন। খুব বেশি গানের রেকর্ড নেই আপনার। তবু যে ক'টা আছে, তাতে আপনি আছেন। ভীষণভাবে আছেন। যখনই গভীরে হাহাকার জাগবে.... ভীষণ কান্না পাবে... কিন্তু চোয়াল শক্ত করে কাজ করে যেতে হবে.... কর্তব্য সেরে যেতে হবে.... আপনার কণ্ঠে উন্মত্ত শোক আমার শান্ত হবে.... আপনার সঙ্গে গলা মিলিয়ে কাঁদবে..... মানুষকে বড় হতে গেলে একা কাঁদতে শিখতে হয়.... বিনা অভিযোগে.... বিনা সান্ত্বনার আশ্বাসে...... আপনার গায়কীতে সে অভিজ্ঞতার ছোঁয়া আছে.... আপনার গায়কীকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম। ঋণ অনেক। ভার নেই। তৃপ্তিও নেই। আছে শূন্যতার বুকে মাথা রাখার সুখ। শূন্য প্রাণ কাঁদে সদা...

Sunday, February 26, 2023

শ্রদ্ধার্ঘ্য



"কিন্তু মা, এত বড় জাহাজের সঙ্গে, একটা ছোটো নৌকা বাঁধলে, বারবার ঢেউ খাব যে! আমি টাল সামলাতে পারব না। তুমি বরং না-ই বলে দাও"।

এতবড় সংসারের দায়িত্ব নিয়ে চলছে যে ছেলে, সে-ই বলল এই কথা। যে বাড়ি থেকে সম্বন্ধ এসেছে তারা অনেক অবস্থাপন্ন, কিন্তু এদিকে সে লড়াইয়ের মধ্যগগন। পায়ের তলায় অল্প খানিক মাটি জোগাড় করা গেছে। বাগান হল কই?

মা ছেলের কথাই জানিয়ে দিলেন মেয়ের বাবাকে। মেয়ের বাবার 'হ্যাঁ' আরো শক্ত 'হ্যাঁ' হল। এ জোর যে মানুষের আছে, সে মানুষের নৌকা জাহাজের সঙ্গে বাঁধা লাগে না। সে নিজের দাঁড় বাওয়ার জোরেই পাড়ি দিতে পারে জীবন সমুদ্র।

=====

ভুল ছিলেন না। ক্রমে পায়ের তলার অল্প খানিক জমি আকারে আয়তনে বাড়ল। যে বেড়ার বাড়ি ছিল, যা অল্প হাওয়ায় ধ্বসে পড়ে যেতে পারত, সে ঝড় সামাল দেওয়ার মত তৈরি হল।

সেকি একার জোরে? না, নতুন যে মানুষটা পরিবারে এসেছেন তিনি যাদু জানেন। মানুষকে আপন করার। তার স্নেহে উচ্ছ্বাস নেই, শাসন আছে। ভালোবাসায় প্রশ্রয় নেই, আগল আছে। গোটা সংসারটাকে দু'হাতে ঘিরে দাঁড়ালেন দশ হাতের শক্তি দিয়ে। ছোটোবেলা থেকে দুর্গাপুজো দেখেছেন নিজের বাড়ির বারান্দায়। জানেন তো দুর্গা কিভাবে ঘরের মেয়ে হয় সমস্ত দেবীত্বকে অতিক্রম করে।

অফিসের পিকনিকে নিজের ছেলেমেয়ের সঙ্গে যাচ্ছে ননদ, দেওর। বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় কোথায়? একে একে ননদদের বিয়ে দেওয়া, দেওরদের সংসারী করা, নিজের ছেলেমেয়ে মানুষ করতে করতে অসম্পূর্ণ পড়াশোনাকে সম্পূর্ণ করা --- সব হচ্ছে। সব হলও সময়মতো। কুমোরটুলি থেকে যখন ঠাকুর বেরোয়, সব প্রতিমায় যেমন শিল্পীর হাতের ছোঁয়া থাকে, গোটা সংসারটার প্রতিটা কোণায় তাঁর হাতের ছোঁয়া থাকল, প্রতিটা মানুষের জীবনের গড়ে ওঠার সময়ের কিছুটা সময় তাঁর হাতে বোনা ভালোবাসা, স্নেহ, শাসনের ওম নিয়ে থাকল। সব হল সময়মতো, কিন্তু তিনি যাওয়ার পথে পা বাড়ালেন বড় তাড়াতাড়ি। রক্তে বেঁধেছে মারণরোগ। সমস্ত চিকিৎসক বললেন, অনেক দেরি হল যে। প্রস্তুত হোন। আর মাত্র ছ-মাস সময় হাতে।

=====

যে সম্পর্কগুলো ফ্যামিলি ট্রি-তে জায়গা পায় না, কিন্তু এমন অবিচ্ছেদ্য শাখাপ্রশাখা হয়ে যায় যে তাকে ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ বোধ হয়, যে পরিবারের গল্প বললাম আমার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তেমনই।

এখন আমি কি করব? যে মানুষটাকে কোনোদিন বিচলিত হতে দেখিনি, কখনও কোনো অভিযোগ করতে শুনিনি, যে মানুষটার চোখের দিকে তাকালে নিজের হারানো আত্মবিশ্বাস নোঙর পায়, সে মানুষটার শেষদিনগুলোর সময় দাঁড়াব কি করে?

তিনিই সহজ করে দিলেন। কথা বলতে বলতে চোখে জল এলো তাঁর, আঁচলে মুছলেন, কিন্তু ভেঙে পড়লেন না এক মুহূর্ত। শেষ শ্বাসটুকু অবধি না। প্রচণ্ড কষ্টের সময় বলেছেন, আমায় একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে দাও না, তবে তো তোমাদেরও এত কষ্ট করতে হয় না। এই মাঝে মাঝেই নার্সিং হোমে যাও, রক্ত দিয়ে নিয়ে এসো, আমারও আর ভাল্লাগে না। সব শেষ করে দাও না!

আমি যতক্ষণ বসে থাকতাম, ওঁর হাতটা ধরে বসে থাকতাম। হাস্পাতালে যখন পাশে দাঁড়িয়েছি, দুর্বল হাতটা কম্বলের ভিতর থেকে বার করে আমার ক্ষমতাহীন, দুর্বল হাতটার উপর রেখেছেন। কি আশ্বাসে, কি বিশ্বাসে! নিজের অসহায়তায় ভিতরে ভিতরে মাটিতে মিশেছি। কিন্তু হাতটা ধরে রেখেছি শক্ত করে। গল্পের পর গল্প বলে গেছি। উনি হেসেছেন। সবটা যে অভিনয় করছি, ওঁর মত বুদ্ধিমান মানুষ কি বোঝেননি? কিন্তু আমাদের বিব্রত করেননি একদিনও। ওই যে বললাম, কোনো অভিযোগ ছিল না কোনো মুহূর্তে! এমনকি ঈশ্বরের কাছেও না। যেখানে অনেক বড় বড় নাস্তিক মানুষকেও দেখেছি মাথা কুটতে, তিনি আমাকে কেন, সেই ঈশ্বরকেও বিব্রত করেননি। থাকতে দিয়েছেন তাঁকে তাঁর মত করে।

একবার বললাম, কাকিমা অ্যালবামগুলো দেখব। আপনার ছোটোবেলার ছবি। আপনার ফেলে আসা দিনগুলোর ছবি।

বার করে রাখলেন। পরেরদিন যেতেই এনে দিলেন। আমি সাধারণত শনি আর রবিবারই যেতাম। এক সপ্তাহের অনুরোধ ওই দুর্বল শরীরে পরের সপ্তাহেই রাখলেন। তখন ভীষণ শ্বাসকষ্ট। তাও বুকে ভর দিয়ে উঠে উঠে এক একটা ছবি প্রায় রক্তশূন্য আঙুলগুলো দিয়ে দেখাচ্ছেন। গায়ের কম্বল শীর্ণ হয়ে যাওয়া দেহ থেকে খসে খাটে পড়ে যাচ্ছে, ফুরিয়ে আসা শ্বাসের যতটুকু কুলায় টেনে টেনে আমাদের দেখাচ্ছেন, পরিচয় করাচ্ছেন নিজের বাবা, মা, শ্বশুর, ননদ, দেওর সবার সঙ্গে… অল্প ভাষায় বর্ণনা করছেন কোনো মুহূর্তের। এত আবেগ! সব মুহূর্তের সঙ্গে এত আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যে মানুষটা, তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতম ঘটনা যার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে, সে মানুষটা নাকি সবটুকু ছেড়ে যাবে! যেতেই হবে!?

=====

উনি থাকতেন দোতলায়। আমি নীচের তলায় নিজেকে প্রস্তুত করে উপরে উঠতাম, এক গভীর প্রসন্নতাকে প্রার্থনা করে। কারণ যে মানুষটার পাশে গিয়ে বসব, সে মানুষটা জীবনের চোখের উপর চোখ রেখে বেঁচেছেন। লুকিয়ে নয়।

আর যে মানুষটার হাত ধরে সংসারে ঢুকেছিলেন? শেষক্ষণ অবধি সে মানুষটা হাত ছাড়লেন না। এমনকি যে ভোরে শরীর থেকে শেষ শ্বাসটুকু বেরিয়ে গেল যে ক্ষণে, সে ক্ষণের কয়েক মুহূর্ত আগেও নাকের কাছে হাত রেখে দেখেছেন শ্বাস চলছে কিনা।

যে মানুষটা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে, সব দায়িত্বকে সম্পূর্ণ করে একটা অখণ্ড শান্তির আশা করেছিলেন, সে মানুষটাও হেরে গেলেন না। ভাগ্যের চোখে চোখ রেখে বললেন, বেশ…. তবে তাই হোক।

সেবার বাইরেটার বর্ণনা গৌণ। সেবার গভীরে যে আত্মত্যাগ থাকে তার মহত্ব অনুভবের। চিত্তশুদ্ধির। কাকিমা যখন খাচ্ছেন, কাকু কাকিমার পিঠে ঠেসান দিয়ে বসে। আমরা কাকিমার সঙ্গে গল্প করছি। কাকিমা দুর্বল শরীরটার ভার কাকুর পিঠে দিয়ে কথা বলছেন। কোনো রকমে দু-এক চামচ মুখে নিয়ে পরের গ্রাসের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন। ননদেরা, মানে আমাদের পিসিরা বারবার ঘুরে যাচ্ছেন। কপট শাসন করছেন। বাইরে গিয়ে চোখের জল মুছছেন। কাকু একটু বেশিক্ষণ কোনো দরকারে ঘরের বাইরে গেলে বারবার খোঁজ নিচ্ছেন। ডাক পাঠাচ্ছেন। উনি তো জানেন প্রতিটা মুহূর্ত মহামূল্যবান এখন, চলে যাচ্ছে যে!

ভীষণ শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে…. তাকিয়ে দেখলেন সবাইকে… জিজ্ঞাসা করলেন, মায়ের কাছে কে আছে?

বৃদ্ধা শাশুড়ি আছেন নীচের ঘরে। স্মৃতিভ্রংশ মানুষটার কাছে কে আছে?

=====

পুরোহিত মন্ত্র পড়ছেন। সামনে কাকিমার সহাস্যমুখ ছবি। মালা দেওয়া। আমি কিচ্ছু নিয়ে যাইনি, না মালা, না মিষ্টি, না ধূপ। কার জন্যে নেব? কেউ যায়নি তো। মন্ত্রের মানে জানি না, কিন্তু এটুকু জানি তুমি আছ, এই কথাটা বলতেই আজ এত আয়োজন। সব শূন্য হলে যুক্তির চলে, হৃদয়ের চলে না। হিসাবের খাতা শূন্য হলেও হয়, কিন্তু ভালোবাসার খাতা শূন্য করবে কার সাধ্যি? মৃত্যু? সে পারে না। সমস্তটা জুড়ে এতবড় একটা "আছে" জন্ম নেয় যে, "নেই" শব্দটা এক কোণে পড়ে থাকে।

আমি মহাপুরুষ সে অর্থে দেখিনি কাউকে জীবনে। কিন্তু সংসারে এমন কয়েকজন মানুষকে অবশ্যই দেখেছি যাদের দেখলে বিশ্বাস জন্মায় মনুষ্যত্বে। ত্যাগ, তিতিক্ষা, স্নেহ, ভালোবাসা কোনো জঙ্গল, বা গুহাবাসী সাধকের একছত্র সম্পদ নয়, সংসারের নিত্য লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও এমন রথীমহারথী জন্মায়, ভীষণ সাধারণ জীবনের আড়ালে, অসামান্য এক জীবন।

এ লেখা আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য। ঋণ অনেক কাকিমা, শোধ হবে না, বোঝাও হবে না। জীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে। আপনি যাননি কোথাও, যাওয়া যায় না। আমরাও যাইনি কোথাও, যাব না, যাচ্ছিও না। শোক একদিন শান্ত হবে। যেটুকু বাকি থাকবে, সে আপনার অস্তিত্বের মাধুর্য। যে মাধুর্য আজ অনন্ত, চিরন্তন হয়ে থাকল। থাকবেও।

প্রতিবার ফেরার সময় বলতেন, "আবার এসো"। সে ডাকে এক অধিকারবোধ ছিল। জোর ছিল। কোনোদিন ভোলার নয় সে ডাক। "আবার এসো"।

Saturday, October 29, 2022

মামু আর কোরিয়ান কাঠি





সকালবেলা আমি আর মামু খেতে বসব। জলখাবার আরকি। চাউ হয়েছে। হঠাৎ দেখি মামু দুটো কাঠি নিয়ে খেতে বসল। আমি প্রথমে ভাবলাম সদ্য পুজো গেল, মামুর কি কোনো ঢাকির সঙ্গে প্রেম হল? স্মৃতি স্বরূপ দুটো কাঠি নিয়ে ঘুরছে? মানে ঢাক বাজানোর কাঠি আরকি। হতেই পারে, মানুষ কত কি নিয়ে ঘোরে প্রেমে পড়লে। আমি তো কদ্দিন রুমাল নিয়েই ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। একদিনও প্রাণে ধরে জিজ্ঞাসাও করিনি, ওগো প্রিয়া, তুমি ইহাতে নাক মুছিয়াছ, সর্দি কি রাখিয়াছ ঝাড়িয়া?

যা হোক। মামু বসে। পাশে কাঠিদ্বয়। সামনে আমি। গল্প করছি। খাবার এলো। মানে চাউ। ওমা! হঠাৎ দেখি মামু ওই কাঠি দুটো দিয়ে গবগব করে চাউ খেতে শুরু করল।

আমি খাব কি? হাঁ করে তাকিয়ে। কাঠিতে এত কিছু ওঠে? দুটো কাঠিকে এমন বশে আনল কি করে মামু? কাঠি দিয়ে ঢাক বাজানো যায় এদ্দিন জানতুম। কিন্তু একি কাঠির ব্যবহার! টিভিতে সিনেমায় দেখেছি। একবার কলকাতায় এক চাইনিজ হোটেলেও খাবারের পাশে অমন কাঠি দিয়ে গিয়েছিল সে অভিজ্ঞতা আছে। আমি আর সে কাঠি নিয়ে নিজের মান-ইজ্জতে কাঠি করিনি। কিন্তু মামুর এই কাঠি সহযোগে ভক্ষণের কারণ কি? বিটিএস। এক কোরিয়ান গাইয়ে-নাচিয়ের দল।

এক সময়ে ছোটোবেলায় কাঁটা চামচে খেতে না পারলে লোকে অসভ্য বলত। কাঁটা চামচ ধরানোর এটিকেট শেখানোতে কত কত নাক উঁচু মানুষ এমন ঘাড় উঁচু করে থাকত যেন ডানদিক ফিরলেই সোজা ইউরোপ আমেরিকা ছাড়া কিছু চোখেই পড়ে না তাদের। সেদিন হলিউড ছিল, সাহেবী মালিকের স্মৃতি ছিল। অনেকের আবার যুক্তি ছিল ব্যাপারটা ভীষণ হাইজিনিক। যেন এদ্দিন ভারতের সব লোক ওলাওঠা হয়ে মরেছে হাত দিয়ে ভাত মেখে খেতে গিয়ে। আবার কেউ কেউ বলেছে, উঁহু রবীন্দ্রনাথও তো খেতেন কাঁটা চামচে। তা বাপু রবীন্দ্রনাথ তো অনেক কিছু করতেন সবটা কি পারিস?

কিন্তু মামুর কেস অন্য। সে নাকি আর্মি। কিসের আর্মি? বিটিএস এর। আমার বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীও আর্মি। সঙ্গীতে যোদ্ধার কি দরকার বুঝলাম না। কিন্তু মামুর দৃঢ় বিশ্বাস ভক্তি দেখে আমিও বললাম, আহা কি ভালো কথা! আর্মি হওয়া তো দারুণ ব্যাপার। তারপর বিটিএস এর গান শুনলাম, থুড়ি দেখলাম। পুরুষ নারী পৃথক করা যে এমন কঠিন কাজ সে বোধে এলেও মুখে আনলাম না। শুনেছি মামু ভীষণ গর্জে ওঠে ওসব বললে।

একবার বিটিএস এর কোন গায়কের জন্মদিন। মামু কেকটেক কেটে সেলিব্রেট করবে। গায়কের নাম "যে হোপ"। তা দাদা, মানে জামাইবাবু জিজ্ঞাসা করেছেন, কার জন্মদিন? মামু বলেছে যে হোপ। দাদা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছে, মানেটা কি? যে হোকের (হোপটা হোক শুনেছে দাদা) একটা জন্মদিন করছিস? নামই জানিস না? মামু তারপর বুঝিয়ে বলল, বাবা ওর নামই "যে হোপ"। তো দাদা তো একটু পুরোনো ভাবধারার মানুষ। তায় একমাত্র মেয়ে। এমন ভিনদেশী পুরুষের জন্মদিন পালন করছে, ব্যাপারটা কেমন কেমন না? দিদি আবার বোঝালো, আহা তা কেন? আমিও তো ছোটোবেলায় কত পুতুলের বিয়ে দিয়েছি। পাড়ার লোক খাইয়েছি। মায়ের উপর কম অত্যাচার করেছি? এও সেই ধারার একটা ধরে নাও না! দাদা এ যুক্তিতে কতটা আশ্বস্ত হল বলতে পারি না। তবে 'যে হোক' এর জন্মদিন পালনে আর আপত্তি জানালো না।

এখন সঙ্গীতের প্রভাব যে খাদ্যখাবারে এসে পড়ে শুধু না, খাওয়ার পদ্ধতিতেও এসে পড়তে পারে এ নিয়ে ধূর্জটিবাবুর কোনো গবেষণা আছে কিনা বলতে পারি না। নিশ্চয়ই এই নিয়েও গবেষণা হওয়া উচিৎ বইকি। তবে ভয় একটাই, বামুন বাড়ির মেয়ে, কোনোদিন বিটিএস আর্মিদের গরু-শূকর খাওয়ায় প্রতিযোগিতা হয়ে পড়ে যদি সেদিন কি হবে! অত্যাধুনিকরা বলবেন, খাবে? এতে আর কি আছে! কিন্তু যে জন আছেন মাঝখানে? তাদের কি হবে? তখন?

সে থাক। এমনিতেই দেশের আবহাওয়া এইসব নিয়ে মাঝে মাঝে মাঝেই গরম হয়ে যায়। কিন্তু সঙ্গীতের সঙ্গে রসনার যে একমাত্রিক যোগ নেই, সঙ্গীতের রস ও রসনা তৃপ্তির রস যে একই যোগে রসনা বেয়ে হৃদয়ে ও উদরে প্রবেশ করে এ জেনে বড় তৃপ্ত হলাম। এ অবশ্যই গবেষণার বিষয়।







Monday, September 19, 2022

যা পালা!

একবার হল কি, তখন খুব ছোটো আমি, তো বোন আর ভাইকে নিয়ে সপ্তমীর দিন সন্ধ্যেবেলা ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছি। বলা বাহুল্য তারা আরো ছোটো।

মাঝপথে নামল মুষলধারে বৃষ্টি। সঙ্গে ছাতা নেই। জানব কি করে যে সন্ধ্যের আকাশ জুড়ে ভরা আশ্বিনে জমেছে শ্রাবণের মেঘ।

বোনের কাজল গেল ঘেঁটে। সব সাজগোজ গেল নেতিয়ে। আমার আর ভাইয়ের, দুজনেরই হাফপ্যান্টের বয়স তখন, নতুন জামা তার সব জৌলুস হারিয়ে, গন্ধ হারিয়ে গেল পুরো চুপসে। কি মন খারাপ, কি মন খারাপ আমাদের। বাড়ি ফিরতে হল অকালে।

আজ বিকেলে কাশবনে পাশ দিয়ে যেতে, ওদের বর্ষায় চুপসে গিয়ে ওরকম অপ্রস্তুত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, বহুবছর আগে আমাদের নিজেদের মুখগুলো মনে পড়ল। কাশবন যেন বলল, খুব মজা লাগছে না.... যা পালা!

Thursday, June 2, 2022

৪১


ছোটোবেলায় ঠাকুমার সঙ্গে ভাগবতপাঠ শুনতে যেতাম। তো সেখানে একটা গপ্পো আমার খুব মনে ধরেছিল। কৃষ্ণ নাকি কখনও কারো দোষবর্ণন করতেন না।

তো একবার উদ্ধব আর তিনি বেড়াতে বেরিয়েছেন। রাস্তায় পড়ল এক অতি কদর্য, বীভৎস সারমেয়। উদ্ধব ভাবলেন, এই সুযোগ, দেখি এর কি গুণ বর্ণনা করেন কৃষ্ণ। উদ্ধব বললেন, সখা এই যে সারমেয়, এর কি কোনো গুণ তোমার চোখে পড়ছে? এর সারা গায়ে ঘা, কানে, চোখে ঘা, পাগুলোয় ঘা, সারা শরীর জুড়ে পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কি এর মধ্যে ভালো তুমি দেখছ?

কৃষ্ণ সারমেয়টার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, উদ্ধব, তুমি ওর দাঁতগুলো দেখছ না, কি সাদা আর কি চমৎকার!

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, নরকেও সৌন্দর্য আছে কিন্তু নরকবাসীর তা চোখে পড়ে না, এই তাদের অভিশাপ।

তো গুরুবাক্য, ব্যাসবাক্য ইত্যাদি অ্যাদ্দিন শুনে আসছিলাম, কিন্তু চাক্ষুষ করার সুযোগ এই অ্যাদ্দিনে হল।

সেই গুহাচিত্র থেকে আধুনিককালের পিকাসো, নন্দলাল অবধি কত কত শিল্পীর ছবি আমরা দেখলাম। কিন্তু জগতে টিকটিকির বাহ্যের যে কি সৌন্দর্য, মাধুর্য এঁদের কারোর চোখে পড়েছে?

তো আমায় শিল্পী নিজে দেখিয়ে বললেন, এই হল টিকটিকি আর এই হল গিয়ে টিকটিকির গু!

আমি তো থ! টিকটিকির গু মারাত্মক বিষাক্ত, ক্ষতিকর এই জেনে এসেছি, এবং সে সত্যও বটে। কিন্তু কি একপেশে সে জানা! তার মধ্যে যে এমন নান্দনিক দিক লুকিয়ে, আহা! চোখে পড়ল না আমার! অমন কৃষ্ণবর্ণের পরেই যে এক বিন্দু শ্বেতশুভ্র বিন্দু টিকটিকি আপন দেহ হতে নিষ্কাশন করে থাকে, তার এমন একটি গভীর ব্যঞ্জনা আমার বোধে ধরা পড়েনি? জগত তো সাদায় কালোয় মিশে!

অহো, ধন্য আয়ুষ্মান! কি গভীর জ্ঞান, দর্শনের তুমি এই অধম মামার চিত্তে প্রকাশ ঘটালে। জগদম্বার পায়ে এই প্রার্থনা অতিসাধারণ হয়ে জীবন অতিবাহিত করার অধিকার থেকে তিনি যেন আমায় বঞ্চিত না করেন। টিকটিকির গু কে অগ্রাহ্য করে এই যে আকাশ পাতাল দার্শনিক চিন্তা, এর কোনো মানে হয়?! যেখানে দেওয়ালে, মেঝেতে রাতদিন টিকটিকি আমাদের বুঝিয়ে চলেছে জীবন মানেই সাদাকালো.. বুঝো মানব বুঝো....

শিল্পীর নিবাস আড়ংঘাটা। পিতামাতা হলেন, Amiya ও Smrity Sil Biswas, আমার পরম আত্মীয়স্বরূপ।




Monday, May 16, 2022

৪০

 


বুদ্ধ পূর্ণিমার সন্ধ্যে কাটল আদিবাসীদের মধ্যে। বারবার স্মৃতিতে আসছে 'আগন্তুক' এর শেষ দৃশ্যের কথা। মমতাশঙ্করের অস্থির, অধৈর্য পায়ের কথা। সঙ্গে সেই মাদলের আওয়াজ। বুকের মধ্যে বারবার ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে, বলছে বাইরে আয়, বাইরে আয়।

সবার সঙ্গে সবার হাত ধরে ধরে নাচ চলছে। শয়ে শয়ে মানুষ। আদিবাসী বাৎসরিক মেলা। হাতে হাত ধরে নির্দিষ্ট ছন্দে নাচ। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ।

আমি একটু সরে একটা বাচ্চাকে দেখছিলাম। ভিড়ে তার যাওয়ার অনুমতি নেই, মা শক্ত করে ধরে রেখেছে হাত। অল্প অল্প দুলছে তার শরীর। ছন্দে। কি আশ্চর্য, কেউ শেখাচ্ছে না, কিন্তু সাবলীলভাবে নেচে উঠছে পা। দুলে উঠছে কোমর। এটাই স্বাভাবিক। প্রাণের জিনিস প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে। কৃত্রিম যা তা অপেক্ষা করে আরোপিত হওয়ার।

আবার চোখ গেল চাঁদের দিকে। আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। আমার সামনে আসছে নাচতে নাচতে বিহ্বল জনতা। মাদল বাজছে পাঁচটা ছটা। সঙ্গে আরো বাদ্য। বুকের মধ্যে আবার উথলে উঠছে রক্ত। কিন্তু মনে পড়ছে বুদ্ধকে নয়। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে, সেই কাঁচরাপাড়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে যে নদীয়া, সেই নদীয়াকে মাতিয়েছিল যে দুজন তাদের কথা। শুধু নদীয়া না, ভেসে গেল ভারত। গৌর নিতাইয়ের ডাকে রাস্তায় নামল মানুষ। শুধু ঘরের কোণে বসে ধ্যান আর জ্ঞান চর্চায় নয়, রাস্তায় নেমে সবার সঙ্গে মেলার রাস্তা দেখিয়েছিলেন তিনি। মিলতে না পারলে সব ব্যর্থ। আজ এই যে চেনা, অচেনা মানুষ হাত ধরে নাচের তালে তালে পূর্ণিমাস্নাত আকাশের নীচে, একি শুধুই উন্মাদনা? না। একজন ঘুমন্ত মানুষকে ডাকতে ধাক্কা দিতে হয় - নয় শব্দে, নয় শরীরে। এ সেই ধাক্কা। জড়ত্ব কাটানোর ধাক্কা। না জাগলে বাইরে আসা যাবে না। বাইরে না এলে হাত ধরা যাবে না। হাত না ধরলে হাত দুর্বল হয়। ক্রমে রিক্ত হয়, নিজের দীনতায় নিজেই শেষ হয়ে যায়।

আজ সত্যিই ধন্য হলাম। ফেরার পথে নামল বৃষ্টি। রেল স্টেশানে বসে। একদল তরুণ আদিবাসী ফিরবে শিয়ালদহ। বলল, ট্রেন থামবে এখানে? বললাম, না, এটা রেলের কারখানার স্টেশান। দূরে ওই যে আলো, ওখান থেকে পাবেন ট্রেন। ওটা কাঁচরাপাড়া স্টেশান।

ওরা যেতে যেতে বলে গেল, থ্যাংক ইউ।

ইংরেজি শব্দ। যারা খানিক আগেই নাচছিল তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যে তারাই বলে গেল।

খারাপ লাগল না। ভালোই লাগল। পুরানো যা, তাকে না মাড়িয়ে, তাকে সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে এগোলে ক্ষতি কি? তাছাড়া এই ভাষাটা না জানলে এখনও তো ভারতের অনেকেই শিক্ষিত মনে করে না। যারা আলোতে সাড়া না দেয়, তাদের চোখে ধাঁধা ধরালেই তাকায়। নইলে এতবড় উৎসবে সমাজে বাকি অংশের উপস্থিতি এত কম কেন? প্রচারই বা নেই কেন সে অর্থে?

একটা লিঙ্ক শেয়ার করলাম। Debasish এর তোলা ভিডিওর।


 

Saturday, May 14, 2022

৩৯

 


তো কথা হল এই যে সব আমি এটাসেটা নিয়ে লিখি, লোকে ভাবে আমি বইটই পড়ে লিখি। আদৌ কথাটা সত্যি যে না, সেটা প্রমাণ করতেই তো ছবিটা দেওয়া। সব লেখা নিয়ে এনার সঙ্গে আলোচনা করে, মতামত নিয়ে, শলাপরামর্শ করে তারপর লিখি।

কিন্তু বাড়িতে বসে সে যে শান্তিতে দুদণ্ড কথা বলি সে জো তো নেই। এ ও আসবে, আমাদের শান্তিভঙ্গ হবে, কথার রেশ কাটবে। তাই জন্য আমরা একটা নিরিবিলি খুঁজি। আমাদের নিরিবিলি জায়গা হল এই স্টেশান। এটা রেলগেট স্টেশান। হাতে গুনে কটা মাত্র ট্রেন দাঁড়ায়, সে শুধু রেলের কারখানার লোকেদের জন্য। তারপর সব ফাঁকা। আমরা এই একান্ত আলাপচারিতাই তো চাই। তাছাড়া আরো আছে, আমরা দুজনেই ট্রেন দেখলে বিহ্বল হই। মহাপ্রভুর যেমন জগন্নাথ দর্শনে হত। তো সে ট্রেন দাঁড়ানো হোক, কি ছুটন্ত। ট্রেন হলেই হল। আমার নামটাও তাই "ট্রেন দাদান"। ট্রেন দেখলেই আমাদের ভাব হয়, প্রায় সমাধি হয় হয় আরকি। তারপর ট্রেন চলে গেলে আমরা নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। সে সব সাংকেতিক ভাষায় আলোচনা। যে বোঝে সে বোঝে। তারপর যে না আমি লেখার বিষয় পাই, এটা সেটা লিখি। এটা সেই প্রমাণস্বরূপ ছবি।

ইনি কে? ইনি Debasish আর Reppal এর পুত্র। আমার... নাতি তথা বন্ধু। নাম, জগত জানে আলেখ্য। আর আমাদের মধ্যে নাম ভীষণ পরিবর্তনশীল।