Showing posts with label ভুতুড়ে গল্প. Show all posts
Showing posts with label ভুতুড়ে গল্প. Show all posts

Saturday, November 11, 2023

হাতটা

করোনার বছর দুই আগের ঘটনা হবে। দার্জিলিঙে একটা অফিশিয়াল কাজে গেছি। দুদিনের ট্যুর। প্রায়ই যেতে হয়। কিন্তু এবারে একটা সমস্যা হয়েছে। যে হোটেলে প্রতিবার উঠি, সেটা পেলাম না। কালীপুজোর ছুটির জন্য এত ট্যুরিস্ট এসেছে যে ওরা নাকি ভাড়া তিনগুণ করে দিয়েছে। আমার অফিস অতটা দেবে না। যা হোক, ছোটোখাটো হোটেলেই বুকিং পেলাম। একরকমের হোমস্টেই বলা চলে। তবে যেটা শুনে খুব ভালো লাগল, ওয়েদার ভালো থাকলে নাকি জানলা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাবে।


      রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছি। কাজ বাকি কিছুটা। সে সব সারতে সারতে প্রায় একটা দশ হল। বাইরে ভালো বৃষ্টি হচ্ছে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা ভাগ্যে নেই বুঝলাম। কাল সকাল অবধি এ ক্লিয়ার হবে নাকি? ইম্পসিবল!  


  টয়েলেট সেরে দরজা দিয়ে বিছানায় এলাম। আঃ!! পিঠটা জুড়িয়ে গেল। রুমের আলোর সুইচটা পাশেই ছিল। সেটা নিভিয়ে যেই বাঁদিক ফিরেছি, জানলার দিকে, হঠাৎ ডানদিক থেকে কেউ বলল, দাদা প্লিজ আলোটা জ্বালাবেন, আমি টয়লেটে যাব। ভয় করছে। 


   আমি চমকে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। কে মশকরা করেছে এত রাতে! ওমা! পাশ থেকে বলল, ও দাদা, আমি না বেরোনো অবধি আলোটা নেভাবেন না প্লিজ। আমার হেব্বি ভয় লাগে। 


  আমি তো হাঁ হয়ে গেছি। আমার ভয় পাওয়া উচিৎ, কিন্তু এত নরম গলার আওয়াজ যে ভয়টাই পেতে পারছি না। গলাটা পুরুষের। আমার চোখের সামনে টয়েলেটের দরজাটা খুলে গেল। আলো জ্বাললো। দরজা বন্ধ হল। খানিক বাদে জল দেওয়ার আওয়াজ হল। আবার টয়েলেটের দরজাটা খুলে গিয়ে, আলো নিভিয়ে, দরজাটা বন্ধ হল। 


   আমার পাশে আবার সেই গলার আওয়াজ। আপনি শুয়ে পড়ুন। শুধু জলের বোতলটা আমি নিলাম। এই সবুজটা। আপনি নীলটা নিন। আলোটা নিভিয়ে দিন। আমি এই চেয়ারে বসেই কাটিয়ে দেব। আসলে এটা একটা রিচুয়াল তো, আজকের দিনে আসতেই হয়। আমাকে এই ঘরেই খুন করেছিল আমার বউ আর তার প্রেমিক। ওরা এখন কালিপঙে থাকে। আমি যাই না। আমার লজ্জা লাগে। আসলে ডিভোর্স হয়নি তো। এখনও তাই নিজের বউ ভাবটা আছে। তাই ওসব আদর-টাদর দেখতে লজ্জা লাগে। কি বলেন!


  আমি ভাবছি আমার খাবারে কি কিছু নেশার জিনিস মেশালো। 


  নিন নিন, ঘুমান। কাল আবার অফিসে যাবেন। আমার আবার বেশি রাত জাগলেই টয়লেট পায়। আবার আপনাকে আলো জ্বালতে হবে। নিন নিভিয়ে নিন আলো। 


    আমি বললাম, ও মশায়, কি ইয়ার্কি হচ্ছে, এমন একজন আস্ত জ্যান্ত ভূতের সঙ্গে একই ঘরে রাতে ঘুমানো যায় নাকি? প্লিজ…বাইরে গিয়ে বসুন না….


   পাগল! বললাম না আমার ভীষণ ভয়! আসুন আপনার মাথায় বিলি কেটে দিই…ঘুম চলে আসবে….


     আমি বললাম, দেখছেন আমার মাথায় চুল নেই….কি মশকরা হচ্ছে….


  ওহ সরি! আসলে কান নেই তো…তাই চশমাটা পরতে পারি না…চোখেও কম দেখি….পা টিপে দিই?


   বলতে বলতে হঠাৎ দেখি আমার দুই পায়ে হিম ঠাণ্ডা দুটো হাতের চাপ। 


   কিন্তু মানুষের শরীরে তো। কেউ এমন করে পা টিপেও দেয় না কোনোদিন। কি বলব, আমার দুই চোখ বেয়ে ঘুমের ধ্বস নেমে গেল। ভুলেই গেলাম হাতটা মানুষের… না….


  ঘুম ভাঙল সাড়ে ছটায়। হা ঈশ্বর! চোখের সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা! আহা! আহা! 


   দরজায় টোকা পড়ল। চা দিয়ে গেল। 


     চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে মনে পড়ল, হাই যা…কাল রাতের তিনি কোথায়? 


   কোনো চিহ্নই নেই তার।


     আমি সারাদিন অফিসের কাজ সেরে, বিকেলে ফিরে, রেডি হয়ে নিলাম। রাতেই শিলিগুড়ি পৌঁছাব। কাল ভোরে ট্রেন। 


       হোমস্টের মালিকের থেকে বিদায় নিয়ে বেরোবো। বাইরের ঘরে বসে সে। আমি যেতেই একগাল হেসে বলল, চঞ্চল আপনাকে বেশি জ্বালায়নি তো….খুব ভালো লোক ছিল….


  আমি বললাম, মানে আপনি জানতেন? 


  সে বলল, জানতাম। তবে এও জানতাম আপনি খুব ভালো মানুষ, ওকে বুঝবেন। 


    আমি জিজ্ঞাসা করলাম, বুঝলাম। কিন্তু ও ভয় কিসের পায় এত?


    সে একটু চোখটা নামিয়ে বলল, মানুষকে। বড্ড সরল ছিল তো! 


    আমি বাসস্ট্যান্ডে এলাম। এবার বাসে উঠব। হঠাৎ দেখি দৌড়াতে দৌড়াতে হোমস্টের মালিক আসছে। আমি ভাবলাম, কিছু ভুলে এলাম? সঙ্গে সঙ্গে পকেটে হাত দিলাম। না, মোবাইল তো আছে। তবে? আমার কাছে এসে সে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, দেখাই হত না আপনার সঙ্গে আরেকটু হলে….আবার আসবেন….


   আমার মাথাটা বোঁ বোঁ করছে….আমি বললাম, আচ্ছা।


    বাস ঘুরপথে নামছে। অন্ধকার ঘনাচ্ছে। মনে করার চেষ্টা করলাম…হাতটা কি ঠাণ্ডা ছিল…আগের শেক করা হাতটা?

Thursday, October 26, 2023

মশারিটা


নকুড়বাবু ভীতু মানুষ। একা থাকেন। শুতে যাওয়ার সময় মাথার কাছে গীতা নিয়ে শোন। সেদিনই গীতাটা নিতে ভুলে গেছেন। ঘুম ভাঙল আড়াইটের কাছাকাছি। মশারিটা দুলছে। রাস্তার দিকের জানলার পর্দাটা দুলছে। বাইরে ঝড় হচ্ছে, বাজ পড়ছে। ফ্রিজের প্লাগটা খুলতে হবে। কিন্তু মশারির বাইরে নামতে হবে ভাবলেই হাত পা হিম হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দামী ফ্রিজ। এখনও ইনস্টলমেন্ট চলছে। এইভাবে নষ্ট হবে….

নামলেন। ঘরের আলো জ্বাললেন। ডাইনিংরুমের আলো জ্বাললেন। দেখলেন ফ্রিজের প্লাগটা খুলে স্টেবিলাইজারের মাথায় রাখা। তবে কি খুলেই শুতে গেছেন?

ডাইনিং এর আলো নিভিয়ে ঘরে এলেন। ঘরে এসে দেখলেন মাথার কাছে গীতাটাও রাখা। এত ভুলো মন হয়ে গেছে? নিজের ভুলো মনের কথা ভেবে হাসি পেল। আবার ভয়ও করল, বাপ ঠাকুর্দার রোগ তো!

এই সব ভাবতে ভাবতে মশারিটার গা দুবার ঝেড়ে, মশারিটার একদিক অল্প তুলে বিছানায় ঢুকে গেলেন হামাগুড়ি দিয়ে। বসলেন। পাশের বোতলে রাখা জল খেলেন। এই যা! আলোটা! ঘরের আলোটা নেভাতে তো ভুলে গেছেন!

      আলোটা টুক করে নিভে গেল।

Monday, August 28, 2023

তুমি আজ জানলে

ঝুলনের এ কদিন স্টেশানেই রাত কেটে যায়। বেলায়, ওই চারটের পর আবার মেলায় আসে। ঝুলনের এক হপ্তা আগে থেকেই মেলা বসে যায়। এবারও বসেছে। সেও এসেছে। সে ডালের বড়া বিক্রি করে। ছোটো-ছোটো। ফুলুরির মত। ওজনে বেচে।

তার বয়েস হল আটান্ন। একা মানুষ। মেয়েদের বিয়ে হল। বউ মারা গেল।

রাস্তায় আলো নেই আজ। চাঁদও আধখানা উঠেছে। অশ্বত্থের ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়েছে রাস্তায়। সে ভ্যান নিয়ে ফিরছে। লম্ফটা নেভানো। কালো কড়াই নিভানো ঠাণ্ডা ওভেনের উপর খড়খড় করছে। ওইটুকুই আওয়াজ।

সে ভ্যান থেকে নামল। তলপেটে চাপ লাগছে। জোর চেপেছে। অভ্যাস মত কানে পৈতেটা জড়ালো। দুটো সুতো ছিঁড়ে গেছে। পাল্টাতে হবে। যা হোক মহালয়ার আগে বদলে নিলেই হবে। তর্পণ আছে।

ফিরে ভ্যানে উঠতে যাবে, কে যেন বলল, "এমন ফ্যাকাসে মুখ কেন রে?"

কেউ নেই। রাস্তা শুনশান। স্টেশান আরো চল্লিশ মিনিট। কে বলল?

সে নেমে এদিক ওদিক তাকালো। চাঁদটা অদ্ভুত লাগছে। মালতী থাকলে বলতো, আরে দাঁড়ালে কেন…. আমার ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসছে যে… মালতী ভ্যানেই ঘুমিয়ে পড়ত।

সে ভ্যানের দিকে তাকালো। কালো কড়াই ওভেন আর ডাল মাখার বড় গামলাটা, তার মধ্যে রাখা ফাঁকা জগ।

হ্যাঁ হেরেই গেছে সে। ক্লান্ত হয়ে গেছে। কি যেন হয়েছে তার।

"শোন না ভাই… একটু গঙ্গার দিকে ভ্যানটা ঘোরা না… চ…. তোর লাভ বই ক্ষতি হবে না…."

সে এবার সত্যিই ঘাবড়ে গেল। কে রে?

কে অবশ্য বুঝতেই পারছে। কিন্তু তার পিছনে কেন? সে হাতজোড় করে বলল, আমায় যেতে দিন না মশায়…. বামুন মানুষ আমি… কারোর কোনোদিন ক্ষতি করিনি…. আর আমার কাছে আপনার পাওয়ারও কিছু নেই…

"আহা, ওরে ভয় পেয়ে গেলি যে রে… আমি দেহহীন সত্যিই, তাই বলে কি কাণ্ডজ্ঞানহীন… শোন কথা বাড়াস না…. গঙ্গার দিকে চল।"

========

মেলা থেকে গঙ্গাটা স্টেশানের উল্টো দিকে। কিন্তু এ যা শুরু করেছে যেতেই হবে। তা ছাড়া এখনও তো প্রায় দশদিন এ রাস্তা দিয়ে এত রাতেই ফিরতে হবে তাকে। তবে?

অগত্যা সে ভ্যান নিয়ে গঙ্গার পাড়ে এসে দাঁড়ালো। সারা রাস্তা শুধু কানের কাছে গুনগুন গান শুনতে পাচ্ছিল…. দে মা আমায় তবিলদারি…

সে বলল, বলুন… এবার?

"এবার আর কি… ওদিকে দেখো যতীন ভায়া…. ওই যে… মন্দিরের সামনে চাতাল…. স্টেশানে না রাত কাটিয়ে এখানেই কাটাতে পারো… আমার দুই বন্ধু আছে বলে দেবখন।"

যতীন বলল, আপনার বন্ধু মানে… তেনারাও কি….

"সে আর বলতে… বিলক্ষণ… বিলক্ষণ… তবে দু’জনেই বড় ভালো গো ভায়া…. ওরা নেই… কাশী গেছে… কালই ফেরার কথা।"

যতীন গঙ্গার ধারে বসে পড়ল। বেশ ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। খানিক চুপ থেকে জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু আমাকে আপনার কি দরকার, সেটাই তো বললেন না।

"তেমন দরকার কিছু নেই বুঝলি। আসলে তোকে কদিন ধরে দেখছি, ভালো মানুষ তুই। কিন্তু বোকা। এখন বিবাগী। দেখ বোকা বিবাগী যারা হয় তারা রাতদিন শুধু ঠকে। তাই ভাবলাম…. আসলে আমি ভালো মানুষ ছিলাম না। চুরি ডাকাতিতে বেশ নামডাক ছিল। ওই পুলিশের গুলিতেই…. যা হোক, আমার মনে হল তোকে কিছু একটা বলি। আর দেখ আজই তুই মুততে আমার গাছের তলাতেই দাঁড়ালি। এ মায়ের যোগাযোগ ছাড়া কি…. বল…."

যতীনের "বোকা" কথাটায় গায়ে বিঁধল। বলল, সে সংসারে কত বোকা মানুষ আছে দাদা…. তুমি কতজনকে বাঁচাবে…. তাছাড়া তোমার মতলবও তো স্পষ্ট নয়….

"বুঝেছি। অভিমান হয়েছে। দেখ, কিরকম বোকা তুই… বলা নেই, কওয়া নেই, হুস করে এক ভূতের উপর অভিমান করে বসলি… তাও যদি চোখে দেখা মানুষ হতাম…. এই হল তোর বোকামি…. কথা অবশ্য সত্যি বলেছিস… কত বোকাকে আমি সামলাব…. যা হোক… নিজেকে সামাল দে যতীন, এত অভিমানী হলে সংসারে চলে না…."

যতীন চুপ করে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে। চাঁদের ফিকে আলোয় কি মায়াময় লাগছে সবটা। হ্যাঁ সে অভিমানী। অত পড়ালেখা করেনি সে। তার অভিমানী মন নিজেকে গুটিয়ে রাখে। মালতী চলে যাওয়ার পর আরো বেশি করে। কিন্তু অভিমান কেন হয় তার এত?

"বোকা বলে রে… বোকা বলে। দেখ যা হওয়ার তা হবে। কতটুকু তোর হাতে জীবন বল? নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া না করে যদি অভিমান করে নিজেকে দূরে ঠেললি, তবে হেরেই গেলি। অভিমানের কোনো মূল্য নেই। ওটা শোকের অপচয়। অভিমান মানে সময়ের অপচয়, মনের অপচয়, জীবনের অপচয়। বোকামি না এটা?"

যতীনের কান মাথা গরম হয়ে গেল। একে সকাল থেকে এত পরিশ্রম গেছে তায় আবার এই রাতবিরেতে ভূতের কেত্তন। সে বলল, একটু ঝাঁঝিয়েই বলল, তা অভিমান না করলে আমি রাতারাতি বুদ্ধিমান হয়ে গেলাম নাকি?

"বোকা রে। বুদ্ধিমান কেউ হয় না। নিজেকে বুদ্ধিমান ভাবাই তো আরো বড় বোকামি। নিজেকে বোকা চিনতে পারাই আসল বুদ্ধিমানের কাজ। আমি আজ যাই। আমাকে একটু শ্মশানের ওদিকে যেতে হবে। তুই বসে বসে ভাব। আর যাই করিস এত অভিমানী হোসনি…. এলাম বুঝলি"।

=======

মেলায় আজ ভিড় কম। ট্রেনের কি গোলমাল নাকি। যতীনের বিক্রি-বাট্টা কম। যতীনের নিজেকে আজকে কি হালকা হালকা লাগছে। নিজেকে সকাল থেকে উঠেই কি চমৎকার বোকা বোকা লাগছে। যত বোকা লাগছে মনে হচ্ছে যেন কে শার্টের একটা একটা বোতাম খুলে দিচ্ছে। বুকে ঠাণ্ডা বাতাস লাগছে। নিজেকে বোকা ভাবতে শুরু করলে চারদিকে কে কত বুদ্ধিমান সে হিসাব আর কষতে হচ্ছে না। এ বেশ তো! মাথাটা দারুণ ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। তবে তো সে দাদাকে একটা ধন্যবাদ জানাতে হয়…. কিন্তু সত্যিই কি নিজেকে বুদ্ধিমান ভাবত সে?

যতীন সারাটা দিন ভেবে রাতের বেলা গঙ্গার ধারে বসে বুঝল, আসলে সে নিজের বোকামিগুলো নিয়ে মাথাই ঘামাত না। বোকামিগুলো যে তারই স্বীকার করত না। এর ওর ঘাড়ে দায় চাপাতো। এমনকি মালতীরও…..

আজ প্রথম মনে হল মালতীর সঙ্গে যা করেছে আজীবন…. ঠিক করেনি…… বড্ড হেলা করেছে…. কি বোকা সে…. কি বোকা…..

আফসোসে বুকটা ভারী হয়ে গেল যতীনের। ভ্যানে গিয়ে বসল। আর মেলায় থাকবে না। ঘরে যাবে। মালতীর জন্য কষ্ট হচ্ছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মালতীকে সে একটুও বোঝেনি। বুঝতেই চায়নি। নিজের হাত-পা এর মত মালতীকে ধরে নিয়েছিল। ছি ছি।

ভ্যান গড়াতেই পিছন থেকে কে বলে উঠল…. এ জায়গাটা কিন্তু মন্দ না….. থাকবে?

যতীন লাফ দিয়ে নামল ভ্যান থেকে….. কথা বলতে পারছে না….. গলা কামড়ে ধরে আছে কে?.....

বোকামি…. মালতী… আজীবনের বোকামি….

মালতী বলল, জানতাম তো…. তুমি আজ জানলে…..

Friday, December 23, 2022

এক্কাদোক্কা

কপালে শেষ ট্রেনই ছিল। কাঁচরাপাড়ায় নামলাম। ঠাণ্ডা জাঁকিয়ে পড়েছে। যা ভেবেছিলাম তাই। কিচ্ছু নেই। আমার গন্তব্য হাঁটাপথে আধঘন্টা এখন।

প্লাটফর্ম থেকে নেমে আগে একটা লাঠি খুঁজলাম। কুকুরগুলো জ্বালিয়ে মারবে নইলে। পেয়েও গেলাম। হাঁটা শুরু করলাম।

সামনেই রেলের হাস্পাতাল। এদিকটায় আসতে একটু গা ছমছম করে রাতে। অল্প কুয়াশা কুয়াশা পড়েছে। হাঁটার স্পিড বাড়িয়ে দিলাম।

সবে ফার্স্ট এভিনিউটা ধরেছি, হঠাৎ পাশে আলো এসে পড়ল। টোটো একটা।

কোথায় যাবেন?

দরকার নেই দাদা.. এগিয়ে যান..

আরে কোথায় যাবেন বলুন না…

চাকলা।

আসুন… আমিও ওদিকেই যাব.. ছেড়ে দিই… পঞ্চাশ টাকা দেবেন।

আসলে সমস্যাটা হল সেইখানেই। টাকা নেই। একটা দশ টাকা পড়ে আছে। বললাম, যান না দাদা… লাগবে না বললাম তো….

চলে গেল।

=======

আমার সমস্যাটা হল হিসাবের। কাঁকিনাড়াতে মামাদের চশমার দোকান। নতুন করে সাজানো হচ্ছে। আমার উপর দায়িত্ব দোকান বন্ধ করে ফেরার। আজ মিস্ত্রি দেরি করল কাজ শেষ করতে। খিদে পেয়ে গিয়েছিল। এটা সেটা খাওয়ায় পর এই পড়ে আছে পকেটে।

ফার্স্ট এভিনিউয়ের শেষে টোটোটা দাঁড়িয়ে। চালক মুখটা বার করে আমার দিকে তাকিয়ে।

আসুন না দাদা… আচ্ছা তিরিশ দেবেন….

নেই... দশ আছে… হবে? তাছাড়া সেটাই বা দেব কেন… যাব না তো বললাম… হ্যাজাচ্ছেন কেন?

যা শালা!

চলে গেল।

আমি ডানদিকে ঘুরে ফিফথ এভিনিউয়ের দিকে এগোলাম। বেশ কনকন করছে পা। কিটো পায়ে। মোজাটা কেন যে আনলাম না। ইচ্ছা করছে জ্যোৎস্নার সঙ্গে কথা বলি। থাক। প্রচুর লোক ওদের বাড়ি। ওর দাদার বিয়ে কাল। আমাকে সময় দিয়েছে চার বছর। তার মধ্যে দোকান দাঁড় করিয়ে দেব। বড়মামা হেল্প করবে। তিরিশ বছর হবে তখন আমার। আজকাল বিয়ের জন্য এমন কিছু দেরী নয়। জোনপুরে দোকান ভাড়া পাওয়া যাবে।

ফিফথ এভিনিউয়ের সামনে আবার দাঁড়িয়ে টোটোটা।

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। রাস্তা চেঞ্জ করব? একটু ঘুর হবে এই ফোর্থ এভিনিউ ধরে এগোলে। যাব? কিন্তু কেন? ব্যাটার কোনো বদ মতলব আছে কি? কিন্তু কি নেবে আমার কাছে? মাল খেয়ে আছে?

এগোলাম। সে টোটো থেকে নেমে দাঁড়ালো। আমার মুখোমুখি রাস্তা আটকে দাঁড়ালো। খপ্ করে আমার হাতটা ধরে বলল, টাকা লাগবে না…. বোনটা মর্গে… সুইসাইড…. লাশ কাল দেবে… বড্ড ভয় লাগছে… আমি বেরিয়েছিলাম সুইসাইড করতে….. মনে মনে ভেবেছিলাম রাস্তায় যদি কাউকে দেখি.. তবে জানব ঠাকুর চাইছেন আমি বাঁচি… কেউ না থাকলে ভাবব.. তাই ইচ্ছা করে রেলকলোনিতে এলাম… জানি কেউ থাকে না এই সময়ে… আপনি বলুন তো ঠাকুর আমায় কেন বাঁচতে বলছেন….

=======

কেন মরলেন উনি?

বরটার অন্য মেয়ের সঙ্গে লাফড়া ছিল… আমার বোনও কিছু ধোয়া তুলসীপাতা ছিল না দাদা… কিন্তু হাজার হোক বোন তো… কি জানি হঠাৎ সেন্টি খেয়ে কেন গলায় দড়ি দিয়ে দিল….

আমি আর বিশ্বজিৎ সামনা সামনি বসে। বোনের নাম বলেনি।

হঠাৎ নেমে গেল। টোটোর মাথায় হাত দিয়ে বলল, কি শিশির পড়েছে দেখুন… আসুন।

অন্য সময় হলে হাত দিতাম না। এখন নামলাম। হাত শিশিরে ভিজল। বললাম, বাড়িতে কে আছে?

মা, বাবা, আমি… ব্যস...

সুইসাইড করে নিই? আসলে বোনটা আমার জান ছিল… আমার বাইক ছিল জানেন… গায়ের রক্ত জল করে কিনেছিলাম… মালটার বিয়ের জন্য বেঁচে দিলাম…..

হুস্ করে কেঁদে ফেলল। স্বাভাবিক না কান্নাটা। রাস্তায় উবু হয়ে বসে চালকের আসনে হাতটা দিয়ে কাঁদছে। কি সব বলছে। ক'টা কুকুর ঘেউঘেউ করে তেড়ে এলো। আমি ভিতরে গিয়ে বসলাম। কি করব, চলে যাব?

=======

ঠক্ করে একটা আওয়াজ হল। বিশ্বজিৎ সিট থেকে মাথাটা তুলে বলল, এখনই! দাদার সঙ্গে একটু কথা বলছিলাম যে।

আমি কিছু বুঝতে না পেরে হাঁ করে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কুকুরগুলো অসম্ভব ডাকছে। রেললাইনটা খুব দূরে নয়। মনে হচ্ছে একটা মালগাড়ি যাচ্ছে।

বিশ্বজিৎ আমার সামনে এসে টোটোর ছাদে দুটো হাত দিয়ে আমার মুখের কাছে মুখ এনে বলল, বোনটা এসেছে। খেলবে বলছে। আপনি একটু বসবেন?

আমি 'হ্যাঁ, না' কিছু বলার আগেই দেখলাম ফোর্থ এভিনিউয়ের পীচের রাস্তার ওপর খসখস করে এক্কাদোক্কার ছক কাটা হয়ে গেল।

বিশ্বজিৎ ওদিকে তাকিয়ে বলল, প্রথমে তোর দান। তুই খেল। আমি আসছি।

আমার কপাল ঘামে ভিজছে। তলপেটে মাংসপেশিগুলো খামচে ধরছে। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যা দেখছি। বিশ্বজিৎ হাসছে। খেলছে। আমি আর কাউকে দেখছিও না, কথাও শুনতে পারছি না।

=======

হঠাৎ "দাদা একটু আসছি", বলে বিশ্বজিৎ অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আমি উঠতে চাইছি, কিন্তু শরীরে ওঠার শক্তি নেই। মামাকে ফোন করব? থাক। টোটো থেকে নামলাম। বলতে গেলে জোর করে নামালাম নিজেকে। দুটো পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরে। টোটোটা ধরে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ যতক্ষণ না পায়ে সাড় আসে। প্রায় ছুটতে শুরু করলাম।

চাকলা ঢোকার মুখে হঠাৎ মনে হল পিছন থেকে টোটোটা আসছে। দেখলাম প্রচন্ড স্পীডে টোটো চালিয়ে আসছে বিশ্বজিৎ। একবার ভাবলাম দৌড়াই। লাভ নেই। ধরে ফেলবে। যা থাকে কপালে। দাঁড়িয়ে পড়লাম। নিজের বুকের আওয়াজ রেলের চাকার মতোন ঘটাশ ঘটাশ করছে।

বিশ্বজিৎ টোটোটা সামনে দাড় করাল। বলল, সরি দাদা। আপনাকে অকারণে অনেকটা বিব্রত করে ফেললাম। আপনি একটা কথা শুধু আমায় বলুন, আমি কি বোনের সঙ্গে যাব, না থাকব? বোন বলল, মদনপুর থেকে ডাউনে একটা মালগাড়ি আসছে। ও অপেক্ষা করছে রেলের হাস্পাতালের সামনে রেললাইনের ধারটায়। ওখানে আমি আর বোন লাইনের ওপর পাথর রেখে, পয়সা রেখে দেখতাম লাইনে চাপা পড়লে কি হয়। গলাটা রেখে দেব দাদা? নইলে বোনটা একা হয়ে যাবে।

আমার মাথাটা সম্পূর্ণ চিন্তাশূন্য। কিচ্ছু ভাবতে পারছি না। বুকের মধ্যে ভুটভুটি কাটার শব্দ। স্পষ্ট নয়। বিশ্বজিৎ ফ্যালফ্যাল করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে। যেতেই তো পারব। আমিও যেতেই পারি। এই গলি, এই মাটি, এক আকাশ তারা --- এরাই তো থাকবে অনন্তকাল। আমাদের থাকায় কি আসে যায়?

টোটোটা দাঁড়িয়ে থাক রাস্তায়। ডাউনে আসুক মালগাড়ি। ছিন্ন হয়ে যাক, শেষ হয়ে যাক সব। কার কি ক্ষতি?

বললাম, বিশ্বজিৎ, কেন যাবেন... থাক না।

ফিরে এলাম। তাকালাম না পিছনে। টোটোর শব্দ মিলিয়ে গেল। মাথার মধ্যে অঙ্কুরিত হচ্ছে দ্বন্দ্ব। ভুল করলাম।

পরের দিন ভোরে মামার বাইকটা নিয়ে ছুটলাম লাইনের দিকে। কি দেখতে চাইছি? কি দেখলে খুশি হবো?

আকাশ অল্প অল্প ফরসা হচ্ছে। কয়েকজন এই ভোরেও মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছে। এত ঠান্ডাতেও। বাঁচার কি প্রবল তাগিদ মানুষের! বাজার বসেনি এখনও। মাছের গাড়ি ঢুকছে। শাক-সব্জি আসছে ভ্যানে।

কেউ কাটা পড়ে নি।

Friday, September 23, 2022

জন্মদিনে

ঘটনাটা বলব ভাবিনি কোনোদিন। কিন্তু বলাটা দরকার। নইলে নিজের কাছে অপরাধী থেকে যেতে হবে। আর বিপুল, মানে আমার ছোটোবেলার বন্ধু, ও নিজে থেকেই বলল, বলে দিতে। কারণ ঘটনাটার সঙ্গে ও নিজেই জড়িয়ে।

আমরা তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। আমি, বিপুল, রাশি আর অম্লান --- চারজন ভীষণ বন্ধু ছিলাম। এর মধ্যে আমি আর বিপুল ফিজিক্স অনার্স, অম্লানের কেমেস্ট্রি আর রাশির ম্যাথ। রাশি আর অম্লান ক্লাস ইলেভেন থেকেই কাপল। ওদের বাড়ির লোকেরাও জানত।

ঘটনাটায় আসি। রাশির জন্মদিন। রাশি সব সময়েই একটু অফবিট কিছু ভাবতে চায়। রাশির বড়মামার রাণাঘাটের ওদিকে মাটিকুমড়ো গ্রামে একটা বাগানবাড়ি আছে। রাশি ঠিক করল আমরা কলেজ শেষে বাইক নিয়ে ওদিকে বেরিয়ে যাব। ওখানে ডিনার করে রাতে ফিরব। রাশির মা বিরিয়ানি রেঁধে পাঠাবেন। আন্টির হাতের বিরিয়ানি মানে সত্যিই স্পেশাল কিছু একটা।

যেমন প্ল্যান তেমন হল। আমাদের প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস শেষ হতে একটু দেরি হল বলে বেরোতে বেরোতে প্রায় ছ’টা হয়ে গেল। নভেম্বর মাস, চার তারিখ। ঠাণ্ডা খুব একটা পড়েনি। কিন্তু বেলা তো ছোটো। রাস্তাতেই ভালো অন্ধকার নেমে এলো।

দুটো বাইক, একটাতে আমি আর বিপুল, আরেকটাতে রাশি আর অম্লান। রাশিও ভালো বাইক চালাতে পারে। ও যখন অম্লানের বুলেটটা চালিয়ে যেত রীতিমতো হাঁ করে লোকে তাকিয়ে থাকত। এখন তো স্কুটি কনসেপ্ট এসেছে, তখন ওসব কিছু ছিল কই? একটা মেয়ে বাইক চালিয়ে যাচ্ছে, তাও আবার বুলেট!

আমরা চাকদা ছাড়িয়ে গেলাম। মাঝখানে একটু দাঁড়িয়েছিলাম চায়ের জন্য। মাথাটা ধরেছে আমার। এ এক আমার পুরোনো রোগ। মাইগ্রেন। মাথার অর্ধেকটা টিসটিস করেই যাচ্ছে। বাড়াবাড়ি হলে বমি হয়ে তবে ছাড়বে। আজ তো চান্সই নেই ছাড়ার।

রাণাঘাট ছাড়িয়ে এলাম, কিন্তু ওদের কোনো ট্রেস নেই। বিপুল একবার বলল, দাঁড়াবি? আমার ইচ্ছা করল না। আমার ইচ্ছা পৌঁছে একটু রেস্ট নেওয়ার। বমি হবে মনে হচ্ছে। বিপুল ফোন করতেও চাইল, আমি বাধা দিলাম, কি দরকার, কে চালাচ্ছে তার ঠিক আছে? তাছাড়া রাস্তা দিয়ে যা বিচ্ছিরিভাবে গাড়িগুলো যায়।

আমরা মাটিকুমড়ো পৌঁছলাম সোয়া আটটা নাগাদ। আমার ঢুকেই বমি হল। কিন্তু কমল না। আমি সত্যদাকে, মানে যে বাড়িটার দেখাশোনা করে আর কি, তাকে বললাম, একটু চা খাওয়াও না…, বলেই ঘরে এসে আলোটা নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।

কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না, হঠাৎ চীৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল। বাইরে এসে দেখি রাশি আর অম্লান, বিধ্বস্ত পুরো, বারান্দায় মেঝেতেই বসে… রাশি রীতিমতো কাতরাচ্ছে। বিপুল বরফ দিচ্ছে মনে হল। কাছে গিয়ে দেখি দু'জনেরই জামা-কাপড় ফালা ফালা হয়ে যা-তা অবস্থা। বাইকটার সামনেটা দুমড়ে গেছে।

রাশি বলল, সত্যদা তুমি কিছু একটু খাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও না গো… আমাদের সব রাস্তায় পড়ে…

ঘটনাটা শুনলাম। ওরা আমাদের পিছনেই ছিল। অম্লানের মাঝরাস্তায় বড় বাইরে পায়। তো চাকদায় নেমে ওসব সেরে বেরোতে বেরোতে দেরি হয়ে যায়। আমরা টেনশান করব বলে আমাদের কিছু জানায়নি। রাণাঘাটের আগে, রাস্তাটা বেশ অন্ধকার, সামনে হঠাৎ কোত্থেকে একটা বাছুর চলে আসে, তাকে পাশ কাটাতে গিয়ে স্কিড করে পাশের জমিতে নেমে যায় গাড়ি। যা হোক, হেলমেট ছিল বলে মাথাটা বেঁচে যায়।

আমি একবার বললাম, চল রাণাঘাট হাস্পাতালে যাই, যদি কিছু সিরিয়াস হয়ে থাকে…

রাশি বলল, না রে, এমনিতেই সবটা মাটি তো হলই… আমি আমার জন্মদিনের বাকিটা হাস্পাতালে সেলিব্রেট করতে পারব না... প্লিজ…

আমি বললাম, তবে রাতটা থেকে যাই এখানে…

অম্লান আমতা আমতা করতে লাগল…

আসলে অম্লানের বাড়ি এইসব ব্যাপারে একটু কনজার্ভেটিভ… রাশি আছে জানে…

অম্লান বলল, না রে পিসি এটাকে একটা ইস্যু করবে… ছাড়… রাত করেই না হয় ফিরব…

আমি বললাম, বাইক?

রাশি বলল, মামাকে ফোন করেছিলাম…মামার এক বন্ধু আছে এখানে… এই ক'টা বাড়ি পরেই… বাইক ওখান থেকে নিয়ে নেব…

======== =========

খাওয়া শেষ হতে হতে দশটা হল। সত্যদা অমলেট আর ডালভাত খাওয়ালো। রাশি ভীষণ আপসেট। অম্লানও। রাশি বলল, এটা একটা সেলিব্রেশান হল বল?… যা হোক ডিউ থাকল…

আমরা বেরোলাম যখন সাড়ে দশটা। ওরা বলল, তোরা এগো, আমরা আসছি…

বিপুল আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। আমি এগোলাম… বললাম, রাণাঘাটে অপেক্ষা করছি, আয়।

বিপুল বলল, তুই একটা মাথামোটা… ওদের একটু প্রাইভেসি দিবি না… দেখছিলি না ওরা দু'জনেই বেরোবার আগে উসখুস করছিল।

আমি সত্যিই খেয়াল করিনি। আসলে করার মত অবস্থাতেই ছিলাম না। আবার বমি-বমি লাগতে শুরু করেছে।

প্রায় এগারোটা বেজে গেল। রাণাঘাটেই দাঁড়িয়ে। ওদের ফোনও সুইচ অফ্ আসছে। কি করব বুঝতে পারছি না। বিপুলকে বললাম, ওদের সঙ্গে ফোন ছিল? মানে রাস্তায় যেখানে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল সেখানে পড়ে যায়নি তো?… আমি কিন্তু ওদের হাতে ফোন মনে করতে পারছি না…

যা হোক। আবার মাটিকুমড়ো ফিরলাম। কেউ নেই। বাড়ির রাস্তায় যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। চাকদা ছাড়িয়েছি, হঠাৎ দেখি একটা জায়গায় বেশ জটলা। পুলিশের গাড়ি। কাছে যেতেই দেখলাম, আরে এতো অম্লানের বাইক! আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। আমাদের বাইকটা সাইড করে পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলাম, কি হয়েছে?

পুলিশ বলল, আরে একটা বাইক অ্যাক্সিডেন্ট… একটা ছেলে আর মেয়ে ছিল…স্পট ডেড… বিচ্ছিরি রকমের কলিশন…

বিপুল আমার দিকে তাকিয়ে। আমার গা হাত পা কাঁপছে। দাঁড়াতে পারছি না… বললাম, বডি…?

একজন একদিকে দেখিয়ে বলল, ওই দিকে….

======== =========

এর দশ বছর পরের ঘটনা, আমি আর বিপুল এই মাটিকুমড়োর বাগানবাড়িতে এসেছি। এটা এখন ভাড়া দেওয়া হয়। রাশির বড়মামার কাছ থেকে কেউ একজন লিজ নিয়েছে বিজনেসের জন্য। আমরা দু'জনেই নিজেদের জগতে ব্যস্ত এখন। দেখাসাক্ষাৎ কমই হয়। ওই ফোনেই যা। কিন্তু এই বাড়িটার উপর কেমন একটা টান আমাদের। শেষবার এখানেই তো চারজন একসঙ্গে হয়েছিলাম!

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আমরা বাইরে বসে। সামনে ধানক্ষেত। আরেকটা পরিবার আছে দোতলায়। ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হচ্ছে। রাত একটা হবে।

আমরা কেউ কোনো কথা বলছি না। বলতে ইচ্ছা করছে না। হঠাৎ দেখি বিপুলের মুখের ভাবটা কেমন ফ্যাকাসে। আমার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইছে। আমি প্রথমে ভাবলাম শরীর খারাপ লাগছে হয় তো ওর… কিন্তু ওর আঙুলের ইঙ্গিতটা ধরে তাকিয়ে দেখি আমাদের সামনের দোলনাটা অল্প অল্প দুলছে…

আমি বললাম, আরে কিছু নয়… কতদিন হয়ে গেল বল তো…

বলতেই দোলনাটা একবার শূন্যের দিকে উঠে ধড়াস্ করে পড়ল…

=========== =======

এরপর থেকে আমরা প্রতি বছর রাশির জন্মদিনে মাটিকুমড়ো যাই। আমি আর বিপুল। আমাদের আড্ডা হয়। অসুবিধা হয় না। দেখা না গেলেও আমরা যে চারজনই আছি, অনুভব করি। আজ বুঝি, মানুষ একটা অনুভব ছাড়া আর কিছু নয়।

Tuesday, August 30, 2022

আপনজন


কথাটা ঠিক মাছ ধরা না। কথাটা হল সময় কাটানো। নইলে এই পুকুরে কি এমন মাছ হয় যে সকাল আটটা থেকে বেলা দুটো অবধি বসে থাকা যায়?

নকুড় ছিপ ফেলে বসে থাকে। ঘাসের উপর বসা প্রজাপতি দেখে। পুকুরের ওপারে ঘন বাঁশঝাড়ে বসা মাছরাঙা, পানকৌড়ি, বক দেখে। মাঝে মাঝে ছিপে আটকানো মাছ জলে ছেড়ে দেয়। ছিপটা মাথার কাছে রেখে শোয়। আকাশ দেখে। মেঘ দেখে। বুকের ভিতর কাকে যেন খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে খেই হারিয়ে যায়। যেমন তার আশেপাশে সব মানুষ হারিয়ে গেছে। নকুড়ের দুঃখও হয় না। দুঃখ পেতে মন লাগে। নকুড়ের মনই নেই। শুকিয়ে মরে গেছে।

শরৎ আসছে। নকুড় শুয়ে শুয়ে সাদা মেঘের উড়ে যাওয়া দেখছে। আচমকা ওপারের বাঁশঝাড়ে খড়মড় আওয়াজ হতে ফিরে তাকালো নকুড়। একটা বেশ ঢ্যাঙা লোক। সরু সরু হাত-পা। একটা নীল প্যান্ট আর হলুদ ফতুয়া গায়ে দাঁড়িয়ে।

নকুড় ভুরুটা কুঁচকে তাকালো। গ্রামের এদিকে একে কেউ আসেটাসে না। আর একে তো দেখেইনি কোনোদিন এ গ্রামে।

ও বাব্বা! একি একি! লোকটা একটা পা বাড়িয়ে দিল, পা-টা ইয়া লম্বা হয়ে পুকুরের এই ঘাটে এসে পড়ল। নকুড়ের থেকে দশ হাত দূরে হবে। নকুড় ধড়মড় করে উঠে বসল। ততক্ষণে আরেকটা পা ইলাস্টিকের মত লম্বা করে সে এদিকে এসে দাঁড়িয়েছে। কানের পাশ থেকে একটা বিড়ি বার করে বার দুই তাতে বাঁশির মত ফুঁ দিয়ে বলল, মাচিস আছে?

মাচিস মানে দেশলাই। আছে। কিন্তু এ কে রে বাবা?

নকুড় লুঙ্গির প্যাঁচ খুলে দেশলাই বার করতেই লোকটা আবার ইলাস্টিক হাতে ছোঁ মেরে নিয়ে, ফস্ করে বিড়িটা ধরিয়েই, আবার ধাঁ করে তার লুঙ্গির মধ্যে পেঁচিয়ে রেখে দিল।

কি ঠাণ্ডা হাতের আঙুলগুলো রে বাবা!

লোকটা পাশে বসে পড়ল। বলল, মাছ উঠেছে? এদিকের পুকুরে মাছ হয় না তেমন…আগে হত… বঙ্কিম তখন ছোটো… ওর এক পিসের বাড়ি ছিল এখানে… সেই যখন আসত… আহা কি আনন্দ…! এই পুকুর থেকেই কত মাছ উঠত…।

নকুড়ের মুখটা হাঁ হয়ে গেছে। এটা হয়। নকুড় বুঝল জিভে ঠাণ্ডা হাওয়া লাগতেই। সে বলল, বঙ্কিম?

লোকটা বলল, বাঙালি তো?

হ্যাঁ…

বইটই পড়া হয়?

হ্যাঁ… ওই কিছু কিছু…

এ সব মাস্টারি কথা ভালো লাগে না নকুড়ের… সত্যি বলতে স্কুলে যেতেই ভালো লাগত না… কি জানে না সেই নিয়ে মাস্টারদের এত উৎসাহ তার ভালো লাগত না… সাপের গর্ত, ইঁদুরের গর্ত চেনে না… ওদিকে নাকি গ্রহ-নক্ষত্রের হিসাব কষছে… না পারলে কান মুলে দিচ্ছে… দূর দূর…

ঢ্যাঙা লোকটা বলল, আরে মশায় বঙ্কিম চ্যাটুজ্জের নাম শোনেননি? লিখতেন টিকতেন… বন্দে মাতরম…

ও হ্যাঁ হ্যাঁ… মানে আপনি…

হ্যাঁ হ্যাঁ… আমি মানুষটানুষ নই… ওসব পাট অনেক দিন হল চুকিয়েছি… মেলা দিন কারোর সঙ্গে কথাটথা হয় না… তা আপনাকে রোজ দেখি মাছ ধরার ঢং করে এখানে পড়ে থাকেন… তাই ভাবলাম আপনার নিশ্চয়ই সাতকূলে কেউ নেই… তাই আমায় দেখে অক্কা পেলেও কারোর খুব একটা ক্ষতিটতি হবে না…তাই না?

নকুড়ের ভয় লাগতে শুরু করছিল… কিন্তু এমন একটা দুর্বল জায়গায় আঘাত পড়ল… ভয় কেটে অভিমান হল। কার উপর হল জানে না। কিন্তু হল। নকুড় বলল, তা আমার কেউ নেই বটে… তা আপনারও তো কেউ আছে বলে মনে হয় না…

লোকটা তার দিকে তাকালো। হাসল। বলল, মনে লেগেছে কথাটা না? লাগবেই তো… তা যাক… সত্যিটা মেনে নেওয়াই ভালো… নইলে রাস্তা বেড়ে যায়… না?

নকুড় 'হ্যাঁ' বা 'না' কিছুই বলল না। সামনে একটা নীলকণ্ঠ এসে বসেছে। কি রঙ!

লোকটা বলল, আমার নাম যতীন। যতীন বাড়ুজ্জে। জন্ম আঠারোশো তিরিশ, মৃত্যু বিষ খেয়ে আঠারো শো বাহাত্তর। নিবাস নৈহাটি।

নকুড় চুপ করে থাকল। দিনদুপুরে এমন আলাপী ভূতের সঙ্গে বসে থাকাটা কেমন হচ্ছে বুঝতে পারছে না। তার কি ভয় পাওয়া উচিৎ? রামনাম করা উচিৎ? আসলে কোনোদিনই যখন যেটা দরকার সেটা অনুভব হয় না নকুড়ের। ফুলশয্যার রাতে বউকে গোপালভাঁড়ের গল্প শুনিয়ে রাত কাবার করে দিয়েছিল। বউ তো রেগেমেগে বাপের বাড়িই চলে গিয়েছিল মাস তিনেকের জন্য। ভেবেছিল সে পাগল বুঝি! পরে অবশ্য বুঝেছিল পাগল নয় নকুড়, তবে আর পাঁচটা লোকের মতও নয়।

দু'জনেই চুপ করে বসে। ভূত হোক আর যাই হোক, একেবারে কথা না বলাটা অভদ্রতা, সে যখন যেচে এসে আলাপ করেছে। নকুড় গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, তা আপনার থাকা হয় কোথায়?

যতীন সামনের বাঁশঝাড়টা দেখিয়ে বলল, ওর পিছনে একটা জলা আছে না? তার পাশে যে মৈত্রদের বাড়ি… তার দোতলায়, ভাঁড়ার ঘরে।

নকুড়ের কথা শেষ। এমনিতেই বহুদিন হল কথা বলার অভ্যাসটাই চলে গেছে। কেউ তার সঙ্গে তেমন একটা কথা বলে না, সেও বলে না। মানুষের সঙ্গেই যখন কথাটথা নেই, তখন আবার ভূতের সঙ্গে…

যতীন বলল, চলো একটা জিনিস দেখাই তোমায়…।

এই বলে নকুড় কিছু বোঝার আগেই যতীন ধাঁ করে নকুড়কে তুলে সামনের বটগাছটার একদম মগডালে বসিয়ে দিল। নিজেও বসল পাশে। বলল, দেখো, কি দারুণ দেখায় না এখান থেকে? … ওই দেখো চূর্ণী নদী… ওই দেখো ট্রেন লাইন… ওই দেখো হরেন বক্সির মাঠ…

নকুড় এত হতভম্ব হয়ে গেছে যে সে কথাই বলতে পারছে না। রাগ হওয়া উচিৎ ছিল তার। হল না। বরঞ্চ ভীষণ হাসি পেল। এই এত বয়সে কেউ তাকে কোলে নিতে পারে ভাবতেই ভীষণ হাসি পেতে শুরু করল। হাসা তো যায় না। কি মনে করবে যতীন। নকুড় বলল, বাহ! দারুণ সত্যি। আচ্ছা আপনি আমায় এইভাবে পুরী নিয়ে যেতে পারেন? আমার আসলে…।

বলতে বলতে একরাশ লজ্জা এসে তার গলা চেপে ধরল। তার মধ্যে যে এখনও কোনো ইচ্ছা এইভাবে ঘাপটি মেরে তাকে লুকিয়ে জীবিত আছে জেনেই লজ্জায় মাথাটা নীচু হয়ে গেল নকুড়ের।

যতীন বলল, সে হতেই পারে। কিন্তু আপনি অসুস্থ হয়ে যাবেন। অতটা রাস্তা ঝোলাপথ…মানে ঝুলে ঝুলে যাওয়া ঠিক নয়… তাই না?

নকুড় বলল, তা তো ঠিক।

কতক্ষণ গেল সময় বলতে পারবে না নকুড়… হঠাৎ দেখে কই, যতীন নেই তো? চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল। নেই। এদিকে আর খানিক বাদেই সন্ধ্যে হয়ে যাবে। এইবার? কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল নকুড়। আর অপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু এই এতবড় গাছে তো ওঠেইনি কোনোদিন, নামবে কি করে?

কান্না পেল নকুড়ের। দুটো হাতে দুটো গাছের ডাল ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল। আবারও আশ্চর্য হল। এত কান্না আছে তার মধ্যে জমে? যত কাঁদে তার মনটা তত তাজা হয়ে যায়। কি আশ্চর্য! সবার কথা মনে করে করে ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করল নকুড়। যত কাঁদে তত মনের মধ্যে কি একটা উৎসাহ ভরে ওঠে। এই তো বেঁচে আছে সে…এই তো বেঁচে আছে…

এদিকে এত কান্নাকাটির চোটে খেয়ালই করেনি কখন অন্ধকার হয়ে গেছে চারদিক। ঝিঁঝিঁ ডাকছে। জোনাকি জ্বলছে। শিয়াল ডাকছে। এইবার?

কিছু বোঝার আগেই ঠাণ্ডা দুটো হাত তাকে জাপটে ধরল। নকুড় ভয়ে চোখ বন্ধ করে দিল। চোখ খুলেই দেখে সে তার বাড়ির উঠোনে শুয়ে। তার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে আছে যতীন। বলছে, এক ঘন্টা পরে উঠো, কোমরটা টাটাবে নইলে… আর শোনো, বুঝেছ তো এখনও অনেক কাজ বাকি… যা করতে হবে শুরু করে দাও…

নকুড় মাথা নাড়ল। মনের মধ্যে এমন মিহি সুখ কদ্দিন পায়নি। ঘুম চলে আসছে।

এরপরের গল্প তেমন কিছু নেই। নকুড় একটা ট্র্যাভেল এজেন্সি খোলে। নাম দেয় যতীন ট্র্যাভেল। পুরী, কাশী আর হরিদ্বার। তীর্থযাত্রী নিয়ে যায়। লাভ যত না হয় তৃপ্তি হয় তার চাইতেও বেশি। লোকে বলে নকুড়দার সঙ্গে যাওয়া মানেই তীর্থ সার্থক।

নকুড় বুঝেছে, সংসারে চলতে চলতে পরিজন বাড়লেও আপনজন বাড়ে না। আপনজনের খোঁজেই মানুষ তীর্থে পা বাড়ায়। সবাই কি আর পুণ্য খোঁজে? বুকের ভিতর ঈশ্বরকেও আপনজন করে চায় মানুষ। আপনজনের স্পর্শ জগতের পবিত্রতম স্পর্শ। সেই স্পর্শে লোহা সোনা হয়। মানুষের আসল খোঁজ সেই আপনজনের খোঁজ।

মাঝে মাঝে অবশ্য উদাস হয় নকুড়। যতীনকে খোঁজে। পায় না। যতীনকে মনে পড়লেই বঙ্কিমচন্দ্র পড়ে নকুড়। ভালো লাগে। মন খারাপের মধ্যেও সুখ হয়। কেউ যেন তার আছে। কোথায় আছে তা জানে না। কিন্তু কেউ একজন যে আছে সে জানে। আর সেই জানাতেই কি শান্তি!

 

(ছবি Suman)

 

Friday, July 29, 2022

এই তো... এই তো..

গাছ থেকে নেমেই বদনের যেটা খেতে ইচ্ছা করল, সেটা হল সুজি। মা করত। গুড়ের সুজি। লাল। মাখা মাখা।

প্রচণ্ড গরম। গাছে উঠেছিল কেন মনে পড়ছে না। একটাও আম নেই। খানিক কাঠ পিঁপড়ের কামড় জুটেছে। খিদে পেয়েছে প্রচণ্ড। খাবে কি?

বদনকে কেউ কাজ দেয় না। কারণ বদন এক কাজ বেশিদিন করতে পারে না। সবাই বলে বদনের মাথায় গোলমাল। বদন বিশ্বাস করে না। কার না মাথায় গোলমাল? সে হিসাব দিতে গেলে গঙ্গার সব জল বয়ে সমুদ্দুরে গিয়ে পড়বে। থাক।

বদন কিছুক্ষণ গাছ তলায় বসল। সকাল থেকে চারবার গঙ্গাস্নান হয়ে গেছে। শিবের বাতাসা চারটে খেয়েছে। জল খেয়েছে দুই জালা। কিন্তু আবার খিদে পাচ্ছে।

বদন উঠল। সুজি কে দেয়? বদন জানে কাউকে চাইলেই তাড়াবে। কিন্তু সুজি না খেয়ে সে যাবে না। কোত্থাও যাবে না। অবশ্য যাবেই বা কোথায়?

গ্রামে এলো। প্রায় পনেরো বাড়ি জিজ্ঞাসা করল। কেউ দিল না। বলে কাল করেছিলাম, পরশু করেছিলাম, আবার পরে করব, এই সব।

বদন বাড়ি চলে এলো। ঘরের অর্ধেক ছাদ ভাঙা। সেই অর্ধেকেই যতটা ছায়া হয় তাতেই সে দিনে শোয়। বৃষ্টি হলে শিবের মন্দিরে গিয়ে শোয়।

ঘুমিয়ে পড়ল কখন কে জানে। স্বপ্নে দেখল মা আর শিব তার জন্যে সুজি নিয়ে গঙ্গার ধারে বসে আছে। সে গিয়ে শিবের পাশে বসল। মা তাকে আর শিবকে সুজি বেড়ে দিল। পাতায় করে। লাল সুজি।

পেটটা মোচড় দিল। ঘুম ভাঙতেই কান্না পেলো। বেশ কিছুক্ষণ কাঁদল বদন। তারপর মুখ ধুতে গঙ্গায় নামল। বাড়ির সামনেই গঙ্গা।

এই বদন… বদন…

রথীনের দাদু। রথীন আরবে কাজ করে। রথীনের দাদু একা থাকে। আগে কি সব ব্যবসা করত। বদনকে দু চক্ষে দেখতে পারে না। ডাকে কেন? মারবে?

রথীনের দাদু ডাকল। গাছ তলায় বসে। বিরাট অশ্বত্থ গাছ। এই গাছেই রথীনের বাবা গলায় দড়ি দিয়েছিল। কি ধারদেনা হয়েছিল। আর রথীনের মা বাপের বাড়ি চলে গেল। পাগল কি বদন একা নাকি? কেউ মরলে ধার শোধ হয়?

বদন সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রথীনের দাদু তাকে পাশে বসতে বলল।

বদন বলল, তুমি আমার সঙ্গে ভালো ব্যাভার কেন করছ গো জেঠু? শরীর খারাপ?

রথীনের দাদু বলল, আরে বস না…. বলচি..

বদন একটু দূরত্ব রেখে বসল। খিদে পাচ্ছে। জোর খিদে পাচ্ছে। মনে হচ্ছে গাছের পাতাগুলো চিবিয়ে খায়।

আমার ছেলেটা রোজ রাতে আমার বিছানার পাশে এসে বসে। আমার ভয় লাগে বদন। তুই আমার সঙ্গে রাতে একটু শুবি?

কেন বুড়োদা আসে কেন? বদনের অবাক লাগল শুনে।

সে আমি জানি না বদন। খালি ভয় দেখায় আর বলে তুমি টাকা ক'টা দিলে আমার ধার শোধ হয়ে যেত। আমায় মরতে হত না।

তা তুমি দাওনি কেন?

আরে আমার ওই টাকাক’টা বুড়ো বয়সের সম্বল না… দেয়? আমার সব যাবে….

বদন চিন্তিত মুখে বলল, তাও ঠিক। আচ্ছা শোবো। কিন্তু কি দেবে?

রথীনের দাদু বলল, কি আর দেব, খাবি আমার সঙ্গে… এখানে সেখানে ভিক্ষা করে বেড়াতে হবে না…..

রথীনের দাদু চলে গেল। বদন বসে থাকল গাছের নীচে। বুড়োদা সত্যিই আসে?

আসি তো…

একটা গলা। বুড়োদার তো…

বদন বলল, কেন আসো? কই তুমি?

বুড়ো বলল, দেখে কাজ নেই। এমনিই তোর মাথার ঠিক নেই তার উপরে দিন দুপুরে ভূত দেখে আরো বিগড়াক।

বদন বলল, সে ভালো… কি থেকে কি হয়ে যায় বলা তো যায় না…. তা তুমি মরে ভালো আছ তো?

বুড়ো বলল, সে আছি। শোন তুই রাতে গেলে কিন্তু তোর ঘাড় মটকে দেব… বাবাকে ভয় দেখিয়ে আমি কিছু টাকা বার করতে পারি নাকি দেখি….

বদন বলল, হায় রে… মরেও টাকা লাগবে তোমার? ওখানেও ধার?

মাথায় চাঁটি পড়ল।

যা বুঝিস না তা নিয়ে বকবি না। ওই টাকাগুলো নিয়ে বাবা কি করবে বল তো… সব তো পচবে… কাউকে নমিনি করেনি… পাছে ওকে মেরে টাকা নিয়ে নেয়.. সেই ভয়ে… এত পাজি…

বদন বলল, কাউকে নিন্দা করতে নেই। যার টাকা সে যা খুশি করুক। তোমার তাতে কি?

আবার চাঁটি।

যার টাকা মানে? আমার বাপের টাকা… যা হোক শোন… টাকাটা আমি আজ না হয় কাল বার করবই… তুই একটা কাজ করতে পারবি?...

আগে শুনি।

বদন দেখল মানুষের সঙ্গে বুদ্ধিমানের মত কথা না বললেও ভূতের সঙ্গে বেশ বুদ্ধিটা খুলেছে তো!

টাকাটা নিয়ে রাতে শিব মন্দিরে আসবি। মানসী আসবে। ওকে দিয়ে দিবি।

তোমার বউয়ের নাম তো সন্ধ্যা না?

আবার চাঁটি।

ওরে মানসী আমার হবু ছেলের বউয়ের নাম। ওকে বাবু ভালোবাসে। আমি ওদের কথা শুনি রোজ।

সেটা ভালো নয়… ভূত বলে যেখানে সেখানে আড়ি পাতবে?

আবার চাঁটি…

না হলে জানব কি করে আজ গোবিন্দ ওঝার বাড়ি গুড়ের সুজি হয়েছে?...

বদন তড়াক করে লাফিয়ে উঠল…. তাই? যাই তবে…

ওহ, গেলেই যেন পাত পেড়ে খাওয়াবে রে হতভাগা তোকে…. এই নে… আমি এনেছি…

হঠাৎ একটা শালপাতায় বদনের সামনে লাল সুজি চলে এলো। আহা কি গন্ধ… আবার কাজু কিসমিস দেওয়া…

বদন খেতে বসে গেল। আনন্দে তার চোখের থেকে কয়েক বিন্দু জল সুজিতে পড়ে একটু নোনতা লাগল। সে ভালো। গরীবের জিভে এত স্বাদ ভালো নয়।

বুড়ো বলল, শোন, আমি রোজ তোকে এখানে খাবার এনে দেব… আর মানসীকে টাকাটা দেওয়ার পর ওর থেকে কিছু টাকা দিয়ে ঘরটা বানা… মানুষের মত থাক…

বদন বলল, কিন্তু তুমি আমার জন্যে এত করবে কেন? আমি যে পাগল….

বুড়ো বলল, মরার পর থেকে তোকে দেখি আর ভাবি, কি ভুলটাই করলাম রে…. মানুষ যদ্দিন ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তা করবে তদ্দিন তার জীবনে শান্তি নেই রে…. তোকে দেখে শিখলাম…. ভবিষ্যতে যা হবে দেখে নেওয়া যাবে… এইটাই ভালো….

তাই তো গো… তোমাকে আর আমার ঘর বানাবার টাকা দিয়ে লাভ নেই… আমার শুনেই কেমন ভয় করছে… তুমি বরং আমায় মাঝে মাঝে কিছু খাইয়ো… ঠিকাছে?

আরে! কখন যে মেঘ করেছে বদন খেয়ালই করেনি। হুড়মুড় করে চারদিক কালো করে বৃষ্টি নেমে গেলো।

বদন দৌড়ে শিব মন্দিরে এসে ঢুকল। কেউ নেই ফাঁকা। বদনের মনে দারুণ আনন্দ। এত্ত ভালো সুজি সে কোনোদিন খায়নি। ঘুম চলে এলো। বদন স্বপ্ন দেখছে, শিব সে আর বুড়োদা তার বাড়ির অর্ধেক ছাদে বসে চাঁদ দেখছে। আর তার মা উঠানে খিচুড়ি রাঁধছে। সে খিচুড়ির গন্ধ পেয়ে চাঁদের বুড়ি বলছে, আমার জন্যে একটু রেখো বউমা। তার মা রাঁধতে রাঁধতে বলল, আচ্ছা মা।

ঘুম ভেঙে গেলো। আকাশে এত্ত বড় চাঁদ। মা কই?

মন খারাপ হয়ে গেল বদনের। যদিও জানে মা এখানেই কোথাও আছে, আবার তার ঘুমের মধ্যে চলে আসবে। তাই ডাকল, মা?

সাড়া এলো না। আবার ডাকল, ও মা.. মা…

একটা বেড়াল ঢুকলো, সঙ্গে তার তিনটে বাচ্চা। বদন হাততালি দিয়ে বলল… এই তো… এই তো…

বাইরে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। বুড়োদার। বলল, তুই ঠিক বদন.... ভেবে ভেবেই আমি শেষ হয়ে গেলাম....

বদন শোনেনি। সে তখন বেড়ালের বাচ্চা আদর করতে ব্যস্ত।

Saturday, July 23, 2022

সিট ভেজানো লোকটা

প্রচণ্ড বৃষ্টি। রাস্তায় আটকে গাড়ি। জ্যাম।

দরজায় ধাক্কা দিল। দাদা, একটু খুলবেন? প্লিজ!

কাকভেজা মধ্যবয়েসী লোক একটা। গাড়িতে এসে বসল। সারা গা চুঁইয়ে জলে ভিজছে সিট।

সরি স্যার। আমায় হাস্পাতালে নাবিয়ে দেবেন একটু! আমার মেয়েটার অপারেশান! প্লিজ!

কিন্তু গাড়ি তো চলছে না। এক ঘন্টা দাঁড়িয়ে।

এক্ষুণি ছাড়বে স্যার.. সামনে একটা অ্যাক্সিডেন্টে হয়েছে... আপনিই তো অপারেশনটা করবেন.. আমি আপনাকে চিনি স্যার... এক্ষুণি রাস্তা ক্লিয়ার হয়ে যাবে। চলুন প্লিজ...

গাড়ি ছাড়ল।

মোড়ে একটা জায়গায় জমায়েত। স্কুটার আর বাসের ধাক্কা।

হাস্পাতালে গাড়ি এলো। লোকটা, হাতজোড় করে নমস্কার করে নেমে ভিড়ে মিলিয়ে গেল। বার বার বলতে বলতে গেল, একটু দেখবেন স্যার... মেয়েটার মা নেই... আমি আর কদ্দিক সামলাই....

স্যার... এদিকে... ইমার্জেন্সি... একটা অ্যাক্সিডেন্ট কেস... ব্রট ডেড..

ট্রলিতে শোয়ানো শরীর। নিথর। গাড়িতে পাশে বসা বৃষ্টিভেজা সিট ভেজানো লোকটা, সহযাত্রী।

Sunday, April 3, 2022

ঘুড়ি.. ঘুড়ি.. ঘুড়ি

 

অনেক রাত। নতুন বাড়িতে এমনিই আমার ঘুম আসে না। জানলার কাছে এসে দাঁড়ালাম। ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে পাশের বাড়ির জানলা। বাচ্চাটা এখনও ঘুমায়নি। দুদিন হল এ বাড়ি এসেছি। রোজই দেখি সন্ধ্যে হলেই বাচ্চাটা ওর ঘরে জানলার উপর বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকায়, কিন্তু কথা বলে না। ওই বাড়িটা নাকি এক অধ্যাপকের। স্বামী স্ত্রী দুজনেই অধ্যাপনা করেন।

এখনও বাচ্চাটা জানলায় বসে। আমারও ঘুম আসছে না। বাচ্চাটাকে ডাকলাম। তাকালো। কথা বলল না। খাটে গিয়ে শুয়ে পড়ল। সেও আবার এ পাশ ফিরেও না। ওদিক ফিরে।

প্রায়ই এরকম হয়। আমি একদিন আমার দিদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোর সঙ্গে কথা বলে?

দিদি বলল, খুব একটা না, টুকটাক। একদিন দুপুরে ওর আঁকা ছবিগুলো জানলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছে। দারুণ আঁকার হাত রে! ব্যস, ওইটুকুই।

কিন্তু আমার সঙ্গে কথা বলে না। কোন ক্লাসে পড়ে ছেলেটা?

দিদি বলল, থ্রিতে। ওর নাম প্রতুল। ডাক নাম বুকাই।

বাবা! এত কথা?

আমি একদিন সন্ধ্যেবেলা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে। প্রতুল জানলায় বসে। প্লেন যাচ্ছে, দেখছে। আমি ডাকলাম, এই প্রতুল…প্রতুল….

শুনল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল শুধু। হঠাৎ আমার পিছনে এসে দিদি দাঁড়ালো। বলল, কার সঙ্গে কথা বলছিস?

আমি জানলা দেখিয়ে বললাম, কেন প্রতুল… ওই দেখ জানলায় দাঁড়িয়ে…

দিদি বলল, চোখের মাথা খেয়েছিস… এই তো আমার সঙ্গে ওর আঁকার খাতাটা নিয়ে এসেছে… ওই তো….

আমার খাটের উপর বসে প্রতুল। আমি আবার জানলার দিকে তাকালাম, আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে প্রতুল ওর ঘরের জানলায় বসে। আমি আবার খাটের দিকে তাকালাম। এই তো বসে! তবে?

আমার মাথা ঘুরছে। বমি পাচ্ছে। আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। তবু জোর জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার কি কোনো ভাই আছে প্রতুল..

প্রতুল বলল, ছিল, ঘুড়ি পাড়তে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে… বিপুল…. আমরা যমজ ছিলাম…

আমি আবার জানলার দিকে তাকালাম। চমকে উঠলাম। বিপুল আমার জানলার রড ধরে দাঁড়িয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে নীচের দিকে তাকাচ্ছে, বলছে ঘুড়ি… ঘুড়ি… ঘুড়ি….

Tuesday, March 22, 2022

শুনতে পাচ্ছ?

আড়াইটে বাজতে তিন মিনিট বাকি। এত রাতে টয়লেটে যেতে বিরক্তই লাগে। কিন্তু উপায় কি?

উঠল, টয়লেটের দরজায় ঠেলা দিল। দরজা বন্ধ। ভিতর থেকে।

আবার এসে শুলো। পাশে জয়তি নেই। ও-ই গেছে। শুয়ে পড়ল।

কিন্তু খানিকবাদেই আবার ঘুম ভেঙে গেল। জয়তি তো আমেদাবাদে। সে তো সোদপুরে।

আবার উঠে টয়লেটের দিকে এগোলো। এবার ভয় লাগছে। গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে। আগেরবার কি আস্তে ঠেলেছিল?

টয়লেটের দরজাটায় ঠেলা দিতেই খুলে গেল। আলো জ্বালালো। টয়েলেটে কেমন একটা গন্ধ। অচেনা। কিন্তু চেনাও যেন।

আলো নিভিয়ে খাটে উঠতে যাবে, চোখে পড়ল, বাইরের দরজাটা হাঁ করে খোলা। সিঁড়ির আলোটা ঘরে ঢুকছে। আগে খেয়াল করেনি কেন খাট থেকে নামার সময়?

বাইরের দরজাটা লাগাতে যাবে, হঠাৎ জোরে একটা শব্দ হল। টয়লেটের দরজাটা জোরে বন্ধ হল।

ঘাম হচ্ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। তবে কি জয়তি? ঠাট্টা করছে। আগেই এসে গেছে। লুকিয়ে ছিল?

খাটে উঠে জয়তিকে ফোন করল। প্রায় কেটে যাওয়ার আগে ওপার থেকে ঘুম জড়ানো গলায় জয়তি বলল, কিগো... সব ঠিক আছে?

শুভ্রাংশু বলল, হাত লেগে গো... সরি....

না না... ঠিক আছে.... এই শোনো... আমার সেই মাসতুতো বোন আছে না... মলি... আরে সেই আমাদের ফ্ল্যাটে এসে ছিল না পরীক্ষা দেবে বলে কি একটা.... আরে রাতদিন টয়লেটে ঢুকে থাকত... তুমি বিরক্ত হতে... ও না গলায় দড়ি দিয়েছে জানো.... কি যে খারাপ লাগছে....

টয়লেটের দরজাটা অল্প খোলা। দরজাটা হাওয়ায় দুলছে। একটা মিষ্টি গন্ধ আসছে ভেসে। একটা আবছা শরীর... এদিকে তাকিয়ে।

ওপাশে জয়তির গলা... হ্যালো.. কি গো শুনতে পাচ্ছ... হ্যালো... হ্যালো...

 

Wednesday, December 8, 2021

বোকা কোথাকার!

ঘুঁটেগুলো তুলে নিয়ে ফিরতে যাবে, হঠাৎ গাছের উপর থেকে কেউ যেন বলল, দুটো দিয়ে যা না রে, ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি, একটু আগুন জ্বেলে বসি।

রমার ঠাকুমার তো দাঁত কপাটি লাগার জোগাড়। "রাম রাম" বলতে আবার দু পা এগিয়েছে, অমনি গাছ থেকে আবার সে বলল, রাম নামে পালাবো আমি অমন পাপী ভূত না রে, ভ্যাকেন্সি নেই উপরে তাই মাঝখানে রিজার্ভে আছি। বডি পেলেই ঢুকে যাব।

রমার ঠাকুমা বলল, গোনাগুনতি ঘুঁটে, এও যদি দিই লোকসান হবে যে!

গাছের উপর থেকে সে বলল, খুব লোকসান হবে? তবে এক কাজ কর বাড়ি থেকে একটা কম্বল দিয়ে যা অন্তত।

রমার ঠাকুমা বলল, সেও নেই। যা আছে তাতেই আমরা কুলিয়ে উঠতে পারি না। তোমায় দিলে তো আর...

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল, তবে কি ঠাণ্ডায় মরে যাব রে....

রমার ঠাকুমা সাহস করে বলল, আর কতবারই বা মরবে দাদা....

সে বলল, তাও। তবু.. আচ্ছা এক কাজ করবি? আমায় তো কিছুক্ষণ জড়িয়েও বসতে পারিস। ভূতে আর কি ভয় বল?

রমার ঠাকুমার কান, নাক, গাল গরম লাল হয়ে গেল। চটপট একটা ঘুঁটে মাটিতে রেখে বলল, এই নাও বাপু, আমি যাই।

রমার ঠাকুমা ফিরছে। কিন্তু মনের মধ্যে কি যেন একটা হয়ে গেল। খালি খালি ফিরতে ইচ্ছা করছে। সব ঘুঁটে দিয়ে আসতে ইচ্ছা করছে। বাইশ বছরের নিস্তেজ শরীর-মনটা যেন পুরীর সমুদ্রের মত ডেকে ডেকে উঠছে।

রমার ঠাকুমা ইষ্টদেবকে স্মরণ করে বলল, আমায় রক্ষা করো ঠাকুর।

রমার ঠাকুমা স্পষ্ট দেখল, ঠাকুর সামনের রাস্তার আলোর নীচে দাঁড়িয়ে, এক হাতে বাঁশিটা নিয়ে, মুচকি হেসে, তার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল, বোকা কোথাকার!