বসন্তই জানে
ক্ষণকালের পাত্রটুকু
মাধুর্যে ভরিয়ে দিতে যা লাগে
সে আর কিছু না
লাগে কয়েক লহমার পাগলামি
( ছবি Debasish Bose)
সাহিত্য জগতে অনেক পারিজাত, পদ্ম, গোলাপ ফুটে আছে। আমি আমার আগাছা ভরা বাগানে কিছু বনফুল ফুটিয়ে রাখলাম। আগাম ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালাম যদি পথ ভুলে কেউ এ বাগানে এসে থাকেন।
বসন্তই জানে
ক্ষণকালের পাত্রটুকু
মাধুর্যে ভরিয়ে দিতে যা লাগে
সে আর কিছু না
লাগে কয়েক লহমার পাগলামি
( ছবি Debasish Bose)
তার দিকে তাকিয়ে থাকে রোদ
তার দিকে তাকিয়ে থাকে গাছ
আর তাকিয়ে ডালে বসে থাকা পাখি
তার জন্যে ভেসে বেড়ায় বাতাস
তার জন্যে আকুল ফুলের গন্ধ
তার জন্য ফিরে ঘুরে আসে দিন
তার জন্য ঘুরে ফিরে আসে রাত
তার চোখের পলকে পলকে
এত ছন্দ, এত সুর, এত আনন্দ-পরমাদ
তার মুখের উপর
এক উদাসীন নিষ্ঠুরের বাস
তার বুকের উপর ছলনাময় নদী
সে ডাকে
ফিরে আসার রাস্তায় ওড়ে ধুলো
সূর্যাস্তের রঙে জাগে বিষাদ
তার স্মৃতি নিশাচরের মত জাগিয়ে রাখে রাত
ভোর হয়
তারই জন্য আবার
শিশিরভেজা ঘাসে
তারই সুস্পষ্ট পায়ের ছাপ
এখনও দক্ষিণেশ্বর মন্দিরপ্রাঙ্গণে সে ঘরটা,
সে খাটটা আছে
যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ বসতেন
সেই মেঝেটা আছে
যেখানে তিনি নরম পা দুটো রাখতেন
সে জুতোটাও আছে
যে জুতোটা অমন দেবতুল্য শরীরটা বহন করত
এখনও কথামৃত ছাপা হয়
এখনও দোকানে, বাড়িতে, বাসে, অটোতে
শ্রীরামকৃষ্ণের ছবিটা দেখা যায়
এখনও অমন দেবতুল্য মুখটা
বিপদে, সংশয়ে, জাগরণে, ঘুমে
হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়
বারবার শুনি
দেবতুল্য কণ্ঠে সে বাণী
ঈশ্বর, আল্লাহ, গড,
নামের পার্থক্য রে
একজনকেই ডাকছে সবাই
দুই বলে কিছু নেই
বিশ্বাস করেছি
কারণ শ্রীরামকৃষ্ণকে বিশ্বাস করেছি
নিজের থেকে বেশি,
নিজের সব দুর্বুদ্ধি, স্বার্থবুদ্ধি থেকে বেশি
অসহায় কান্নায় বারবার বলতে বাধ্য হয়েছি
আমাকে বাঁচাও
আমার দৈন্য থেকে, ক্ষুদ্রবুদ্ধি থেকে
সত্যের শরীর হয় না
প্রেমের শরীর হয় না
আত্মা হয়
লাথিটা লেগেছে
ভীষণ জোরে লেগেছে
আমার বুকে না
আমার ঠাকুরের বুকে
একের বুকে
দুই নেই যে!
যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে
তার সামনে ভীষণ ভিড়
এত ফুল। এত দক্ষিণা।
সে তৃষিত চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে
কেউ “মা” বলে ডেকে গেল
কিছু না চেয়ে
যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে
সে আরেকবার সে ডাকটা শুনবে বলে
অপেক্ষায় ডুবে গেল
কত কেউ তো এলো গেল
কত মন্ত্র, কত স্তব,
কত কী তো হয়ে গেল
সে কই?
যে কিছু না চেয়ে
শুধু “মা” বলে ডেকে গেল
যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে
তার চোখের কোলে এক পশলা বৃষ্টি জমল
তার কাছে কি খবর গেল?
শুধু এইটুকু হোক
সামনে এসে দাঁড়ালে
তোমার প্রয়োজনটাও
আমার প্রয়োজনের পাশাপাশি
প্রতিফলিত হোক
শুধু এইটুকু হোক
পাশে এসে বসলে
তোমার যা কিছু খামতি
তার পাশাপাশি
যা কিছু খামতি আমারও
তাও প্রতিফলিত হোক
শুধু এইটুকু হোক
সাহায্যের হাত বাড়াই যখন
অহমিকা না,
প্রাণে বয়ে যায়
যে প্রসন্নতার ধারা
শুধু সে শান্তিই প্রতিফলিত হোক
শুধু এইটুকু হোক
তুমি সে নও
যে তুমি ধ্রুব। শাশ্বত। চিরকালের।
সে মিথ্যা
তুমি সে
যার নয়নে নয়ন রেখে দেখি
বালির স্রোতের মত সরে সরে যাওয়া
ভঙ্গুর, অ-ধ্রুব, চঞ্চল এ সংসারকে
নিরুদ্বেগ, শান্ত, আত্মমগ্ন হয়ে
যে আত্মমগ্নতাও হবে
নির্বাপিত
মোহনায়
মহাশূন্যে
নূপুরের সুর বাজে কানে
অভিসারে চলেছেন রাধা
চিরকালের ঘর বাঁধার মোহকে
দাহ করে
সে দহনের তাপে
প্রেমের চূড়ান্ত মাধুর্যকে ছেনে
নিজেকে উজাড় করে দিতে
সেই বাঁশির চুম্বনে
যে বাঁশির চুম্বন
সবটুকু নিয়ে
ফিরিয়ে দেয় না কিছু
ফিরে পাওয়ার সব আকাঙ্খাকে শূন্য করে
সময় যায়। মনও যায়।
তার সাধ, সময়ের প্রতিটা পায়ের ছাপের পাশে
থাকবে তার নিজেরও পায়ের ছাপ।
তাই কি হয়?
বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে আসে
বিষণ্ণ।
জিজ্ঞাসা করে,
"আমাকে থামালে না কেন?"
বলতে চাই কিছু,
দিতে চাই কৈফিয়ত,
এমন সময় তারা খসে
কোনো এক আকাশে
সে আবার দৌড়ায় রুদ্ধশ্বাসে
কোনো এক অপূর্ণ ইচ্ছা কাঁখে করে
অগুনতি তারা
অগুনতি ইচ্ছা অপেক্ষায়
প্রতিটা তারা খসার
কত ব্যর্থতায় ভাঙে
এক জন্মের মোহ?
শান্তি। শান্তি। শান্তি।
অক্রোধ। প্রেম। মৈত্রী।
আলো। বাতাস। জল।
মাটি। নীড়। পথ।
গৃহী। সন্ন্যাসী। যাত্রী।
শান্তি। শান্তি। শান্তি।
(ছবি Debasish Bose)
আগামীকাল বইমেলায়
হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে
আমিও হয় তো থাকতে পারি।
যদি চলতে ফিরতে হয় দেখা, হই মুখোমুখি
বইয়ের ভিড়ে, বইয়ের ফাঁকে
"এই তো তুমি"
এমন ভাবে তো ডাকতেই পারি।
সাড়া দিতে হয় দিও
নাও দিতে পারো
তবু দেখা হওয়ার প্রত্যাশা তো করতেই পারি।
রোগ-শোক-জরা-মৃত্যু এড়িয়ে কতদূর যাবে?
একফালি রোদের মত
কিম্বা মাটির বুকে জমা
এক আঁজলা স্বচ্ছ জলের মত
এখানে সেখানে
অল্পস্বল্প ছড়িয়ে আছে সুখ
যে সুখের শিকড় বেয়ে যাতায়াত করে শান্তিরস
অনায়াসে
এইটুকুই তো আরাম
কয়েকটা ছোটো-ছোটো পা ফেলার স্মৃতি
অসমান মাটিতে
অনায়াসে
রোদ একলা আসে না।
তুচ্ছাতিতুচ্ছকেও আলোকিত করে আসে।
ভালোবাসা একলা আসে না।
তুচ্ছাতিতুচ্ছকেও আগলে ঘিরে বসে।
রোদ তো শুধু আকাশে ধরে না।
সে মাটি ধুলো জল
বাছবিচার না বাসে।
স্নেহ তো শুধু নিজেতে ধরে না
মান-অপমান সব ছাপিয়ে
দশ-দিগন্তে ভাসে।
তোমার ঘরে এসে দাঁড়ালাম
উদারতা
তোমার ঘরের এক কোণায় বসতে এলাম
গ্রহণশীলতা।
অর্থের থই অর্থ খুঁজে পাব না জানি
তোমার উপলব্ধির নীলাকাশ
রেখেছ খুলে
আগলহীন অহর্নিশ
ওগো নীরবতার
নির্ভরতা।
তোমার ঘরে অবশেষে
বাঁচতে এলাম
আস্থা সুধায় দৃষ্টি-শ্রবণ নিকাতে এলাম
ওগো দ্বন্দ্ব পারের
প্রসন্নতা।
তোমার ঘরে বাঁচতে এলাম
প্রাণময়তা
তোমার ঘরের একটি কোণে বসতে এলাম
সঙ্গীতময়তা।
অন্য কেউ না
আমিই দেখে চলেছি আমাকে
গ্রীষ্ম বর্ষা
শীত বসন্ত
কথার ভিড়। কথা শূন্যতা।
হিংসা। রাগ। অভিমান।
ভালোবাসা। ভয়। মান। অপমান।
আমিই সাক্ষী আমার। একা।
তবু একা হই। সঙ্গী খুঁজি।
যে সাক্ষী হবে আমার সঙ্গে আমার।
হয় না।
অনুভবের সীমারেখা থাকে
সাক্ষী হই সে সীমারেখার
তখন নতুন একাকীত্ব
বিগত একাকীত্বকে
ফিরে পাওয়ার একাকীত্বকামী
আরেক একাকীত্ব
বিষণ্ণ সে
সে বিষণ্ণতারও সাক্ষী আমি
দীর্ঘ আত্ম-পরিক্রমণের পর
একদিন ছুটি চাই
আর নিজের সাক্ষী না
এই অতন্দ্র প্রহরীপনা থেকে মুক্তি চাই
অন্ধকার শূন্য গহ্বরের দিকে দু হাত তুলে জিজ্ঞাসা করি
কেউ আছ?
আমার এই অতন্দ্র ক্লান্ত সাক্ষী থাকার
সাক্ষী?
করুণা হয় না?
যদি থাকো কেউ
আমার এ যুগান্তরের সাক্ষী থাকার সাক্ষী
তবে সে-ই হবে তোমার পরম করুণা
কেউ কি আছ?
আবার সাক্ষী হই
এ কাঙালপনার
যে করুণাকামী
নিজের প্রতি করুণ হই
বুঝি
যে সাক্ষী
আর যার সে সাক্ষী
তারা দুই নয়
একই পাখির ছায়া
আরেকটা পাখি
উপনিষদের দ্বা সুপর্ণা
যদি তুমি ভাবো, নেই
তবে নেই
যদি তুমি ভাবো, আছে
তবে আছে
যদি তুমি ভাবো, আকার
তবে আকার
যদি তুমি ভাবো, নিরাকার
তবে নিরাকার
যদি তুমি ভাবো, মিথ্যা
তবে, মিথ্যা
সে সত্যতেই না হোক সে সত্য
কিন্তু এ খেলা খেলতে খেলতে
যদি কোনোদিন বলো,
হিংসা
তবে হবে ভুল
ভালোবাসাহীনতা
ভালোবাসার আকাঙ্খাই শুধু
হয় তো বা অভিমান
কিন্তু সত্য নয়
প্রভুতাহীন বাঁধন
সে
পরম স্বাধীনতা
তুমি যাকে শুচিতা বলো
তাও প্রকারান্তরে অস্পৃশ্যতার বিকার
তোমার দেবালয় থেকে হৃদয়
কেউ মুক্ত নয়
তুমি তবে কোন মুক্তির মোহে নিজেকে ভোলাও?
(চিত্রগ্রাহকঃ Suman Das)
বড় অন্ধ অভিভাবকত্ব চারদিকে
স্তব্ধ ফেনিল শব্দে গড়া বাক্য
কয়েক পা এগিয়ে ক্লান্ত
অর্থশূন্যতার ভারে
একটা অস্বাস্থ্যকর সহনশীলতা শুধু
কুকুরের মত নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে
মাঝরাস্তায়
উদ্বিগ্ন আমি, তুমি
ওরা, আমরা
সবাই
আস্থা হারানো
সতর্ক বিশ্বাসে বাঁধা সেতু
পার হতে হচ্ছে অহর্নিশি
ভয়, ভয় আর ভয়
এক একটা সময় তো আসবেই
যখন সব কিছু মিথ্যা মনে হবে
মনে হবে সবটুকু সাজানো
অর্থহীন। মতলবী।
যেন দশদিক
সব খালি খালি,
নিজেকে মনে হবে
পৃথিবীর সব চাইতে বড় বোকা
শুধু ঠকে গেছি
শুধু অভিনয় করে গেছি
আসলে
এ পুনর্নির্মাণের সময়
কিছু একটা হচ্ছে
গভীরে,
হয় তো কোনো আঘাতের মেরামত হচ্ছে
কিম্বা কোনো হতাশার শুশ্রূষা চলছে
কিম্বা হয় তো
নীড়ের সব শুকনো ডালপালা-পাতা ইত্যাদি ফেলে
আবার নতুন করে ঘর সাজানো চলছে
সময়ই তো আবর্জনা বানায়
আবার সেই তো সরায় আবর্জনা
অনেক প্রাণী যেমন খোলস বদলায়
তেমন মনও,
বহুবার খোলস বদলায়
আবার নতুন হবে বলে
এই সময়টা বড় কঠিন, রুক্ষ, বেদরদী
বড় সুরক্ষিত নয়
একটু সাবধানে থেকো
নিজেকে দেখে রেখো
সব ঠিক হয়ে যাবে আবার
এ শুধু সময়
পুনর্নির্মাণের সময়
খোলস বদলের সময়
উনি সুখী ছিলেন না। উনি একা ছিলেন না।
একা ছিলেন না বলেই সুখী ছিলেন না।
উনি বারান্দা, শোয়ারঘর, রান্নাঘর আর শৌচের ঘরকে বলতেন,
সংসার।
উনি নানাবিধ সম্পর্ককে বলতেন,
কর্তব্য।
খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি কোনোদিন
পেতে দেখেছি
উনি বলতেন,
ভবিতব্য।
ভবিতব্য যিনি লেখেন
তিনি,
ওঁর হাতে জ্বালা দীপ-ধূপ-ভোগ নিতে আসতেন। নিঃশব্দে।
ওঁর এই ছিল জপের মন্ত্র -
নিঃশব্দতা।
উনি যখন যাচ্ছেন। পায়ে আলতা। কপালে লেপা সিঁদুর। চারদিকে উড়ছে খই। নাম উঠছে, হরিবোল।
শুনতে পেলাম
ওঁর গায়ে জড়ানো নামাবলীর চাদর হাওয়ায় উড়তে উড়তে বলছে
ধীরে। আস্তে, আস্তে।
ঘরে জমে থাকা
ওঁর গন্ধ
মিলালো মৌসুমি বাতাসে, বসন্ত বাতাসে, গ্রীষ্মের হুতাশে
বছর ঘুরতে, না ঘুরতে।
সেদিন ওঁর ঘরে ঢুকে বসলাম।
কিচ্ছু চিহ্ন নেই। এমনকি ছবিও না। রঙ হয়েছে নতুন করে দেওয়ালে।
ঘরে কত লোক। কত কথা।
কারুর উচ্চারিত কোনো স্বরবর্ণ, কি ব্যঞ্জনবর্ণে উনি নেই।
কিন্তু আছেন। স্পষ্ট দেখলাম আছেন।
ঘরের আনাচে-কানাচেতে এখনও স্পষ্ট জমে
নিঃশব্দতা
চিরুনির ফাঁকে আটকানো মাথার চুলের মত।
শব্দেরই আয়ু আছে
নিঃশব্দতা?
ন জায়তে মৃয়তে বা কদাচিন…
উনি আছেন।
উনি সুখী ছিলেন না। একা ছিলেন না।
একা ছিলেন না বলেই সুখী ছিলেন না।
কথাগুলো স্বস্তি দেয় না আমায়
যে স্মৃতিগুলো
মেঘলা আকাশের নীচে মেলা
কাপড়ের মত জাগিয়ে রাখে
বৃষ্টির সতর্কতায়
তুমি ওদের মত
তাড়া করে বেড়িও না আমায়
থেকে অপেক্ষায়
সব বলে যাব তোমায়
অপেক্ষার ভার নিতে পারি না আজকাল
মৃত্যু বড় আকস্মিক
অ-পথগামী
বিশ্বাস করি না তাকে
তবু যে কথারা
যে স্মৃতিরা
এমনকি যে ভালোবাসারা
স্বস্তি দেয় না আমায়
সব জানিয়ে যাব
অসময়ে
আড়ম্বরহীন
তুমি শুধু অনপেক্ষ থেকো
অসংশয়
তুমি সে মানুষ নও
আমিও সে নই
তবু অত তো
খানাখন্দ নেই,
এই তো পারছি
'হাঁটতে'
সুখ অত তো দরকারি নয়
যতটা পেলব অভ্যাস
দুজনেই শিখে গেছি
'বাঁচতে'