ভূত বলে কিছু আছে নাকি? আছে তো, খুব আছে। আমি নিজের চোখেই কতবার দেখেছি।
প্রত্যেকটা অসময়ের মৃত্যুর একটা অসম্পূর্ণ গল্প রেখে যায়। যায় না? সেই অসম্পূর্ণ
গল্পটাই তো ভূত। তাকে দেখা যায়, ছোঁয়া যায়, কোলে তুলে গল্প করা যায়। হয় না? শুধু
যে মৃত্যুতেই এরকম ঘটে তাও তো নয়। ধরুন রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, একজন অপূর্ব একটা
গন্ধ মেখে তার সুবাস ছড়িয়ে চলে গেল আপনার পাশ দিয়েই, হয়ত আপনার ভীষণ তাড়া তখন,
কিন্তু তবু মনের অলস ঘরে একটা গল্প ওই সুবাস তৈরি করে দিয়ে যাবেই যাবে। আপনি
অন্যমনস্ক হতে হতে টাল সামলিয়ে আবার বস্তু জগতে ফিরবেন। সারাদিন এরকম কত ছেঁড়া
ছেঁড়া গল্প মনের আনাচেকানাচে জমা হতে থাকে, তাই দিয়ে কি আর সংসার চলে? না, সংসার
চলে না বটে, কিন্তু মানুষ চলে। মানুষের ভিতরে ভিতরে যে অকারণে, অকাজে, বয়েস
নিরপেক্ষ চলা, সেটা এইগুলোকেই পাথেয় করেই তো? নইলে রবি ঠাকুর কেন ঘরের লোক হল
বলুন? সেকি অমন কঠিন দর্শনের কথা ‘শান্তিনিকেতন’ - কি ,‘মানুষের ধর্ম’-এ বলেছেন
বলে? না তো। তার চোখে ‘ছেলেটা’, ‘সাধারণ মেয়ে’, ‘নিস্কৃতি’ চোখে পড়েছিল বলে? আমার
তো মনে হয় দ্বিতীয়টাই কারণ। আমার রবীন্দ্রনাথ তো কঠিন হতে শুরু করল যখন সিলেবাসের
মধ্যে ক্লাসরুমে স্যারের হাতে পড়লেন, তখন যেনা জানলুম, ভদ্রলোক এতবড় মাপের মানুষ
ছিলেন, এত জ্ঞানীগুণীদের তত্ত্বালোচনায় তাঁর আসন!
কিন্তু সে ছবি মুছতে বেশি সময় লাগল কই? ‘গীতবিতান’ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, তোমার
ওসব গুরুত্বপূর্ণ অকাজ সারা হয়ে থাকলে একটু আসব? বললাম, এসো, কি বলবে?
সে
বলল, শ্রাবণ এসেছে, আকাশের দিকে তাকিয়েছ? রাতের বৃষ্টিতে পাতার উপর জলের ধারাপাত
শুনেছো? শরৎ এলো, আকাশের রঙটা খেয়াল করেছ? বসন্ত এলো, হাওয়াটায় তোমার মনের মধ্যে
কোনো অকাজের কথা জাগছে না? এত শোক কেন তোমার? এত সারাদিন কিসের হিসাব? এত ভয় পাও কেন?
দেখোদিকিনি,
কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে এসে দাঁড় করালাম। তো যেটা বলছিলাম, মনের মধ্যে ছেঁড়া টুকরো
গল্পগুলোর কথা। সেই গল্পের সুখের কথা কাউকে বোঝানো যায়? যায় না। ওসব গল্পরা
অসম্পূর্ণই থাকে সব সময়, পরিচ্ছেদের পর পরিচ্ছেদ বাড়তে থাকে মনের অতল গহ্বরে। “
হ্যাঁ রে, কি ভাবছিলি?” – যেই কেউ জিজ্ঞাসা করল, অমনি ফাঁপরে পড়ে গেলাম, সত্যিই তো
কি ভাবছিলাম? থাক, সে ছাই নিজেই কি জানি? একটু অপ্রস্তুত হেসে বলতে হয়, কই সেরকম
কিছু না তো। কিছু মানুষ আবার নিজেকে প্রচণ্ড কাজের মানুষ, ব্যস্ত মানুষ সাজিয়ে এমন
চরকির বেগে নিজেকে ঘোরায় আর সকলের দিকে একটা তিরষ্কার, অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকায়,
যেন সে ছাড়া সংসারে বাকি সব মানুষেরা বিধাতার শক্তির অপচয় মাত্র। এই সব অত্যন্ত
কেজো লোকেদের নিতান্ত করুণার পাত্র বলেই বোধহয়, সে তাদের অহংকারের জন্য না, তাদের
আশেপাশে যে সব মানুষে পরিবৃত হয়ে থাকে সেই জন্য। তারাও সব কাজের মানুষ। নানা
ফিকিরে সেই ব্যস্তমস্ত ইগোধারীর কাছ থেকে স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেলেই তারা চম্পট
দেবে। টিকিটিও আর খুঁজে পাওয়া দায়।
এর
প্রধান একটা কারণ বোধহয় মানুষে মানুষে যে সত্যিকারের সম্পর্কের বুনট, তা
অপ্রয়োজনের। তাই বোধহয় সব সম্পর্কের চূড়ান্ত সার্থক পরিণাম – বন্ধুত্ব, ফেসবুকেও
আমরা যে পরিচয়ে একে অন্যের দিকে হাত বাড়াই। এমনকি এখানে আত্মীয়স্বজন,
শিক্ষক-শিক্ষিকা সবারই একখানাই ফেসবুকীয় পরিচয় – বন্ধু। তবে ওসব তাত্ত্বিক আলোচনা
থাক। মনের গল্প হচ্ছিল, তাতেই ফেরা যাক বরং। মনের অলস ঘরের গল্প। তবে আসলে তা তো
অলস ঘরের গল্প না, সে তো অবকাশের গল্প। ক্ষণিক বিরতির গল্প।
যে
কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, তবে সেই অসম্পূর্ণ গল্পের বক্তা কে? শ্রোতাই বা কে? বক্তা
হল আশা, আর শ্রোতা আমার সুপ্ত, অবিকশিত ইচ্ছা। তারা জন্মায় কোথা থেকে? জানি না।
কেউ জানে না। তবু তা দিয়েই আমাদের সকাল থেকে রাত, জীবন চাকা গড়িয়ে চলে, এমনকি
ঘুমের মধ্যেও ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে চলে, যা আভাসে স্বপ্ন হয়ে ধরা দিয়েও ধরা
দেয় না। কেউ কেউ বলেন, আমি যা স্বপ্ন দেখি তার প্রায় সবটাই মনে করতে পারি। যেন এটা
খুব একটা বড় কথা। কিন্তু আদতে কি তাই? তা নয়ত। স্বপ্নের ঘটনাবলী আর স্বপ্ন কি এক?
না তো। স্বপ্নের মধ্যে এমন কিছু একটা তো অবশ্যই থাকে যেটা তাকে সম্পূর্ণ বাস্তব
করে আমাদের সামনে ঘটিয়ে যায়, তখন কি মনে হয় সেটা স্বপ্ন দেখছি? হয় না তো? আর যখন
স্বপ্নটা স্মৃতিপথে এসে জাগা অবস্থায় রোমন্থন করি, তখন তো জানি সেটা অবাস্তব তখন
আমার কাছে, তার সেই বিশ্বস্ততাটা কোথায়? তাই আদতে অর্থহীন ওটা। তবে মনোবিদের কাছে
হয়ত তার গুরুত্ব অনেক। হতে পারে। কিন্তু মনোবিদের কাছে আমার মন আর আমার কাছে আমার
মন কি এক? নয়ত।
খেয়াল
করলে দেখা যাবে, মানুষের প্রতিটা অসম্পূর্ণ গল্পের একটা যন্ত্রণা থাকে। সেটাই যেন
তার মূলসুর। বলা হয় পশুপাখির কোনো ভূত হয় না কেন? আরে হবে কি করে। তাদের জীবনের
পুরোটাই তো শরীরের গল্প। শরীরের কোনো গল্প হয় নাকি? সে বড়জোর একটা স্থূল দাগ টানে
মনের গল্পের দুটো প্যারাগ্রাফের মধ্যে। আর পশুর যেটুকু মন, সেতো আমাদেরই দেওয়া,
তাকে পোষ্য করে। আমি অবশ্য প্রাণীবিদের দৃষ্টিভঙ্গীতে বলছি না, সেই দৃষ্টিতে তো
আমি নিজেও একটা প্রাণী বই আর কিছু নয়। তাই সত্যজিতের সাইমন ভুত হতে পারে, মহেশের
মোষটা নয়। কারণ মহেশের গল্প সেখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, সাইমনের নয়।
যেটা
বলছিলাম, অসম্পূর্ণতার যন্ত্রণার কথা, কান্নাই যেন মূলসুর সেই সব গল্পগুলোর।
কান্না তো আসলে আশা হত হলে জন্মায় না, আশা অবরুদ্ধ হলে জন্মায়। যে কাঁদে, বুঝতে
হবে তার মধ্যে কিছুটা আশার অনুভূতি এখনও টিকে আছে বলেই সে কাঁদছে, নইলে সে স্থবির
হয়ে যেত। তাই কান্নাটা আস্তিকের, স্থবিরতাটা নাস্তিকের। আমি ঈশ্বর বিশ্বাসের
আস্তিক্যের কথা বলছি না। সে তো খুব ছোটো কথা। যারা বইমেলায় যান না ইচ্ছা করে,
তাদের ধারণা পৃথিবীতে সব বইয়েই মোটামুটি কি লেখা আছে না জানলেও, এইটুকু জানেন যে
ওতে কাজের কথা কিছু লেখা থাকতে পারে না, তাই তারা যান না। ঈশ্বর বিশ্বাসের
আস্তিকতা মোটামুটি এরকম। তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার নকুলদানা চান, এই নিয়ে যাদের কোনো
সংশয় নেই, সেই আস্তিকতা তো খুব ছোটো কথা। কিন্তু যে আস্তিকতা মানুষকে কাঁদায় সে
খুব বড় আস্তিকতার কথা। রামকৃষ্ণ মহাশয় তাই বলতেন, কাঁদতে পারো? অর্থাৎ কেঁদে কেঁদে
তোমার ঈশ্বরকে তুমি বানিয়ে নাও, খুঁজে নাও। বেলের চারা লাগাবার পিছনেও কোথাও একটা
নান্দনিক স্বার্থবোধ থাকে, কিন্তু কেউ যদি বটের চারা কিম্বা অশ্বত্থ্বের চারা
পোঁতে, নিজের বাড়ির দেওয়ালে ফাটল ধরতে পারে জেনেও, সেই আস্তিকতা, যে ঘরের দোর ভেঙে
পরের কান্নায় সামিল হয়ে যায়। অশ্বত্থকে বলে, তুমি বড়ো হও, আমি দেখে যাব না, কিন্তু
আমার আগামী প্রজন্মকে আশ্রয় দিও, ছায়া দিও। সেকি বেল, রজনীগন্ধা, গোলাপের কাজ গা?
আশা
অবরুদ্ধ হয়ে যে সুর জাগায় তাই কান্না, এইটাই বলছিলাম, হত আশা শুধুই দীর্ঘশ্বাস,
জীবনবিমুখ। আবদ্ধ আশাকে তাই চালাকির আশ্রয় নিতে হয় না, তার কান্নাই পথ বানিয়ে
ফেলে, কারণ সে জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না যে। আর পথও যদি একান্তই নাও বানাতে
পারে, তবে পথ বানাবার সামগ্রীর আয়োজন করে রেখে যায় পরের প্রজন্মের জন্য।
সেই
কান্নাগুলোর গল্পই ভূত। আস্তিক অসম্পূর্ণতাই ভূত। এই ভূত শুধু মৃত মানুষের আশেপাশে
না, বহু জীবিত মানুষের আশেপাশেও ঘোরাফেরা করে। তাদের কথা মানুষের কথার মত নয়। তারা
বাক্য দিয়ে কথা বলে না, কথা বলে দুটো বাক্যের মধ্যখানে যে শূন্যস্থানটা তৈরি হয় তা
দিয়ে। কেউ কেউ শুনে ফেলে। শুনে ফেলে তার নিজের ভূতেদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
এইভাবে বেঁচে থাকা মানুষের পাশাপাশিই ভূতেরাও বাসস্থান গড়ে। তারা কল্পনা না,
বাস্তব। বস্তজগতের বাস্তব না, মনের অবকাশের ঘরের, অকাজের মানুষটার দোসর। পৃথিবীকে
ভালো রাখতে গেলে, মানুষকে ভালো রাখতে গেলে, তাই ভূতেদের ভালো রাখতে হবে আরো। কারণ
ভূত ছাড়া যেটুকু মানুষ পড়ে থাকে সে নিতান্তই জীববিজ্ঞানের যন্ত্র, যার পরবর্তী
প্রজন্মকে দিয়ে যাওয়ার বড় কিছু একটা নেই, কিছু দূষণ আর হত্যার গল্প ছাড়া। আসল গল্প
বলে আস্তিক ভূতেরা। ভালোবাসার অসম্পূর্ণ গল্প। যে গল্প ভেজা দুড়দুড়ানি বুকে খুঁজতে
হয়।
No comments:
Post a Comment