"মরা একটা মাছেরও দাম আছে, আমাদের কি দাম বল? মরলে সবাই বলবে শ্মশানে নিয়ে
যাও"
এক
নিঃশ্বাসে এতটা বলে দম নিল চম্পা। তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। অন্ধকারটা ভালোই লাগে
চম্পার। চাদরটা বুকের উপর টেনে নিয়ে বলল, "বাবু একটু জানলাটা খুলে দে তো,
টুনটুনিটা ডাকছে।"
সুরো একটু গাঁইগুঁই করতে করতে উঠল। জানলাটা
খুলে দিয়েই ধপাস করে এসে মাকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল আবার। চম্পা এখনও অবধি চোখ খোলেনি।
এখন খুলবেও না। এখন ও অন্ধকারটাকে ছুঁয়ে থাকবে। তার পাশবালিশ, মাথার বালিশ,
বিছানার চাদর, বাবুর নরম শরীর, জানলা দিয়ে আসা ভোরের ঠাণ্ডা বাতাস - অনুভব করবে।
ছোটোবেলা থেকেই তার এটা দারুণ লাগে। সবচেয়ে ভালো লাগে যখন বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি
হয়। তার দেরি আছে। সবে তো ফাল্গুনের শুরু এখন।
বাবুটা
নাক ডাকছে। চম্পা হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে বাবুর চাদরটা খুঁজল। পেল। তার গায়ে টেনে দিয়ে
বাবুর দিকে পাশ ফিরে শুলো। আজ কাজে যাওয়ার ইচ্ছা নেই। ধুর, রোজ রোজ যেতে ইচ্ছাও
করে না। বিশেষ করে শরীর খারাপের এই প্রথম দুদিন। তবু যেতে তো হয়ই। তবে আজ যাবে না।
না
যাওয়ার কথাটা ভাবতেই চম্পার নিজেকে কিশোরী মনে হল। আজ সে বাগানে বেড়াবে। বৈশাখীদের
বাড়ি যাবে। দুপুরে সেখানেই থাকবে, সন্ধ্যেতে ফিরবে।
তার সত্যি সত্যি বয়েস এখন বত্রিশ। কত বাড়ির বাসন, মেঝে, ঝাঁটা, ন্যাতা তার জন্য
অপেক্ষা করবে সারাদিন আজ। করুক গে।
চম্পা
চোখ মেলল। ভোরের আলো ফুটেছে। টি...টি...করে কি একটা পাখি ডাকছে। পাখিটাকে চোখে
দেখেনি চম্পা কোনোদিন। তবু পাখিটার উপর তার ভীষণ মায়া। বড্ড করুণ ডাকটা।
চম্পার
শীতলের মুখটা মনে পড়ল। সারা কপাল চন্দন। মালা দিয়ে সাজানো। খাটে শোয়ানো। অমনি তার
বিয়ের সন্ধ্যের কথাটা মনে পড়ল। টোপর মাথায়। গলায় মালা। গায়ে সাদা গেঞ্জি। বুকটা
লোমে ভরা। শুভদৃষ্টি হচ্ছে। উলু...শাঁখ...শীতলের মায়ের গলা ফাটানো কান্না..সব
একসাথে মনে পড়ল চম্পার। এরকমই হয় প্রতিবার। চম্পার চোখের থেকে এক বিন্দু জল ইতস্তত
করতে করতে গাল গড়িয়ে বালিশে পড়ল। রোজই তো পড়িস, চেনা পথে এত ইতস্তত কেন?
চম্পা
চোখ মুছে উঠে বসল। দীক্ষামন্ত্র জপ করতে হবে। খাটে বসেই করে। তার ঠাকুর, গুরুদেব
সবাই উঁচু তাকের উপর। চম্পা খাটে উঠে দাঁড়িয়ে তাদের নাগাল পায়। তবে প্রণাম করলে
একটা শান্তি আসে মনে। প্রতিবার। শীতলের ছবিও আছে।
জপ
শেষ হল। গণেশের চায়ের দোকান খুলেছে না এতক্ষণে? বাবুর দিকে তাকালো। নিঃসাড়ে
ঘুমাচ্ছে ছেলেটা। থাক ঘুমাক। নিজেই যাবে। উঠে দাঁড়িয়ে কটা খুচরো টাকা নিয়ে, নাইটির
উপর একটা গামছা জড়িয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। আজ কাজে যাবে না। কিছুতেই যাবে না।
বাইরেটা
কুয়াশা কুয়াশা। কুয়াশার মধ্যে আবছা আবছা মানুষের শরীরগুলো। চম্পার শীতলের মত লাগে
এই সময় অনেককেই। গণেশের দোকানে বেঞ্চের একদম ডানপাশে যে লোকটা বসে হুবহু শীতলের মত
না? কি আশ্চর্য! বাবুকে ডেকে দেখাবে? থাক, ও কি ছাই বুঝবে? কদ্দিনই বা দেখেছে!
চম্পা
এগোলো না আর। বাড়ির দরজাটার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকল। চারদিক কুয়াশা। কুয়াশার মধ্যে
শীতল।
হঠাৎ
চম্পার কি হল। তাড়াতাড়ি করে ঘরে ঢুকল। ছেলের গায়ে দুটো ধাক্কা দিয়ে বলল, ওঠ,
দরজাটা টেনে দে, আমি বেরোচ্ছি। বলতে বলতে সে শাড়িটা জড়িয়ে নিল। বাইরে এসে দাঁড়ালো।
এখনও কুয়াশা। শীতল বসে চা খাচ্ছে। চম্পা হনহন করে এগিয়ে গেল। কুয়াশা কাটার আগেই সে
বেরিয়ে যাবে এই এলাকা ছেড়ে। কুয়াশা কাটলেই বড্ড রোদ। চম্পার চোখ জ্বালা জ্বালা
করে।
No comments:
Post a Comment