Thursday, February 15, 2018

কবিতা - বিশল্যকরণী

তখন আমার অশৌচ। মা চলে গেছেন। সবাই বলল, মন্দিরে যেও না, শুভ অনুষ্ঠানে যেও না, তোমার অশৌচ। এক বছর। প্রথম কয়েকমাস কিছু বুঝলাম না। পরে ধীরে ধীরে বুঝলাম কথাটা কত গভীরে কাজ করে গেছে। 
        একদিন বাজারে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামতে শুরু করলাম। খুব অস্বস্তি হতে শুরু করল। প্রথমটায় বুঝলাম না কেন। তাড়াতাড়ি করে বাড়ি ফিরে এলাম। ছাদে অনেক রাত অবধি একা পায়চারি করলাম। বুঝলাম আমার অস্বস্তির কারণ কি। আমার বোধ হয়েছে, আমি অশুচি, আমি অপবিত্র। আমার উপস্থিতিতে সব কিছু অমঙ্গল হবে। আমি মূর্তিমতী আপদ একটা। আরো গভীরে হাতড়ালাম। মন বলল, তুমি অমঙ্গল, তাই তোমার মাকে হারালে। 
        পাড়ায় একজন আত্মীয়তুল্য চিকিৎসকের মেয়ের বিয়ে। খুব করে বলেছিলেন যেন যাই। গেলাম। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই বুঝলাম আমার শরীর খারাপ লাগছে। মাথা ঘুরছে। ঘাম হচ্ছে। আমি অশুচি। আমার অশৌচ চলছে। আমার উপস্থিতিতে সব নষ্ট হবে। এখন না হলেও পরে হবে। হবেই হবে। আমি এক ছুটে অভদ্রের মত বেরিয়ে এলাম। আমার মন বলতে লাগল, পালা.. পালা!
        মজার কথা হল, এগুলো কোনোটাই আমি সচেতনভাবে ভাবতাম না। অবচেতনের স্তর থেকে কথাগুলো উঠত। যেখানে আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। না শোনা যেত হয়ত, কিন্তু তখন আমি শোকে বিহ্বল, দিশাহারা। 
        আমি লোকজন, মেলামেশা, বাইরে হাঁটতে যাওয়া সব বন্ধ করে দিলাম ধীরে ধীরে। শুধু কয়েকজন বন্ধু ছাড়া কারোর সাথেই কথা বলতাম না। যদিও পড়ানোতে কোনো ছাপ ফেলত না এই পরিবর্তনগুলো। এক কথায় গৃহবন্দি করে ফেললাম নিজেকে।

        কদিন এভাবে চলত জানি না। তবে আমায় বাঁচালো কবিতা। লেখার নেশা আর কবিতা পড়ার মধ্যে ডুবে যেতে লাগলাম। আমায় সুস্থ করল রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ-বিষ্ণু দে-সুনীল-শঙ্খ-শক্তি-নীরেনবাবু-অরুণ সরকার- গালিব- জাভেদ-গুলজার-ফৈজ। ইংরাজিতে poemhunter বলে একটা সাইটে প্রচুর কবিতা পেলাম বিশ্বের নানা ভাষার বিখ্যাত কবিদের। একটা নতুন ধর্ম আবিষ্কার করলাম। কবিতার ধর্ম। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম না। কোনো ঈশ্বরের স্তবস্তূতি না। আমি তুমি বা আমরা তোমরা না। স্রেফ, এক এবং একমাত্র কবিতা। বাইরে বন্ধুরা ছিল না তা নয়। কিন্তু যেখানে নিজেকেই নিজে সহ্য করতে পারছিলাম না, সেখানে বাইরে থেকে কারোর সাহায্য কি করতে পারে? তবু বর্ণনাতীত সাহায্য পেয়েছিলাম বন্ধুদের কাছে থেকে অনস্বীকার্য। 
ক্রমে সুস্থ হতে শুরু করলাম। এরই মধ্যে Suman এর অতর্কিতে আমার লেখা ফেসবুকে দিয়ে ফেলা। ফেসবুকে বসবাসকারী নানা অসামান্য মানুষদের সাথে পরিচয়। যেন নতুন পাড়ায় বাসা পেলাম। জীবনের আরেকটা অধ্যায় শুরু হল।

        এই কথাগুলো হঠাৎ কেন বললাম? আজ একই ঘটনা আবার দেখলাম। একজন মহিলা, সদ্য বিধবা হয়েছেন। কর্মরতা, কিন্তু উচ্চ- শিক্ষিতা নন। তিনি তার বোনের মেয়ের পাত্র দেখতে যেতে পারবেন না, শুভকাজে যাবেন না, কারণ....
        জানাই তো। আর নাই বা বললাম। কিন্তু এ প্রথাগুলো মাথা পেতে নেওয়ার মধ্যে যে কোনো গর্ব নেই তা তাকে বোঝাতে পারলাম না। এটা নাকি আমাদের ঐতিহ্য। "মেয়ে মানুষের এরকম কিছু উপোষ-কাপাস, নিয়ম-টিয়ম না মানলে সমাজ টিকবে?"
এক সমাজে কত সমাজ! উপরের স্তরে হয়ত আলো পড়ছে, কিছু ভাঙছে। কিন্তু নীচের স্তরগুলো সেই অন্ধকারেই ডুবে। শিক্ষার অভাব না সাহসের? অন্যায়কে অন্যায় বলতে বিশাল কিছু বিদ্যাবুদ্ধি লাগতে দেখিনি। লাগে একটা সতেজ কমোন সেন্স।আর সব চাইতে ভয়ংকর সেই যে বিশ্ব-বিদ্যালয়ের পথ বন্ধ করে না (কারণ সেখান থেকেও প্রচুর অমেরুদণ্ডী জন্মাতে দেখেছি), যে কমোনসেন্সকে আড়াল করে দাঁড়ায় সেই প্রথা/ধর্ম/আচার যাই হোক না কেন। 
        তখনই মনে হল, সেই ভাষায় কবিতা লেখা যায় না যেই ভাষায় একজন অল্পশিক্ষিত মানুষও কবিতার মর্মে ঢুকবে? কারণ কবিতার মত এমন নিঃশব্দে, মাথার মধ্যে তথাকথিত যুক্তিবাজীর সিনক্রিয়েট না করে কে হাড়েমজ্জায় ঢুকতে পারে? 
        সে "লক্ষ্মীদেবী বামে করি বসি নারায়ণ" হোক, কিম্বা "আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া কাল আমাদের দোল".... এরকম সুরে। শুধু কথাগুলো অন্য হবে। নতুন শব্দের নেহাই পড়বে এই অচলায়তনের ভিতে? হয় না? কবিতার মত বিশল্যকরণী আছে নাকি?
Top of Form

No comments:

Post a Comment