আজ ভাষা দিবস। সাহিত্য দিবস না। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমার মাতৃভাষা
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলা। তাই আমার এই দিনটাতে কোনো গর্ব নেই। যে ভাষায় প্রাথমিক
শিক্ষা দেওয়ার কথা ভাবতে পারা যায় না, যে ভাষায় কথা বলার মধ্যে সম্মানবোধ সাধারণ
বাঙালী জনচেতনার নেই, আর যা হোক সেই ভাষা নিয়ে আদিখ্যেতা করার মত মানসিক গঠন আমার
নেই।
একটা
বাঙালী সন্তান জন্মেই জানতে পারে যে পা দুটো নিয়ে সে এ সংসারে এসেছে তা অচল। তার
সে পা-দুটো কেটে রনপা বসিয়ে দেওয়া হয়। অনেক উঁচু থেকে সে কিছুটা তাচ্ছিল্যে, কিছুটা
করুণায় নিজের পা-দুটোকে দেখতে শুরু করে। আর যারা সে রনপা লাগানোর সামর্থ্য রাখে না
তারা কিছুটা হীনমন্যতায়, আর কিছুটা ভাগ্যের বশ্যতায় মাথা নীচু করে সবটা হজম করে
যাওয়ার চেষ্টা করে। রক্তমাংসের যে পায়ে সে স্বাভাবিকভাবে তার জন্মলব্ধ মাটিতে ঘুরে
বেড়াতে পারত তার বদলে সে পরবাসী হয়ে ঘোরে। তাতে লজ্জা নেই, কারণ পরবাসীর সংখ্যা
কিছু কম নয়, আর তার চাইতেও বেশি পরবাসী না হতে পারার আক্ষেপযুক্ত মানুষ। অগত্যা
অসুবিধা হয় না।
কিছু
নতুন কথা বললাম কি? আদতেই নয়। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ইদানীংকালেরও বহু চিন্তাবিদেরা এ কথা বলেছেন, বুঝিয়েছেন,
করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কিচ্ছু হয়নি। পাড়ায় পাড়ায় ইংরাজী প্রাথমিক
বিদ্যালয় খুলছে রোজ একটা করে। তবে কি দাঁড়ালো -
বাঙালীর প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মাধ্যম কি?
ইংরাজী।
বাঙালী সন্তানের এক পরম লক্ষ্য কি?
ইংরাজীতে
তুখোড় কথা বলা।
বাঙালীর শ্রদ্ধার ভাষা কি?
ইংরাজী।
তবে
আজ কিসের উৎসব? দ্বিচারিতার। ছেলেকে মেয়েকে ইংরাজি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে
নিশ্চিন্ত হয়ে বাঙলা ভাষার ভবিষ্যত নিয়ে কবিকূল, সাহিত্যিককূল সভা করবেন। ছেলেমেয়ে
বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হলে আহ্লাদে আটখানা হবেন। ছেলেমেয়ে গ্রামে গিয়ে একটা বাংলা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি নিলে জাত যাবে। “ওসব তোমার জন্য না, তার জন্য লোক আছে।”
বিদেশে বসে আজকাল আবার অনেকে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখছেন শুধু না,
রীতিমতো বাংলা ভাষার কিসে কিসে উন্নতি হবে সে নিয়েও বেজায় চিন্তিত এমন একটা ভাবও
তাদের মধ্যে আছে। আসলে এদের দোষ নেই। এদের ধারণা বাঙলা ভাষাটা লাইব্রেরী,
সাহিত্যসভা, লিটল ম্যাগাজিন, কাব্যি, প্রবন্ধ, গপ্পো ইত্যাদির বাইরে আর বাঁচে না।
এরা আয়েস করে বাংলা বলেন, কঠিন কঠিন বিষয়ে আলোকপাতের ভাণ করেন। অসম্ভব স্বাধীন
চিন্তার অভিনয় করেন ইংরাজি ভাষার গায়ে ঠেসান দিয়ে। আদতে পুরোটাই ওই শখের বাজারের
ক্ষীরের পুতুল।
এদের
জন্যে ভাষাটা বেঁচে নেই। ভাষাটা এখনও জ্যান্ত আছে কেমন দেখতে হলে গ্রামে আসুন।
যেখানে এখনও মানুষ বাংলা ভাষা শুধু না, বাংলা সন তারিখে জীবন যাপন করেন। আসলে একটা
ভাষা বাঁচে সেই দেশের মাটির সাথে ওতপ্রোত হয়ে। এদের দেখলে আমার লজ্জা করে। নিজের
দৈন্য বুক চিরে অট্টহাস্য করে। তবুও আমরা এদেরও দূষিত করে তুলব ধীরে ধীরে। সংসারে
অর্থের চাইতে বলবান আর দারিদ্র্যের চাইতে যন্ত্রণা কি আর আছে? একটা কালিকাপ্রসাদ
পেতে বাঙালীকে কত জন্ম অপেক্ষা করতে হয় সে বাঙালীর বিধাতাও বোধ করি জানেন না।
আমরা
কি তবে সত্যিই বাই-লিঙ্গুয়াল? দ্বিভাষী?
না।
আমরা ইংরাজী অবলম্বী জাত। আমরা হিন্দী অবলম্বী জাত। আমরা কাজের জগতে মার খাই
ইংরাজী ভাষার কাছে আর আবেগের জগতে মার খাই হিন্দী ভাষার কাছে। আমাদের আধুনিক
প্রজন্মের বৃহৎ অংশের প্রাণের ভাষা জোগায় হিন্দী গান। বাংলা নয়। ইদানীং হিন্দী
ভাষার প্রতিও একটা শ্রদ্ধার ভাব চেতনায় আসছে দেখছি ইংরাজীর পাশাপাশি। আমরা যখন
ছোটো ছিলাম, হিন্দী কিছুটা অস্পৃশ্য অসংস্কৃত ভাষার মধ্যে পড়ত। ছবিটা কিন্তু
বদলাচ্ছে। আধুনিক বাঙালী প্রজন্ম হিন্দীকেও সাদরে গ্রহণ করতে শিখছে। বাঙলা আরেক ধাপ
পিছোচ্ছে। হিন্দীর কাছে হারছে। আমরা যতই চীৎকার করি না কেন, নিজের দুর্বলতার
প্রতিষেধক না খুঁজে যদি সবলের ওপর আক্রোশ জমাই তাতে কিছু লাভ আছে কি? করুণার পাত্র
হওয়া ছাড়া? যতই আমাদের ভাষায় নোবেল থাকুক, আমাদের বিশাল সাহিত্য সম্ভারের দোহাই
দিই না কেন, ওতে ভাষার একদিকের কথা বলা হয়। যেটা একটা ক্ষুদ্র দিক। সাহিত্যের দিক।
ভারতের যে ক'টা ধ্রুপদী ভাষা আছে (সংস্কৃত, তামিল, তেলেগু, কানাড়া, মালায়লম,
ওড়িয়া) আর আন্তর্জাতিক মহলেও যে ক'টা ধ্রুপদী ভাষা আছে (তার মধ্যে তেলেগু পড়ে না
যদিও) তার মধ্যে বাংলা নেই। আমরা সে অর্থে নবীন। কিন্তু তাতে কি? প্রাচীনত্বের
চাইতে প্রাণবন্ততার প্রয়োজন অনেক বেশি। কিন্তু ওই যে রনপা লাগানো পায়ে আর কতটা
প্রাণশক্তি আশা করা যায়? সে বড়জোর অসম্ভব ভালোরকম একটা অনুকরণ উপযোগী হয়ে উঠতে
পারে, কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হয় না। মৌলিক কিছু হয় না।
তাই
আজ আমার কোনো উৎসব নেই। কোনো আবেগ নেই। কৃত্তিবাস, কাশীরাম দাস, জয়দেব, চণ্ডীদাস,
বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, বৃন্দাবন দাস, রূপ-সনাতন, নিধুবাবু, রামপ্রসাদ, লালন, কৃষ্ণদাস
কবিরাজ, আজু গোঁসাই, কাঙ্গাল হরিনাথ --- এরকম অনেক জানা, আরো অনেক নাম না জানা
ভাষার ভগীরথ জন্মালে তবে একটা রবীন্দ্রনাথ আসার পথ তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথ শুধু কবি
হলে আজ তার নামটা নিতুম না। তিনি একটা নেড়ি কুকুরের ট্র্যাজেডি না লিখতে পারার
অক্ষমতার যন্ত্রণা সহ্য করেছিলেন বলে তার নামটা নিতে হয়... হয় নাই সর্বত্রগামী...
তার লাগি কান পেতে আছি...
সেই
সর্বত্রের বোধ যে ভাষায় সেখানে আমরা খণ্ডিত, দ্বিধান্বিত। হয় আমরা পশ্চিমবঙ্গবাসী
সম্পূর্ণ বাঙলা ভুলে ইংরাজ হই, অথবা দ্বিধা কাটিয়ে, ঘাটেবাটে নামি, তবে ভাষা
সঞ্জীবনী পাবে আবার নতুন করে। ভাষা ধুলোবালি মেখে জন্মায়। সে ধুলো প্রেসে বা
বইমেলায় বা সাহিত্যসভায় পাওয়া যায় না। সে ধুলো অজস্র সহস্র পায়ের ধুলো ওঠা
জীবনযাত্রায় পাওয়া যায়। যেখানে মানুষ নামের লোভে ফেরে না, প্রাণের টানে ফেরে।
No comments:
Post a Comment