Saturday, July 21, 2018

অস্তরাগ


        বিকালের দিকটায় এই রাস্তাটায় ভীষণ যানজট লেগে যায়। খুব চওড়া না রাস্তাটা। একদিকে রেললাইন আর আরেকদিকে পর পর দোকান। দুপুরটা যা একটু কম ভিড় থাকে, সকাল থেকেই প্রচুর লোকের যাতায়াত। স্টেশান, হাস্পাতাল, স্কুল, বাজার সবই তো এই একটা রাস্তা দিয়েই যেতে হয়। 
        আজ সকাল থেকে খুব বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাটার অবস্থা ভালো না। এখানে ওখানে জল জমে। যারা হাঁটছে তারা চলন্ত যান-বাহনের ছিটকানো জল বাঁচিয়ে কোনো রকমে চলেছে। এক বয়স্ক দম্পতি এই ভিড়ের মধ্যেই হাঁটতে বেরিয়েছেন। রোজই বেরোন। বৃদ্ধ, ভালো স্বাস্থ্য, বয়সের ভারে কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটেন, একহাতে লাঠি আর আরেক হাত স্ত্রী'র হাতে দিয়ে খুব ছোটো ছোটো পা ফেলে ফেলে এগোন। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে মাথা তুলে পাশের চলন্ত লোকের মুখের দিকে তাকিয়ে কাউকে যেন চেনার চেষ্টা করেন। আবার মাথা নীচু করে হাঁটেন। ওনার স্ত্রীকে হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন কোনো স্কুলের হেড দিদিমণি ছিলেন। আমার সাথে এই সময়টায় প্রায়ই দেখা হয় ওনাদের, ঠিক এই জায়গাটাতেই। বয়স্কা মহিলা আমার দিকে তাকান, কিন্তু কিছু বলেন না। বলার কোনো তাগিদও লক্ষ্য করিনি কোনোদিন।
        আজ আমি যখন ওদের পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি, দেখি ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন মাঝরাস্তায়, ভদ্রমহিলা ওনাকে শক্ত করে ধরে কিছু একটা কানের কাছে বলার চেষ্টা করছেন। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। আমার কি এগোনো উচিৎ? ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকালেন, যেন মনে হল উনি কিছু বলতে চাইছেন। আমি এগোলাম। আমায় দেখে বললেন, "একটা টোটো ডেকে দেবেন ভাই, ওনার কিছু একটা কষ্ট হচ্ছে উনি বলতে পারছেন না, কি বিপদে যে পড়েছি, একটা ওষুধ খাওয়াতে হবে এখনই..."
        আমি ওনাকে "আসছি এখনই" বলেই জোরে হাঁটা শুরু করলাম। একটু এগোলেই টোটোর স্ট্যাণ্ড। টোটো নিয়ে এলাম। ধরে ধরে বৃদ্ধ মানুষটাকে যখন তুলছি, উনি একবার চোখ খুলে আমার দিকে তাকাবার চেষ্টা করে বললেন, "কে?...বাবু?...", জিভটা জড়িয়ে বাঁদিকের গাল থেকে ডান দিকের গালে যেন অবশ হয়ে পড়ে গেল, উনি আবার চোখ বুজলেন। আমার কি মনে হল, বললাম, "আমিও যাই আপনাদের সাথে, নইলে নামাতে অসুবিধা হবে আপনার..." ভদ্রমহিলা অস্বস্তিতে পড়ে ভাষা খুঁজে পেলেন না, বুঝলাম। কিছু একটা বলতে গিয়েও না পেরে একটু হেসে সম্মতি জানালেন। কয়েকটা গলি পেরিয়ে একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে নামলাম। ভদ্রমহিলা আগে গিয়ে তালাটা খুলে দরজাটা হাট করে খুলে দিলেন। তারপর আমি আর টোটোওয়ালা বৃদ্ধকে ধরে ধরে নামিয়ে ঘরে নিয়ে গিয়ে একটা খাটের উপর শুইয়ে দিলাম বৃদ্ধার কথা মত। ভদ্রমহিলা কিছুতেই ভাড়া দিতে দিলেন না। টোটোওয়ালা চলে গেল।
        আবার আমি সংকটে, ফিরে যাব না দাঁড়াব কিছুক্ষণ, যদি ডাক্তার ডাকতে হয়? 
"আপনার যদি কোনো অসুবিধা না থাকে কয়েক মিনিট একটু বসবেন ভাই? কিছুটা নিজের স্বার্থেই বলছি। থাকলে একটু সাহস পাই।"
        বসলাম। ঘরে একটা খাট, পাশে আলমারি, একটা কাপড়ে ঢাকা কম্পিউটার, আর কয়েকটা চেয়ার, যার একটাতে আমি বসে। একটা ওষুধ পাশের ঘর থেকে এনে বৃদ্ধর মাথাটা তুলে ধরে খাওয়ালেন। তারপর আমার মুখোমুখি চেয়ারটায় বসলেন। একটা ঘিয়ে ঘিয়ে রঙের শাড়ি পরনে, রোগাটে গড়ন, মুখটা ভীষণ উজ্জ্বল, বিশেষ করে চোখদুটো। গায়ের রঙ সাধারণ --- না ফর্সা, না কালো।
        জিজ্ঞাসা করলাম, "বাড়িতে আর কেউ নেই?" ভদ্রমহিলা বললেন, "বলছি ভাই, চায়ের জলটা চাপিয়ে এসেছি আপনাকে না বলেই, আপনি লজ্জা পাবেন মনে হয়েছিল, আপনি কি চিনি খান?"
        আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। ভদ্রলোক অসাড়ে ঘুমাচ্ছেন। ভদ্রমহিলা খানিক বাদে চা নিয়ে ঢুকলেন। 
        একটা লাওপালা কাপে দুধ চা, ডিশে ক্রিম ক্র‍্যাকার বিস্কুট দুটো। উনি চা নিয়ে বসে একবার ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আসলে আপনি হয়ত ভাবছেন উনি আমার স্বামী, তা নয়।"
        আমি কিছুটা অজ্ঞাতেই ওনার মাথার দিকে তাকালাম, তাই তো! সিঁদুর যে নেই এতক্ষণ খেয়াল করিনি তো।
        ভদ্রমহিলা আমার চোখের গতি লক্ষ্য করে বললেন, "হ্যাঁ, আমি সিঁদুর পরি না। ওনার স্ত্রী মারা যান আজ থেকে পনেরো বছর আগে। তার চার বছর পর ওনার বড় ছেলে, চেন্নাইতে একটা কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। তার কয়েক মাস পরেই ওনার একটা ম্যাসিভ সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। আমি ওনার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই এ বাড়িতে রান্না করতাম। আত্মীয়-স্বজন বলতে কাউকেই দেখিনি কোনোদিন। আমার স্বামী মারা যান আমার বিয়ের চার বছরের মধ্যেই, লিভার ক্যান্সারে। একটা ছেলে ছিল আমার, সেও একই রোগে গেল, ব্লাড ক্যান্সারে। তারপর নিজের পেট চালানোর জন্য রান্নার কাজ নিই। কপাল দেখুন, এমন একটা বাড়িতেই... আমার ভাগ্য..."
        ছ'টা বাজে। বাইরেটা মেঘের ঘোরে অন্ধকার হয়ে এসেছে। ভদ্রমহিলা উঠে আলো জ্বাললেন। আবার বসলেন, একই ভঙ্গীতে, একটু সামনের দিকে ঝুঁকে, কত বয়সে হবে? হয়ত ষাটের কাছাকাছি। চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, "একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি, আমি রান্না করতে এসেছি, উনি টিভি দেখছেন। হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনে দৌড়ে এসে দেখি মাটিতে পড়ে কেমন আওয়াজ করছেন মুখ থেকে। ক্লাবের ছেলেদের নিয়ে হাস্পাতালে গেলাম। পনেরো দিন হাস্পাতালেই কাটালাম। ওনার এক মাসতুতো ভাই এসেছিল টাটা থেকে, উনিও নাকি আগে এই কাঁচরাপাড়া রেলেই ছিলেন, তাছাড়া ওনার বন্ধুবান্ধবেরা সব দেখাশোনা করল। এই রেলের হাস্পাতালেই ছিলেন। 
        উনি পনেরো দিন পর ফিরলেন। আমি আর ফিরলাম না। থেকেই গেলাম। এটা যেন আমরা দুজনেই জানতাম, মানে চাইতাম আর কি..
        প্রথমে ভাবলাম লোকে কি বলবে, আমার কথা না, ওনার কথা ভেবেই দুশ্চিন্তা হল। তারপর ভাবলাম মানুষটা তো আগে বাঁচুক বাকিটা পরে ভাবব। এই সেপ্টেম্বরে উনি বাহাত্তরে পড়বেন, আজ বারো বছর হয়ে গেল... আমার আর ভাবা হয়ে উঠল না।"
        বাইরে মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে। ভদ্রলোক ঘুমাচ্ছেন।
        "আপনি হয়ত ভাবছেন, আমি নিজের দিকটা ভেবেই ওনার অবস্থার সুযোগ নিলাম (আমি এরকম কিছু ভাবিনি যদিও, তবু কিছু বললাম না।উনি বলুন, বলাটা দরকার।) কিন্তু পুরোটা তা না জানেন। আমি কোথাও মানুষটার অসহায়তাটাকে নিজের অসহায়তার সাথে এক করে দেখে ফেলেছিলাম। আমার মনে হয় ওই আইসিইউ দিনগুলোই আমাদের মধ্যে একটা যোগসূত্র গেঁথে দিয়েছে কোথাও। আমি সারাদিন নিজের কথা না ভেবে ওনার কথাই ভেবে যেতাম জানেন। আপনাকে কথাগুলো বলছি বলে বিব্রত হবেন না, আসলে আমার এই কথাগুলো বলারও দরকার ছিল কাউকে। নিজের কথা অন্যকে বললে নিজেকে স্পষ্ট করে জানা যায়, আপনি মানেন?"
        আমি মাথা নাড়লাম।
        "মানুষটা ভীষণ ভালো জানেন। নইলে আমি চাইলেই অন্য বাড়ি কাজে লেগে যেতে পারতাম, গেলাম না তো। কেন গেলাম না বলুন তো? কোনো ব্যাখ্যা হয় না। কিন্তু যেতে পারলাম না এটা তো সত্যি।"
        আমরা দু'জনেই চুপ। চা শেষ। পাখার আওয়াজ আর বৃষ্টির আওয়াজ মিলে একটা আবহ তৈরি করেছে, ভালোবাসার।
        "উনি বলেছিলেন, আইনত বিয়ে করার জন্য। আমি করিনি। লোকে বলবে সম্পত্তির লোভে জড়িয়েছি নিজেকে, হয়ত বা আমার নিজের মনও আমার দিকে আঙুল তুলবে কোনো একদিন। থাক, সে বড় অপমানের হবে।"
        আমি বললাম, "তবু আমার মনে হয় আপনার বিয়েটা করে নেওয়া উচিৎ, আপনারও তো বয়েস হচ্ছে, একটা নিরাপত্তার প্রশ্ন তো আছেই..."
        উনি হাসলেন। নির্মোহ হাসি। চুপ রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর জানলার দিকে তাকিয়ে বললেন, "বৃষ্টিটা ধরেছে ভাই একটু... "


        ফেরার পথ ধরলাম। রাস্তায় আরো যানজট। আরো বেশি জল জমে। তবে ফেরার সময় যাওয়ার মত অস্থিরতা আর বিরক্তিটা নেই। গায়ে লাগছে না কিছু, মনেও না।

No comments:

Post a Comment