রুচির বৈষম্যতা আর রুচির মান
এক কথা কি? খাদ্যে রুচির পার্থক্য হয়েই থাকে। টক, ঝাল, মিষ্টি, অম্ল ইত্যাদি
নানা স্বাদের বৈষম্য থাকে। তাতে কারো কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে কোনো তথ্য কোথাও
লিপিবদ্ধও নেই। কিন্তু খাদ্য-অখাদ্যের বিচার যখন আসে তখন যদি কেউ সেই বিচারের
ক্ষেত্রকে রুচির বিচারের ক্ষেত্রর মধ্যে নিয়ে আসে? অখাদ্যকে
রুচির তারতম্য বলে চালাতে চায়? তখন বুঝতে হবে এই ক্ষেত্রে
তার নিশ্চয় কোনো স্বার্থ আছে অথবা নিতান্তই নির্বোধ সে।
সদ্য যে দু’জন রাজনীতিবিদ প্রয়াত হলেন, শ্রদ্ধেয় বাজপেয়ীজি ও
সোমনাথবাবু, তাঁরা ভারতবর্ষকে যে রাজনীতির সাথে পরিচয়
করিয়েছিলেন তা হল রুচির রাজনীতি। ভাষায়, সিদ্ধান্তে, আচরণে, বিরোধিতায়, কটাক্ষে,
উপেক্ষায়, সাহসিকতায় - মার্জিত রুচির উদাহরণ
বুঝিয়েছিলেন। আমাদের লোকসভা, বিধানসভার মত ভাষা, কালচার, অর্থনৈতিক অবস্থান, ধর্ম
ইত্যাদির বৈচিত্রময়তা সারা বিশ্বে আরেকটা পাওয়া ভার। সেখানে গ্রাম্য ভাষা, ভায়োলেন্স থেকে শুরু করে অশোভন চুটকি সবই চলে এসেছে, আনপার্লিয়ামেন্টারি হয়েও থেকে গেছে। এসবের মধ্যে নিজের রুচির মর্যাদা
রক্ষা করে কাদার ছিটা গায়ে মেখেও কাদা না ছিটিয়ে তারা জলের ব্যবস্থা করেছিলেন।
যাতে করে শুধু নিজের গায়ের কাদা না, তাদের সতীর্থদের কাদাও
ধুয়ে যায়। যা বাস্তবিক যায়নি।
রুচির কথায় প্রথম যে কথাটা আসে তা হল ভাষা। একজনের হিন্দী ও
অন্যজনের ইংরাজি ভাষার শব্দ চয়ন কখনও শালীনতার মাত্রা ছাড়াত না। অথচ রসবোধ যে কম
হত তাও নয়। নানা ভাষণে বিশ্বের নানা কবির উদ্ধৃতি বহুবার শুনেছি প্রয়াত প্রাক্তন
প্রধানমন্ত্রীর ধীর, সৌম্য
উচ্চারণে। সমৃদ্ধ হয়েছি।
আজ ছবিটা শুধু ভারত বলে না
সারা বিশ্বে সাংঘাতিকভাবে বদলে যাচ্ছে। আমরা চাইছি রামরাজ্য, আমেরিকা চাইছে রাহাজানির গুণ্ডামি, সাথে কোরিয়া
চাইছে হিটলারের মত শাসন, পুটিন চাইছে সারা বিশ্বের লেনিনের ধারার
অন্ধ অনুসরণ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে প্রবল জাতীয়তাবোধের একটা ঢেউ উঠেছে। যে
জাতীয়তাবোধ আত্মসম্মানের না, আত্মপক্ষ সমর্থনের, যা অন্ধ আবেগ তাড়িত। তার একটাই উদ্দেশ্য নিজেকে পৃথক রাখা, অন্য অর্থে বিচ্ছিন্নতাবাদ। সব মিলিয়ে সারা বিশ্বজুড়ে একটা 'পিছনে এগিয়ে চলোর' মত দশা।
আমাদের শরীরে অটো ইম্যুউন
বলে একটা রোগ হয়, যাতে আমাদের নিজেদের ইম্যুউন সিস্টেম নিজের
শরীরের বিরুদ্ধেই কাজ করে নিজের শরীরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। আজ আমাদের সারা
বিশ্ব সেই অটো ইম্যুউন রোগে আক্রান্ত।
আমরা উন্নতি বলতে বুঝেছিলাম
উদার উন্মুক্ত সুস্থরুচির মানবিক সহাবস্থান। যার মূলে থাকবে বিদ্বেষ রহিত
চিন্তাধারার প্রসার জীবনের অববাহিকায়। কিন্তু সেই বিদ্বেষরাহিত্য আজ কোথায়?
জগতে দুটো সত্য ধ্রুব, এক অনিশ্চয়তা আর দুই
পরিবর্তনশীলতা। এর মধ্যে মানুষ যে আলোক নিজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে জেনেছিল তাকে
বলেছিল - প্রজ্ঞা বা উইজডম। যার মূল ভিত বিদ্বেষরহিত মনোভাব ও সহিষ্ণুতা। তার
চর্চা আজ কোথায়?
বিজ্ঞান আমাদের জ্ঞান দিতে
পারে কিন্তু প্রজ্ঞা দিতে পারে না। আজ বিজ্ঞান প্রযুক্তির দাস। সেদিন রোমে তথা
গ্রীসে যে বিজ্ঞান মানুষের চেতনায় জন্ম নিচ্ছিল সেদিন সে ছিল মানুষের জ্ঞানতৃষ্ণার
সেবক। আজ সে দাস মানুষের লোভের। কারণ মানুষ জানে বিজ্ঞানের চাইতে বিজ্ঞানজাত
প্রযুক্তির কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। প্রযুক্তি তার লোভ তার হিংসাকে আরো নিপুণ
আর বিস্তারিতভাবে প্রয়োগের জন্য অনেক বেশি কাম্য, তাত্ত্বিক
বিজ্ঞানের চাইতে। তাই বিজ্ঞান আজ দাস। দাসত্বের নীতিবোধ আর রুচির শালীনতা থাকে না।
যা থাকে তা হল ঈর্ষা আর দ্বেষ। যা আজকের বিশ্বের মূল চালিকা শক্তি হয়ে দাঁড়িয়ে
আছে।
তত্ত্বের থেকে বেশি
শক্তিশালী চরিত্র। সমস্ত মানবিক শক্তির মূল শক্তি তার চরিত্র শক্তি। ঘন অন্ধকারেও
যে আলোর দিকে তাকায় সে মানুষের মঙ্গলের প্রতি বিশ্বাস। তারপর সেই আলোর দিকে পথ
রচনা করে যুক্তি। প্লেটোর সেই বিখ্যাত উপমা গুহার কথা স্মরণ করাই, তার অমর গ্রন্থ 'রিপাব্লিকে'।
ক্রমশ অন্ধকারে প্রবেশ করতে
করতে আবার সেই বিশ্বাসের দিকে পথ চেয়ে থাকা, সেই বিশ্বাসীর
দিকে পথ চেয়ে থাকা, যে আলোর দিকে তাকিয়ে তার শুভ যুক্তিগুলো
সোপানের মত মানব সমাজের সামনে রেখে দেবে যাতে আবার বর্বর, অসংস্কৃত
অতীত থেকে আমরা সামনের দিকে, আলোর দিকে হাঁটার বল পাই।
No comments:
Post a Comment