ভয় আমার আত্মীয় না। ভয় আমার
প্রতিবেশী না। ভয় আমার পরিচিতও না। ভয় আমার কে? জানি না। ভয়
একা হাঁটে না। ভয় একটা মৃতগাছের ডালের উপর শকুনের মত তাকিয়ে থাকে। আমি ঝিমিয়ে পড়লে
চীৎকার করে ওঠে আকাশ মাটি কাঁপিয়ে। ভয়ের জন্য আমার সাথে তোমার দূরত্ব। ভয় আমায়
ব্যঙ্গ করে। ভয় তোমায় অবিশ্বাস করতে বলে। আমি অবশেষে ভয়ের সাথে বনিবনা করতে চাই,
ভয় চায় না। ভয়ের কোনো আত্মবিশ্বাস নেই। আমারও নেই। ভয় আমায় দূরের
কথা বলে। ভয় আমায় বলে আর কিছুটা দূর হাঁটলেই সন্ধ্যে নামবে। আমি কিচ্ছু দেখতে পাব
না। আমি কারোর কথা শুনতে পাবো না। আমার সামনে থাকবে উত্তাল সমুদ্র, তার ঢেউয়ে পাল তোলা কোনো নৌকা থাকবে না। যদি থাকে সেই নৌকায় থাকবে ফুটো,
ডুবিয়ে দেবে মাঝসমুদ্রে নিয়ে গিয়ে। আমি শ্বাস নিতে পারব না। আমার
নাক-মুখ দিয়ে জল ঢুকবে। আমার হৃৎপিণ্ডটা জলে ভরতি হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে।
আমি ভয়ের কথা বিশ্বাস করি
না। তবু ভয়ের কথা শুনি। ভয় আমায় জানলা-দরজা আটকে রাখতে বলে। আমি ছিটকিনি না দিয়েও
তা বন্ধ করে রাখি, যেন বলতে চাই আসলে আমি জানলাটা খোলা
রাখতেই চেয়েছিলাম। আসলে আমি দরজাটা দিয়ে বাইরে যেতেই চেয়েছিলাম। ভয় আমার অক্ষরগুলো
মুছে মুছে দেয়। দিয়ে নিজের অক্ষর বসায়। ভয় যেন আমার শুক্রাচার্য। কোন হিরণ্যকশিপুর
শিক্ষালয়ে এসেছি শিক্ষা নিতে কে জানে। আমার চারদিকে শুধু বাধা। শুধু অন্ধকারের পায়ের
শব্দ। শুধু মৃত্যুর ফিসফিস গল্প। আমার সাথে সাথে যারা বসেছে আসন পেতে, তারাও কাঁপে, তটস্থ হয়ে থাকে হিরণ্যকশিপুর ভয়ে।
সেদিন যেমন ছিল। প্রতিটা দৈত্যের সন্তান ভয়ে ছিল। ভয়কে মাথায় করে রেখেছিল বলেই
সারা সংসারকে ভয়ের চোখে দেখেছিল, ভয়ের চোখেই দেখতে শিখেছিল।
এমন সময় এসেছিল প্রহ্লাদ। হিরণ্যকশিপুর বলে ত্রাস, সে
ত্রাসের সন্তান। সে ত্রাস হয়ে এলো না, এলো মুক্তি হয়ে। ভয়ের
থেকে মুক্তি নিয়ে। তার উপর শাসন যত বাড়ে তার বিক্রম ওঠে তত বেড়ে। সে কাউকে ভয় পায়
না। তার সহপাঠীদের কাছে এ এক আশ্চর্য কথা হল, তুমি ভয় পাও না
কেন? প্রহ্লাদ বলেছিল, সে সারা
বিশ্বসংসারে এক অভয় আশ্রয়কে দেখেছে, সে নারায়ণ, সে নাকি সর্বত্র, সংসারে প্রতিটা জীবকে যদি শ্রদ্ধার
চোখে দেখা যায়, তবেই সেই পরম অভয়দাতাকে তুষ্ট করা যায়। এর
বাইরে নাকি জীবনে কোনো সাধনই নেই। কথাটা তো তাই, যা বিশাল
সেই বিশালত্বকে ধরবার মত হৃদয় তো চাই। একবার জাহাজ ঝড়ে তুমুল বিপজ্জনক অবস্থায়।
জাহাজের ক্যাপ্টেন অবধি ভাবছেন যে জাহাজ বুঝি আর বাঁচানোই গেল না, যাত্রীরা প্রমাদ গুনছেন, এমন সময় জাহাজের ডেকে
রবীন্দ্রনাথ গান বাঁধছেন, "ভুবন জোড়া আসনখানি, আমার হৃদয়-মাঝে বিছাও আনি..."
আমার রাজা নাটকের কথা মনে
পড়ল। সেই বলা হয়েছিল না, তিনি কোনোখানেই বিশেষ করে নেই বলে
সবখানে সবসময় আছেন, এও যেন তেমন একটা কথা। বড় কথা। বড় কথা না
হলে ভয়ের শকুনটা উড়তেই চায় না। আসলে ও আমায় মৃত দেখতে চায়, যাতে
সে আমায় খেতে পারে। আমার মৃত আত্মার উপর সে তার ভোজ চালাতে পারে।
কিন্তু সে প্রহ্লাদই বা কই,
আর সে রাজা নাটকের সুরঙ্গমাই বা কই, যে এই ঘোর
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আমায় বলবে, ভয় নেই।
আমি যে এই কথাটাই মনেপ্রাণে
শুনতে চাই, অহরহ শুনতে চাই, ভয় নেই,
ভয় নেই, ভয় নেই। কে বলবে সেই কথাটা?
হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সেই শকুনের
চোখে চোখ রাখলাম, সে তীক্ষ্ম আওয়াজে আমার কান মাথা ফাটিয়ে
চীৎকার করে উঠল। বললাম, আমি তো কিছু চাইছি না তোমার কাছে,
তুমি উড়ে যাও, আমায় মৃত পাবে না। তোমার দরকার
আমার মৃত আত্মা, তাকে পাবে না। আমার অক্ষরগুলোকে আমি দেব না
তোমায় ছুঁতে। আমার চিন্তার নদীতে তোমায় দেব না পা ডোবাতে, তুমি
উড়ে যাও... তুমি উড়ে যাও... তুমি যাও... যাও... যাও...
বলতে বলতে আমার গলায় যেন সাত
সমুদ্রের ঢেউ এসে লাগল... আমার চারিদিকে আলো হয়ে উঠতে লাগল... দেখলাম শকুনটা ধীরে
ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আসলে ও ছিল আমারই উল্টোদিকের ছায়া। আমি বুঝতেই ও মিলাতে শুরু
করল।
No comments:
Post a Comment