মানুষের কতগুলো মৌলিক
প্রবণতা আছে ব্যক্তিত্বের। সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ, ক্ষমতার
প্রতি আকর্ষণ, সত্য বা জ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ, শুদ্ধতার প্রতি আকর্ষণ। খিদে, তেষ্টা, নিরাপত্তা, কাম, অহং-এর তৃপ্তি
- এগুলোকে ধরছি না। এ সবার মধ্যেই থাকে, মাত্রার তারতম্যে।
এরা প্রবণতা না, এরা চাহিদা।
এদের মধ্যে আমার আলোচনার
কেন্দ্র আজ – শুদ্ধতার প্রবণতা যাদের। শুদ্ধতার দুটো দিক আছে
- কাল্পনিক আর বৈজ্ঞানিক। যে গঙ্গাজল বিনা শোধনে পানযোগ্য নয়, সেই গঙ্গাজল পবিত্র বলে পূজোর যোগ্য, এইখানে একটা
কপটতা আছে। কারণ এই শুদ্ধতাটা কাল্পনিক। ধর্মীয় মানুষের ভাষায় - বিশ্বাসের। 'গণশত্রু'র চরণামৃত। সমস্যা হল এই শুদ্ধতার ভাবটা
পরীক্ষণীয় নয় বলেই, একের সাথে অন্যের বিরোধ ঘটাতে এর জুড়ি
নেই। আমার বাড়িতে যখন কেউ শুদ্ধ পানীয় চান, তখন আমার পানীয়জল
শোধনকারী যে কোম্পানীর হোক সেই নিয়ে তিনি বিরোধ করেন না, কারণ
তিনি জানেন যে সে জলের শুদ্ধতা পরীক্ষিত বলেই বাজারে সেই কোম্পানিটি ছাড়পত্র
পেয়েছে। কিন্তু তার পূজ্য দেবতা বিনা শোধিত গঙ্গাজল পেতে আপত্তি করেন না - এ তার
বিশ্বাস।
সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ,
ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ, সত্য বা জ্ঞানের প্রতি
আকর্ষণ যে শ্রেণির মানুষদের তাদের বাইরের প্রামান্যের উপর নির্ভর করতে হয় না। সে
তার অন্তরের উপলব্ধি, নয়তো যুক্তি-বিচার-অভিজ্ঞতা সম্বলিত
জ্ঞান। কিন্তু কাল্পনিক শুদ্ধতা সমাজ-প্রথা-শাস্ত্র-মহাপুরুষ বাণীনির্ভর। আমার
পক্ষে শনিবারে আমিষাহার অশুদ্ধ - প্রমাণ শাস্ত্র। তোমার পক্ষে শনিবারে নিরামিষ
আহার অপরাধ - প্রমাণ শাস্ত্র। কিন্তু কোন মানুষ এই প্রমাণগুলোর মুখাপেক্ষী?
আমার মনে হয়, যে সব মানুষ বুদ্ধিগতভাবে
স্বনির্ভর ও পরিণত হয়ে উঠতে পারে না, তারাই শুদ্ধতার দিকে
ঝোঁকে বেশি। শরীরের মধ্যে ও মনের মধ্যে যে প্রবৃত্তিগুলোকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে
না, নিজের স্বাভাবিক বুদ্ধি-বিবেক-বিচারের মাধ্যমে, বারবার নিজের কাছে নিজের হেরে যাওয়া তাদের মানসিক সত্তাকে যেভাবে দুর্বল
করে তোলে তার থেকে বাঁচার জন্য সে একটা সমাজনির্মিত সমাজস্বীকৃত শুদ্ধতার সমর্থন
চায়। সম্পূর্ণরূপে নির্ভুল নিখুঁত, অবশ্যই সেই কারণেই
কৃত্রিম, অবাস্তব একটা জগতে নিজের অমরত্বের আস্পৃহা রাখে।
গভীরের এই আত্মপ্রবঞ্চনা সে যে সজ্ঞানে করে তা নয়, আবার
বিষয়টি যে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত তার কাছে তা-ও নয়।
সেদিন একটা বাণী পড়লুম,
রামকৃষ্ণদেবের, 'যিনি শুকরের মাংস খেয়ে
ঈশ্বরের পাদপদ্মে মন রাখেন, তিনি ধন্য, কিন্তু যিনি হবিষ্যি খেয়ে কামিনী-কাঞ্চনে মন রাখেন তিনি ধিক্কৃত'। আমার মনে দুটো প্রশ্ন জাগল, প্রথম, এই ঈশ্বরটি কে? আজ শবরীমালায় যারা ঈশ্বরের কৌমার্য
রাখতে নারীকে ব্রাত্য করছেন কিম্বা ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশের জন্যে বোমা বাঁধছেন,
কিম্বা ঈশ্বরের রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিযোগী ঈশ্বর খাড়া করছেন
এরাও কি নয়? এর উত্তর কোনদিনও পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ ঈশ্বর হয় রাজনীতির নয় অতীন্দ্রিয়, দুই-ই
সাধারণের বোধের বাইরে। দ্বিতীয়ত, ঈশ্বরের পাদপদ্ম ও
কামিনী-কাঞ্চন এই দুই-ই কি মানুষের মন রাখার একমাত্র স্বাভাবিক পরিসর? অভিজ্ঞতা তো তা বলে না। সংসারে মানুষের নানা প্রয়োজন, নানা কর্তব্য, লড়াই ইত্যাদিতে এই দুইটিরই অবকাশ
কতটুকু? কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমাদের
ঈশ্বরমত্ত সমাজ মানবিক স্বাভাবিক গতিপথটিকে উপেক্ষা করে এই দুটোকেই চুড়ান্ত জ্ঞান
করে সমাজটাকে বাধার নিয়ম বানিয়েছিল। একটা জলজ্যান্ত মানুষকে চিতায় পুড়িয়ে শুদ্ধতার
আদর্শে মোহগ্রস্থ করতে তাদের বাধেনি। একজন বিধবাকে একটি পশুর থেকেও অধম জীবন যাপন
করাতে সেই শুদ্ধতার পরিভাষার ছলনায় তাদের বাধে নি। শুদ্ধতা নৈতিক জীবন যাপনে নয়,
শুদ্ধতা অনুকম্পায় নয়, শুদ্ধতা এক এবং একমাত্র
শাস্ত্রীয় অনুশাসনে। আজ যার চুড়ান্ত নিদর্শন শবরীমালা থেকে অযোধ্যা।
শুদ্ধতার প্রতি আকর্ষণের এই
মোহ ভারতের মাটিতে বহু প্রাচীন। ব্রহ্মচর্য, বিবেকানন্দ
বলেছিলেন, ভারতের মূল আদর্শের একটি। যৌনতা এবং শুদ্ধতা -
এদের মধ্যে সম্পর্কটা ভীষণ জটিল। যেন প্রবল আকর্ষণই প্রবল বিকর্ষণের ছদ্মবেশে। তাই
এদের সহাবস্থান আজ যখন বিভিন্ন ধর্মের ক্ষেত্রে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে তাতে
আর বিস্মিত হই না। যারা কথামৃত পড়েছেন, তারা জানেন, 'ঈশ্বর' শব্দটির পাশে পাশে যে শব্দটি মাত্রাতিরিক্ত
উচ্চারিত হয়েছে তা 'কামিনী-কাঞ্চন'।
রামকৃষ্ণের উপলব্ধি জনসাধারণ নেয় নি। কিন্তু বারবার উচ্চারণে তার বিকৃতিটি জনমানসে
স্পষ্ট। কারণ যা ত্যাগ করতে হবে তা তার বোধের মধ্যে। কিন্তু যা পেতে হবে তা তার
বোধের বাইরে। যা আছে তা পাপ, যা নেই তা শুদ্ধ --- এই
দ্বন্দ্বে তার প্রতি মুহুর্তের বেঁচে থাকাটা দুর্বিষহ। কিন্তু কোন দুর্বিষহ
অবস্থাকেই মানুষ চিরদিন সহ্য করে না। তাই কপটতায় অভ্যস্থ হয়ে ওঠে। নিজের অভিজ্ঞতা,
রুচি, অবস্থাকে আড়াল করে একটা মুখোশ, ভান, আচরণবিধি, যা সমাজস্বীকৃত
আঁকড়ে ধরে নেয় --- 'সবাই সবাইকে আড়চোখে দেখে'। বেড়ালটা ঝুলি থেকে না বেরোলেই হল। ঝুলির মধ্যে 'মিউমিউ'
ডাক গেরুয়ার রঙে কিম্বা কীর্তনের কোলাহলে চাপা দিলেই হল। এই কি শুদ্ধতা?
ফ্রয়েড বলছেন, পাপের বোধ গভীর থাকলে শুদ্ধতার প্রতি আকর্ষণ গভীর হয়। রামকৃষ্ণ ও যীশু
বলছেন, ঈশ্বরকে পেতে গেলে পাঁচ বছরের বালকের মত স্বভাব হতে
হয়। কি সব্বোনেশে কথা! যে শরীরে সক্রিয় পিটুইটারী, সে শরীর
পঞ্চম বর্ষীয় বালকের স্বভাব! তখন কাম কি খেলা? সংসার কি
বিনোদন? দায়িত্ব কি বন্ধন? হতাশা কি
বৈরাগ্য? নিজের চোখে কাপড় বাঁধা কি সরলতা? বুঝি না। এতবড় বিশ্ব এক বালকস্বভাব ঈশ্বর চালাচ্ছে বললে যুক্তির সঙ্গে
যুক্তি মেলানোর দায় থেকে বাঁচা যায়। কিন্তু সে কি এস্কেপিজম নয়? জানি না।
সবশেষে একটাই কথা বলি,
তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এই কাল্পনিক শুদ্ধতার
মোহ থেকে বেরিয়ে আসার সময় বহুদিন হল হয়েছে। শান্তি, সাম্য ও
সামঞ্জস্য একটি ব্যক্তি মানুষের, কি একটি সমাজের প্রধান
লক্ষ্য আমরা বহুদিন বুঝেছি। এমনকি ওই ধর্মগ্রন্থগুলোতেও এর ইঙ্গিত আছে। কিন্তু এই
শান্তি, সাম্য ও সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার জন্য কি কোন কৌশলের
প্রয়োজন? না। সচেতন, পরীক্ষাশীল,
সপ্রশ্ন জীবনশৈলী ব্যতীত এর কোন পথ নেই। যে সত্যের অস্তিত্ব আছে,
অথচ প্রয়োগ নেই সে ভয়ঙ্কর - শুদ্ধ গঙ্গাজলের মত।
No comments:
Post a Comment