ধীশক্তি। মানে কি চিন্তাশক্তি? বড্ড কঠিন কথা দাদা।
এই মনে হয় বুঝলাম। খানিক বাদেই ফক্কা। মাথার মধ্যে জাবর কাটছে চাঁদের বুড়ি। এই
মুণ্ডু কি ভাবছিস? মেলে না উত্তর... হ্যালো ব্রেন... কি ভাবো?...
নো রিপ্লাই... ইস লাইনকে সভি রুট ব্যাস্ত্ হ্যায়, কৃপয়া থোড়ি দের বাদ কোশিশ করে.... জাত গেল জাত গেল বলে এ কি আজব
কারখানা... ব্রেন কি ভাবো?... কিসের ব্যস্ততা?... মানুষের জাত হয়... জাতের মানুষ হয়... শোননি? জাত
শিল্পী... এ জাত সে জাত নয়? কে বললে? হবেও
বা, আমি মুখ্যু ঢেকি... ব্রেনে নিউরনের জায়গায় নেফ্রন
আটকে... চিন্তা করব কি গা? ছেঁকেই চলেছি... ছেঁকেই চলেছি...
কি ছেঁকেছি জানি না। যা গেল তাই দামী ছিল না যা রইল তাই দামী, আজও বুঝলাম না। তা বুঝবই বা কি করে বলো, বোঝার জন্যে
তো ব্রেন চাই। আমার যে ব্রেনের মধ্যে নেফ্রন। নেফ্রন বোঝো না? আরে যা বৃক্কে থাকে, মূত্র বানায়। সেই হল কথা। আমি
ওসব ভাবি কি করে বলো? আচ্ছা শুরুর কথাটা কি ছিল যেন? ধীশক্তি। ঠিক। কথা হচ্ছিল ধীশক্তি কি। জানি না। শব্দটা শুনেছি যদিও। একবার
পৈতে হল আমার। যেমন সব মানুষের হয়। প্রচূর উপহার পেলাম। আমি 'প্রচুর' শব্দটাতে 'ঊ'কার দিয়েছি দেখো, মানে অনেক উপহার বোঝাতে। পৈতেতে
গায়ত্রী মন্ত্রও শিখেছিলাম৷ উপহারগুলোর মেয়াদ ফুরোলো, মন্ত্রটা
রয়ে গেল৷ পায়খানায় মাকড়সা দেখলে, ফাঁকা রাস্তায় একা হাঁটলে
রাত্তিরে, কুকুরের হাঁ-মুখ পেরিয়ে চলে যেতে, পরীক্ষা হলে প্রশ্নপত্র পাওয়ার আগে, পড়ার ব্যাচে
আমার ক্রাশের পাশের জায়গাটা ফাঁকা পাওয়ার তালে... ইত্যাদি ইত্যাদি কত কারণে যে
গায়ত্রী মন্ত্রটা বলেছি। ভাবলাম যদি কাজে দেয়। দিল না। তারপর দীক্ষামন্ত্র নিলাম
ফর্ম ফিল-আপ করে, রেশানের চালের মত এক ঘরে আশিজন বসে মন্ত্রও
নিলাম। কাজ হল না৷ আসলেই কপালটা খারাপ। মুখ্যু মানুষ কি আর ঈশ্বর বোঝে? এদিকে মাথার লাইন সবসময় বিজি। পরের চিন্তায় সারাদিন ব্যস্ত, নয় ভবিষ্যতের চিন্তায়। কার গাড়ি হল, বাড়ি হল,
সুন্দরী বউ হল, নতুন ফোন হল এইসব, নয় কাল কি হবে? সামনের সপ্তাহটা কেমন যাবে, বিকালে কি খাব, সামনের বছর কোথায় ঘুরতে যাব...
নানারকম ভবিষ্যৎ চিন্তায় জেরবার।
একটু ব্রেক কষলাম... ঘ্যাঁচ... মাটিতে ঘষটাতে ঘষটাতে থামলাম। ব্রেনে
শর্টসার্কিট হয়েছে৷ নইলে এত ধোঁয়া উঠছে কেন? এত গরম কেন?
শুনেছি যারা বহুদ্দিন ধরে মদ খায়, তারা নাকি
হঠাৎ করে ছাড়তে পারে না। ছাড়লেই কি সব ব্যামো হয়। আমার ব্রেনের সেই দশাই হয়েছে আর
কি। ব্রেন চিন্তার নেশায় মশগুল। পরের চিন্তা আর ভবিষ্যতের ভাবনা। বললেই বলবে,
সবই তো তোমার জন্যে করছি বাপধন আমার। তোমার মত একটা সেন্টিমেন্টাল
ফুল আজকের দিনে কি অচল তা যদি জানতে, কিস্যু হবে না তোমার
দ্বারা। ওই ত্যাগীদের দেখে শেখো, কি সুন্দর কামিনীকাঞ্চন
ত্যাগের আর জীবে প্রেমের গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে বাড়ি-গাড়ি-এসি করে ফেলল। ওসব তুমি
বুঝবে না... সেন্টিমেন্টাল মিডিওকার স্টুপিড উজবুক একটা।
অগত্যা চুপ মেরে যাই। কি বলি, নিজের ব্রেনের কাছে
ঝাড় খেতে কার ভালো লাগে বলো? চারতলা বাড়ি। একদম নীচে একটা
দুষ্টুলোক। তার উপরে পেটুক লোক। তার উপরে আবেগী লোক। মাথার উপর তিনি, আমার ব্রেনি মানুষ। তার কথাতেই তো আমাদের সংসার চলে। আমি কোথায় থাকি?
আমি ঘামাচির মত। এই এখানে তো সেই সেখানে। আমায় কেউ ডাকে না, আমিও কাউকে ডাকি না। কিন্তু চাই আমি সবাইকে। না ডাকলেও।
আরে আসল কথাটাই তো হচ্ছে না। 'ধী' মানে কি যেন? আসলে পৈতের পর থেকে ওই কথাটাই আমার
মাথায় নড়েছে। আমার মাথার উপর যে আকাশটা, আমি ব্রেন সরিয়ে ওটা
দেখি। আমার খুব ভালো লাগে। আনন্দ পাই। মনে হয় কাজে লাগুক না লাগুক একটা আকাশ তো
আছে। মাথার উপরেই আছে। এমনকি বিশ্বাস করুন, যে আমি চশমা ছাড়া
টিভি কি সিনেমা দেখতে পাই না, সেই আমি কিনা চশমা ছাড়া আকাশ
দেখে ফেলি? মানে কত বড় ব্যাপারটা বলুন একবার!
আমার মনে হয় আমাদের ধী-টা এই আকাশের মতই একটা বড় অকাজের কিছু একটা বস্তু।
শুনেছি পাতা নাকি সূর্যালোকের নামমাত্র নিয়ে বাকিটা ফিরিয়ে দেয়, ওতেই সালোকসংশ্লেষ হয়ে যাবে বলে। আমরাও কি তাই? অতটুকু
ধী-তেই সংসারের গ্রাসাচ্ছাদন আমোদ-আহ্লাদ হয়ে যায় বলে বাকিটা ফিরিয়ে দিই? এই যেমন ধরেন রবীন্দ্রনাথের কথা। মানুষটার মাত্র আড়াইশোটা গান গেয়ে বাকিটা
ধুলোচাপা দিয়ে রাখলুম, মাত্র গান আর কয়েকটা কবিতা নিয়ে অমন
সব প্রবন্ধগুলো সিলেবাসের বাইরে বলে রেখে ফানুস উড়াতে লাগলুম। কি মুশকিল। এদিকে
মাথার ব্যামোতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। এ ওরে দেখতে পারে না। ও তারে৷ লেগে যা লেগে যা নারদ
নারদ। এর ডানার সাথে ওর ডানার ঠোকাঠুকি। হবে না? আকাশটাকে
কেটে ছোটো করে বাকিটা মহাকাশে ফিরিয়ে দিয়েছি যে, বলেছি,
এতেই হবে। তাই বাকি ধী-টা আমাদের ডেকে ডেকে বলছে, "ওরে এদিকে আয় অনেক জায়গা, ওরে আগল খোল, এদিকে আয়।" আমরা ভাবছি ওসব নিশিডাক। তাই কয়েকটা মন্তর আওড়ে, মিছিমিছি মহান লোকের কাঠের মূর্তি বানিয়ে এইটুকু ধী-এর স্লেটে এত্তবড়
জীবনের আঁক কষতে চাইছি। তাই কি হয় রে পাগলা?
No comments:
Post a Comment