রূঢ় সত্য আছে। কঠিন সত্য আছে। সত্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে। ভিতরের বাইরের
জগতের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে।
জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা। জীবনকে নিয়ে চিন্তা। এ দুটো তো একই কথা নয়।
আমার অনুভবের সাথে যথাযথ শব্দ খোঁজা যেমন একটা শক্ত কাজ। এও তো তেমনই। জীবনকে নিয়ে
চিন্তা করতে গেলে অনেকগুলো ধারা জন্মায়। তার একটা বিজ্ঞান – অর্থাৎ
যা ধরা ছোঁয়া প্রমাণ পরিমাপের মধ্যে। আরেকটা দিক অস্পষ্ট, অজ্ঞাত,
অনুভবের। আমার মধ্যে যেন এক অনুভবী। রবীন্দ্রনাথের গানে যাকে দরদিয়া,
স্বামী, প্রভু, জীবনদেবতা,
সখা, বন্ধু – ইত্যাদি
নানা নামে জেনেছি।
সে অনুভবীর অনুভবেই আমার যা কিছু অনুভব। অনুভবের কোনো ভবিষ্যৎ কাল বা
অতীতকাল হয় না। যা হয় ‘এখন’ ই অর্থাৎ
বর্তমানে। কোনো অনুভবের স্মৃতি কখনওই অনুভব নিজে তো নয়। তাই অনুভবী সব সময় –
এখন। সে স্বাবলম্বী, নির্ভয়। আমার ভয়, আমার দুশ্চিন্তা, আমার লোভ – এই
আমায় ‘এখন’ থেকে বারবার পিছনে বা সামনে
টেনে নিয়ে যায়। আশঙ্কা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা
ইত্যাদিতে পীড়িত তখন আমার মন।
আমার চিন্তাকে যখন আমি স্পষ্ট করে বুঝি তখন যে অনুভব জন্মায় – সে অনুভবে আমি স্থির শান্ত। আমি মানে চিন্তা। সে চিন্তা যত অগভীর, যত জট পাকানো, যত প্রভাবিত – তত
অস্থির আমি। তাই নানা কিছু জানার চাইতে সব চাইতে গভীরে যে জানাটা স্পষ্ট করে জানার
চেষ্টায় কাল কাটালে মন অনেকটা শান্ত থাকে, সুস্থ থাকে তা হল
নিজের চিন্তাকে স্পষ্ট করে জানার চেষ্টা।
এর মধ্যে কয়েকটা জিনিসকে সারা জীবন জানা যাবে না সে কথা নিজেকে বলেই এ
চেষ্টা শুরু করা উচিৎ বলে আমার মনে হয়।
প্রথমত, মৃত্যু। এ চিরকালের রহস্য থেকে যাবে মানুষের
কাছে। তার নানা ব্যাখ্যা নিশ্চয় থাকবে। ব্যাখ্যার পর ব্যাখ্যা জমতেই থাকবে,
কিন্তু মৃত্যু তার পরম রহস্যময়তার থেকেই যাবে।
দ্বিতীয়ত, ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও অনিস্তত্ব। এ নিয়ে
তর্কে কাল কাটানো নিরর্থক। ঈশ্বরের অস্তিত্বের সাথে মানুষের সরাসরি কোনো সম্পর্ক
আছে বলে আজ অবধি মানব সভ্যতার ইতিহাসে কিছু প্রমাণিত হয়নি। ঈশ্বরকে স্বীকার করেও
মানুষ চূড়ান্ত বর্বর, হিংস্র, লোভী,
উন্মাদ হয়েছে, আবার ঈশ্বরকে অস্বীকার করেও অনেক
সৎচরিত্র মানুষ সমাজে এসেছেন তারও উদাহরণ আছে। কথাটা ঈশ্বর নয়। কথাটা মানুষের সদ
আর অসদ গুণাবলী। দুই-ই। এখন দেখতে হয় কোনো একটা সমাজ, কোনো
একটা সময় কোন গুণাবলীকে উৎসাহিত করছে চর্চা আর বৃদ্ধির জন্য আর কোন অবগুণগুলোকে
দমনের চেষ্টা করছে তার উপর। বিপরীতটা চর্চাটাও যে হয় তার উদাহরণও আমরা ইতিহাসে
দেখেছি।
তৃতীয়ত, ভাগ্য নিয়ে। ভাগ্য অনেকগুলো বস্তু আর শর্তের
সমাপতন। যে মানুষটা দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে, বা বিশ্বাসঘাতকার
শিকার হচ্ছে, কিম্বা কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে – সেই কঠিন সময়ের সমাপতনে তার নিজের কোনো ভূমিকা নেই, কিন্তু
তাকে স্বীকার করে নিয়ে নিজের মধ্যের সাম্যাবস্থা বজায় রাখার দায় তাকে নিতেই হবে।
নইলে বাইরে শূন্য হওয়ার আগে নিজের মধ্যেই শূন্য হয়ে যাবে। নিজেকে ধ্বংস করে কি লাভ?
আমার সমস্ত কিছুকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার ভার যখন আমারই উপর, তখন সে ভার মাথা উঁচু করে বয়ে নিয়ে যাওয়াই ভালো। ভাগ্যের হাত ধরে যে
যন্ত্রণা দুর্ভোগ আসে তার থেকে বেরোবার পথ যদি বিজ্ঞানের বা মানুষের অন্য কোনো
ক্ষমতাই আবিষ্কার করে না থাকতে পারে তবে তো সে ভার বহন করে নিয়ে চলাতেই গৌরব।
মৃত্যু, ঈশ্বর-অনীশ্বরবাদ, ভাগ্য
– এই তিনজনকে প্রণাম জানিয়ে সরে আসাই ভালো। এদের কারোর উপরে
আমার শান্তিতে থাকার ভার নেই যে। আমার শান্তির ভার আমারই হাতে। নিজেকে যতটা বুঝেছি
তারই উপরে। নিজেকে অর্থাৎ নিজের চিন্তাকে। নিজের উদ্দেশ্যকে। সেই উদ্দেশ্যও অবশ্যই
আরেকটা চিন্তা। আমরা বলি না, “কি চিন্তা করে কাজটা করেছিলি /
ছিলে / ছিলেন?” নিজের চিন্তাকে বোঝার জন্য নিশ্চয় চেষ্টা করব,
ওই তিনটে পাড়ার লড়াইয়ে নিজেকে না যেতে দিয়ে। কারণ ওতে সময়, আর ক্ষমতা নষ্ট। ভারতের এটা বুঝতে অনেক সময় লেগেছিল। বুদ্ধ সাবধান করার
পরেও। ফলে পুরো জাতটা জেগে ঘুমালো। অদ্ভুত উদ্ভট সব তত্ত্ব আবিষ্কার করল। সে পথের
নেশায় আর না যাওয়াই ভালো। যদিও সে পথের নেশা নানা বাবাজী, মঠ
মিশন ইত্যাদি তথাকথিত সরল দর্শনের ছদ্মবেশে আজও আমাদের লক্ষ লক্ষ ভারতীয়
অতিবিশ্বাসপ্রবণ জাতটার প্রাণশক্তি শুষে খাচ্ছে, তবুও আশা
করব, এ পথের বিরাম আসুক। সদগুণের চর্চা বাড়ুক বিজ্ঞানের
আবিষ্কারের সাথে সাথে, কিন্তু একজন সমস্ত সদগুণসম্পন্ন
আকাশস্থ কিম্বা হৃদয়স্থ পুরুষের গল্পের নোটে গাছটা মুড়াক। তিনি হৃদয়ে বা আকাশে
যেখানেই থাকুন, অতি ঘৃণ্য বর্বর দুর্ঘটনাকে যে আটকাতে পারছেন
না, সে তো প্রতিদিনের খবরের কাগজই যথেষ্ট।
আমরা আমাদের চিন্তার জগতটাকে বুঝতে চেষ্টা করি। সব কাজের মধ্যে মধ্যে। যে
বাড়িতে সারা বছর কাটাই, যে গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়াই, যে বিছানায় শুই, যে পোশাকে থাকি – সে সবের যেমন ধোয়ামোছা, কাচাকাচি, সার্ভিসিং ইত্যাদি চলে, তেমনই যে চিন্তার মধ্যে,
যে চিন্তা সারাপথের পাথেয়, তাকেও মাঝে মাঝে
স্বচ্ছ করে নিতে হবে। অনুভবে শান্তি আসবে তখন। অনুভবীর কথা যে বললাম, সেও আমিই। আমার নিস্ক্রিয় সত্তা। সেও আমিই। আমার সক্রিয় সত্তার দিকে স্থির
নজরে তাকিয়ে। রবিবাবু যাকে বলেছেন, “যে আমি ওই ভেসে চলে”
গানটায়। সেই নিষ্ক্রিয় আমি যখন চোখ কুঁচকে তাকাচ্ছে, বুঝতে হবে যে আমার চিন্তাকে সার্ভিসিং এ পাঠানোর সময় এসে গেছে। না পাঠালে
অন্তঃকরণের উষ্ণতা বাড়বে। চারদিক তপ্ত হয়ে উঠবে। শান্তি হারাব।
No comments:
Post a Comment