বেচোকে সবাই চেনে। বেচোকে মদ খেয়ে রাস্তার ধারে, মদনপুর স্টেশানে লাট খেয়ে পড়ে থাকতে
অনেকে দেখেছে। মার খেয়ে রক্তাক্ত শরীরে পড়ে থাকতেও দেখেনি এমন লোক এ তল্লাটে পাওয়া
শক্ত।
বেচোর
কোনো ইতিহাস নেই। কেন নেই, সে প্রশ্ন করার সময় নেই, দরকারও পড়েনি। বেচো সামাজিক না,
পারিবারিক না, পাড়াভুক্তও না। বেচো যোগেনের মুদিখানার দোকানে দাঁড়িয়ে। সামনে পুজো,
প্রচণ্ড ভিড় দোকানে। পাশে যোগেনের ভাই রতনের জামাকাপড়ের দোকান, সেখানেও বেশ ভিড়। এসব
দোকান বাকিতে চলা দোকান। ভদ্র-মোটা টাকার মানুষেরা এদিকে আসে না। তাছাড়া পাশেই একটা
ভাগাড়। তার দুর্গন্ধ সহ্য করার ক্ষমতা ভগবান সবাইকে দেন না।
বেচো
সকাল থেকে ঘুরঘুর করছে। রতন যোগেনের চোখ এড়ায়নি। জানে এখন কিছু একটা ঘটাবে বেচো। বেচো
চোর। পুলিশ অবধি যায়নি যে তা নয়, তবে পুলিশও এড়িয়ে যায়, কেউ থানায় নিয়ে গেলে বলে, কয়েক
ঘা দিয়ে ফেলে রাখুন না। তবু বেচো এই সমাজের অলিতে গলিতেই ঘুরে বেড়ায়। কারণ অবশ্য আছে।
বেচো অন্ধকার, পাপ, পুলিশ, মানহানি ইত্যাদি কিছুকেই ভয় পায় না। তাই সে অনেকের কাজে
লাগে। যেসব ভদ্র মানুষের নানা গতির, প্রবৃত্তির সব কাজে নিজেকে সরাসরি নিযুক্ত করতে
দ্বিধা – বেচো তাদের গতি। তাই বেচো কারোর সাপ্লায়ার, কারোর চর ইত্যাদি ইত্যাদি।
অবেশেষে
রতন যোগেন দু'জনেই দিনের শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে বুঝল বেচো সফল হয়েছে। রাতে বেচোর বাড়ি
গিয়ে... দাঁড়ান, বেচোর আবার বাড়ি কি? একটা টালির ঘর, দরজা নেই, বাথরুম নেই, রান্নাঘর
নেই। একটা ঘরে একটা চৌকি পাতা, চারদিকে মদের বোতল, একটা স্টোভ, কয়েকটা বাসন-কোসন এদিক
ওদিক, আর কয়েকটা জলের বোতল। বেচো চৌকিতে শুয়ে ছিল। তার খাটের পাশে একটা প্যান্ট, লুঙ্গী,
শাড়ি... শাড়ি কেন? রতন থমকালো, কিন্তু মারতে মারতেও জিজ্ঞাসা করতে পারল না, শাড়ি চুরি
করেছিস কেন, কার জন্য? কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসে যদি? থাক।
যথারীতি
বেচো নেই। বেচো মার খাওয়ার পর অন্তত চার-পাঁচ দিন এদিকে আসে না। কেউ বলে হরিণাভীতে
ওর কে এক বিধবা মাসী আছে সেখানে চলে যায়, কেউ বলে হাওড়া স্টেশানে পড়ে থাকে নাকি। কেউ
জানতে চায় না। সংসারে গল্পের শেষ নেই, এরকম কয়েকটা খুচরো গল্প তৈরি হতে, ভেসে বেড়াতে
খুব একটা পরিশ্রম কাউকেই করতে হয় না। বেচো ফিরল আবার মহালয়ার দু'দিন আগে। কার্তিকের
দোকানে সকালবেলা চা খেতে দেখা গেল বেচোকে।
পাড়ায়
একটা চাপা গল্প শোনা গেল। বেচো নাকি রমেশ কণ্ট্রাক্টারের সাথে কথা বলে এসেছে, সে বাড়ির
কাজে হাত দেবে। আবার টাকা নাকি নগদ দেবে সে কথাও বলে এসেছে। কি থেকে কি হয় বোঝা যায়
না। কেউ বলল বেচো লটারী পেয়েছে, কেউ বলল ব্যাঙ্ক ডাকাতির দলে ছিল, কেউ বলল ওর সেই আত্মীয়
মরে গিয়ে হয়ত সব সম্পত্তি লিখে দিয়ে গেছে। কিন্তু কেউ আসল কথাটা আর জানে না। জানবে
কি করে? বেচোকে কেউ জিজ্ঞাসা করলেই বেচো হেসে উত্তর দেয়, "অ্যাদ্দিন বাবার সেবা
করলুম, বাবা কৈলাস থেকে মা অন্নপূর্ণাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন কিছু টাকা, তাই আর কি..."
তবে কি
বেচো কাউকে ব্ল্যাকমেল করছে? পাড়ার মধ্যে এমন একটা তত্ত্বই শেষে দানা বাঁধতে লাগল।
কিন্তু কাকে? অনেকেই সন্দেহের তালিকায় আছে। বেচো অনেকের হাঁড়ির খবর জানে। বেচোর বয়েস
কত হবে? চল্লিশের আশেপাশে। এর মধ্যেই সমাজের সব অন্ধকার গলিই তো তার ঘুরে আসা। তবে
কি এইখানকার কাউকেই ফাঁসিয়েছে, না কলকাতার ওদিকে?
আজকাল
বেচো বাড়ি থেকে বেরোয় না। কারা কারা দেখা করতে আসে বেচোর সাথে মাঝে মাঝেই। ভদ্র সমাজের
কেউ তো অবশ্যই নয়। আবার একবার এমন বড়লোক একজন দেখা করতে এল যে তার গাড়ির মত গাড়ি এই
তল্লাটে কেউ কোনোদিন দেখেনি। যারা যারা বেচোকে মেরেছিল তারা এখন বেচোকে এড়িয়ে যায়।
রতনের মেয়েকে একবার বেচো চুমু খেয়েছিল। সেও এক পুজোর সময়েই। বিসর্জনের দিন সন্ধ্যেবেলা সিদ্ধি খেয়ে উদ্দাম নাচ-গান
হচ্ছে, বেচো প্যাণ্ডেলের পিছনে রত্নাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিল। রত্না কিছু বলেনি,
কিন্তু পাড়ার একটা ছেলে দেখতে পেয়ে পুরো পাড়ায় রটিয়ে দিয়ে একটা ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটিয়েছিল।
অবশ্য রত্না কেন কিছু বলেনি এই নিয়েও কথা হয়েছিল। রত্নার ভাষায় রত্না প্রথমে ঘাবড়ে
গিয়েছিল। তারপর যখন বুঝল কি হয়েছে তখন বাড়ি এসে বলতে ইচ্ছা করেনি। একটা চুমুই তো খেয়েছে,
তাও নেশার মধ্যে, এমনিতেই যা মার খায় লোকটা আর তার জন্যে আলাদা করে মার খাওয়াতে ইচ্ছা
করেনি। যারা মারবে তাদের অনেকের চাহনি তো জানাই, যেন এক্স-রে করে নিচ্ছে। তারাই তো
মারবে। তার চাইতে থাক। তবে এরপর থেকে বেচোর মুখোমুখি হলেই বেচো যেন লাফ দিয়ে পালিয়ে
যেত। যেন সে ভূত। কষ্ট হত রত্নার।
রত্না
শ্বশুরবাড়ি থেকে পুজোয় এসে শুনল বেচোকে নিয়ে নতুন গল্পটা। একদিন বিকালে কৌস্তুভ, তার
স্কুলের বন্ধু, ওকে নিয়ে বেচোর বাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরেও এল। একটা বিশাল গাড়ি দাঁড়িয়ে
বেচোর বাড়ির সামনে। পাশের মাঠে ইট, বালি ডাই করে রাখা। ঘরের ভিতর থেকে মোটা গলার অনেক
পুরুষের হাসির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কৌস্তভের চোখের দিকে তাকালো রত্না। রত্নার এ দৃষ্টির
মানে কৌস্তভ জানে, সে বলল, আজ না, অন্যদিন বেচোদা ফাঁকা থাকলে। কৌস্তভ নিজের উচ্চারণে
হোঁচট খেল – বেচোদা!... দা!...
হ্যাঁ,
ইদানীং পাড়ায় এই শব্দটা ঘুরছে। বেচোর আদিনাম খোঁজারও চেষ্টা করছে অনেকে ঐতিহাসিকের
মত। কেউ বলছে, ওদের টাইটেল কি বাচস্পতি ছিল? কেউ বলছে, বচ্চনের ফ্যান ছিল কি ও? কেউ
বলছে নাকি ওর এটা ডাক নাম, আসলে ভালো নাম ছিল... তপন, বিশ্বেশ্বর, সোমেশ্বর, বিধান,
নকুল, সুনীল... যার জানা যত ভালো নাম সে আন্দাজ করতে লাগল, অন্যের আন্দাজের উপর দিয়ে
গেল, কিন্তু আসল নাম?
কেউ
জানে না। কিন্তু জানতে চাইছে আজ।
দোতলা
বাড়ি উঠল বেচোর। এরপর কথা শোনা গেল বেচোর নাকি বিয়ে। মেয়ে কলকাতার। তবে কি ওই বড়লোকের
বাড়ির মেয়ে? কেউ জানে না। বিয়েতে তল্লাটের কেউ নিমন্ত্রিত হল না। অথচ কত মানুষ নিমন্ত্রিত
ছিল। তারা সব বড় বড় গাড়ী করে এলো। দু'দিন থাকল। ইংরাজি হিন্দি গান হল। নাচ হল। মদের
ফোয়ারা ছুটেছিল নাকি, সে-ও দেখেছে অনেকে। আশ্চর্য, বিয়েতে নেমন্তন্ন পেলো রত্না। শুধুই
রত্না।
সবাই
রত্নাকে ঘিরে ধরল, জিজ্ঞাসা করল, কি করে হল? কি হল? কেমন করে হল? বউ কেমন?
রত্না
সবার কথার একটাই উত্তর দিল – জানি না।
এরপর
থেকে রত্নাকে কেউ আর বেচোর বাড়ী যেতে দেখেনি, না তো কোনো কথা সেই প্রসঙ্গে বলেছে।
লোকে
যাতায়াত করতে করতে শোনে বেচোর ছেলের কান্না, দেখে বেচোর ছেলের স্কুলে যাওয়া, বেচোর
মায়ের ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া, বাড়িতে নাকি এতগুলো এসি চলে তার জলেই ডেঙ্গুর মশা জন্মেছিল।
বেচোর বউয়ের মৃত্যুতে পাড়ার বয়স্কেরা খুশী হয়, বেচোর বয়স্যেরা বেচোর ছেলের কষ্টে দুঃখ
পায়, যদিও সে খুব কম কথা বলে, তবু সমবয়েসী কারোর কারোর সাথে কথা তো বলে। তবু বেচোর
উন্নতির ঘটনার রহস্যের কিছু কেউ জানতে পারেনি, কারণ সেই উৎসুক ব্যগ্র মানুষেরা এখন
বয়েসের ভারে ঝুঁকে পড়েছে, নানা ঝামেলায় জর্জরিত আর নতুনেরা পুরোনোকালে কি হয়েছে সে
নিয়ে উৎসাহিত নয়। রত্নার স্মৃতিভ্রংশ রোগ হয়েছে - অ্যালজাইমার।
No comments:
Post a Comment