লাট্টু ঘোরে কিভাবে? লাট্টু মাটিতে ঘুরিয়ে ছাড়ার একটা নিয়ম আছে। সবাই পারে না। লাট্টু
যতক্ষণ তার তীক্ষ্ণ লোহার ফলাকে মাটির সাথে বিঁধিয়ে ঘুরতে পারবে ততক্ষণ সে সোজা থাকবে।
ওই তীক্ষ্ণ ফলাটাই তার কেন্দ্র, বুঝলে? আমাদের মধ্যেও সেই কেন্দ্র আছে, সেখানে স্থির
হয়ে না দাঁড়াতে পারলে মুখ থুবড়ে পড়বে...
সেঁজুতি বালিশে মুখ গুঁজে মায়ের এই
কথাগুলো ভাবছিল। আজ ভৃঞ্জু তাকে আবার খুব খারাপ খারাপ কথা বলেছে। সবার সামনে না, ভৃঞ্জু
সবার মধ্যে আড়াল খুঁজে নিতে পারে। নইলে বিয়েবাড়ির এত ভিড়ের মধ্যে সে তীর বিঁধবার জায়গা
সময় করে কি করে?
সেঁজুতির বোনের বিয়ে। শিলিগুড়ি এসেছে
ভৃঞ্জু আর সেঁজুতি চারদিন হল। তারা থাকে সাঁকরাইল। ভৃঞ্জু নিজেকে বঞ্চিত ভাবে। তার
বিয়ের সময় নাকি তাকে এত আদরযত্ন করা হয়নি, এতকিছু দেওয়া হয়নি যা তার শালী পল্লবিতাকে
দেওয়া হচ্ছে। ভৃঞ্জুর এরকম মনে হওয়ার কারণ হচ্ছে সে নাকি কারখানার শ্রমিক, আর পল্লবিতার
বর ব্যাঙ্কে কাজ করে, তাই তার দাম বেশি। ভৃঞ্জু কারোর সম্বন্ধে খারাপ শব্দ ব্যবহার
করে না, সে তার প্রতিপক্ষকে হীন প্রমাণ করে। প্রতিপক্ষ সে যাকেই বানাক না কেন তার প্রতিটা
কাজের, কথার সে অত্যন্ত নীচ একটা না একটা অর্থ বা উদ্দেশ্য বার করে। এ একটা অদ্ভুত
ক্ষমতা ভৃঞ্জুর। প্রথম প্রথম সেঁজুতি বিশ্বাস করে ফেলত, কষ্ট পেত, কুঁকড়ে যেত। ধীরে
ধীরে বুঝল যে এ ভৃঞ্জু অসুস্থ, মানসিকভাবে অসুস্থ।
সেঁজুতির ঘুম আসছে না। আসার কথাও নয়,
প্রচণ্ড শ্রম হলে তার ঘুম আসে না। তার ওপর আজ ভৃঞ্জুর কথাগুলো। এতটা নিষ্ঠুর একটা মানুষ
শান্ত মাথায় হতে পারে ভাবলে বিস্ময় লাগে সেঁজুতির। সেঁজুতির মা কমলিকা স্টোভ ফেটে মারা
গেছেন দু'বছর হতে চলল। সেঁজুতি দেখতে আসতে পারেনি, তার তখন গলব্লাডার অপারেশান হয়েছিল।
এখন ভাবে, ভাগ্যে দেখতে হয়নি, মুখটা নাকি চেনাই যাচ্ছিল না। সেই ভালো, এমনিতেই মানুষ
বলে, তুই আমার মরা মুখ দেখবি, রেগে গেলে বলে না? তার মানে সেই মুখটা দেখা নিশ্চয় ভালো
না।
সেঁজুতি জানে সে এখন খেই হারানো চিন্তায়
ভাসছে। এই ঘরে কেউ শোয়নি তার সাথে। একাই শুয়েছে। মায়ের ঘর এটা। এ ঘরে নাকি মাকে দেখা
যায়, পাড়া-প্রতিবেশীরা বলে, বাড়ির কাজের লোকগুলোও বলে। সেঁজুতি অপেক্ষা করছে কি?
সেঁজুতির বাবা খুব বড় পদের সরকারি
কর্মচারী ছিলেন, তা ছাড়া তার ঠাকুর্দার সম্পত্তিও ছিল বেশ। তাদের বেশ কিছু জমিজমা এখনও
আসামে আছে। ভৃঞ্জুর ইচ্ছা বাবা সেগুলো তার নামে করে দেবে। তারা দুই বোন, এক ভাই, ভাই
ডিফেন্সে আছে। বাবা এক ছটাকও দেবে না ভৃঞ্জুকে, সেঁজুতি জানে। বাবা পছন্দ করে না ওকে।
অথচ বাবা-ই দেখেশুনে বিয়ে দিয়েছিলেন। তার কেমন যেন একটা পরিচিতির মধ্যে সম্বন্ধ এসেছিল।
ভালো ছেলে – এই ছিল ভৃঞ্জুর মেসে ভৃঞ্জুর পরিচয়। কোনো নেশা নেই, বদভ্যাস নেই, কোনো
স্ক্যাণ্ডাল নেই। কিন্তু মানুষটা যে কত নীচ সে তার সাথে না থাকলে কে বলবে?
সেঁজুতি উঠে মায়ের আলমারিটা খুলল।
মায়ের শাড়িগুলোতে ন্যাপথলিনের গন্ধ। শেষের দিকে মায়ের মাথাটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। শেষের
দিকে পাওয়া কোনো দামী শাড়িই প্রায় ভাঙা হয়নি। মায়ের অন্তর্বাস একটা নিল সেঁজুতি, রাস্তার
দিকের পর্দাটা টানল। নাইটিটা খুলে সেই ন্যাপথলিনের গন্ধওলা ব্রা-টা পরল, তার ঢিলে হচ্ছে,
মা বেশ মোটা ছিল, থাইরয়েড ধরা পড়ার পর আরো মোটা হয়ে গিয়েছিল। যদিও বাবা বলে নার্ভের
ওষুধ খেয়ে।
মায়ের একটা শাড়ি পরল। অন্ধকারে রঙটা
বোঝা যাচ্ছে না, তবে মনে হচ্ছে ডিপ নীল, কালো নয়। সেজোমাসি দিয়েছিল পুজোয়, মনে আছে।
এই শাড়িটা পরার ইচ্ছা ছিল খুব। এখন পরে ভালো লাগল না। কিন্তু খুলে ফেলতেও ইচ্ছা করছে
না। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মোবাইলটা সাথে নেই। নইলে মোবাইলের আলোয় দেখত কেমন দেখাচ্ছে
তাকে। প্রীতম মোবাইলটা খেলতে নিয়ে গেছে। সে ভৃঞ্জুর সাথে শুয়েছে। ওর ভূতের ভয় ভীষণ,
এ বছর এইটে উঠল।
- একটা লোক ছিল, তার নাম রামনিধি সর্দার। সে যুদ্ধ করত, মানে
সেনা ছিল। খুব ভালো যোদ্ধা ছিল তা নয়, কিন্তু দারুণ ভালো স্বাস্থ্য ছিল। ইয়া লম্বা,
ইয়া মোটা মোটা পেশি, ইয়া গাবদা গাবদা থাই...
- মা, বাবার মত?
- না না, তোমার বাবার মত না, তার মনটা ছিল সদ্যোজাত পাখির মত
কোমল। তার যুদ্ধ করতে একটুও ভালো লাগত না। কিন্তু বাপ-ঠাকুর্দার জেদে তাকে যুদ্ধ করতে
যেতেই হত। তার বাপ-ঠাকুর্দাও যোদ্ধা ছিল তো। কিন্তু তার বাবার দুটো হাত যুদ্ধ করতে
গিয়ে কাটা পড়েছিল, আর তার ঠাকুর্দা অন্ধ হয়ে গিয়েছিল ভেজাল বারুদ চোখে পড়ে।
- আসল বারুদ পড়লে কি হত?
- মরেই তো যেত। ভেজাল বারুদে মরেনি, কিন্তু অন্ধ হলে কি হবে,
রামনিধির বাপ-ঠাকুর্দা সারাদিন ঘরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলত। আরো কতো রকমের দুষ্টুমি তারা
যে জানত সে তুমি বড় হলে বুঝবে। একটা মেয়েও শান্তিতে থাকতে পারত না তাদের গ্রামে।
- তারপর কি হল?
- তো রামনিধির কি হত জানো, যেই না যুদ্ধের জন্য বিউগল বাজত,
অমনি রামনিধি অন্যমনস্ক হয়ে যেত। সে সেই বিউগলের আওয়াজে কোনো না কোনো রাগ শুনত। যেমন
টোড়ি, বিলাবল, ভৈরবী, ভৈরব --- এরকম। সব সকালের রাগ। যেই না শুনত, অমনি সে দৌড়ে সেনাপতির
শিবিরে গিয়ে বলত, ও সেনাপতি আজ আমি আর যুদ্ধু করব না, আমার মনটা ভালো নেই, আমার মাথায়
ব্যথা, পেটে ব্যথা, হাতে-পায়ে বেজায় ব্যথা। আজ থাক না? আমায় ছেড়ে দাও...
কিন্তু সেনাপতি কি আর শুনত? সে তাকে
চ্যাংদোলা করে হাতির পিঠে উঠিয়ে দিয়ে বলত, যাও যুদ্ধু করো। এই বলে হাতিটার পেটে সুড়সুড়ি
দিয়ে তাকে শত্রুপক্ষের শিবিরের দিকে ধাইয়ে দিত। এখন এত্তোবড় রামনিধির নিজের শরীর, তার
ওপর অত্তোবড় হাতি, লোকে এমনিতেই ভির্মি খেত।
একদিন
রামনিধি সত্যি সত্যিই মারা গেল।
- মানে আসল বারুদ লেগেছিল মা?
- হ্যাঁ, সেই রামনিধি মরে শান্তি পেল। যেই যুদ্ধ করতে যেত সে
তাকে আচ্ছাসে ধরে এমন কাতুকুতু দিত যে কেউ ঘোড়া থেকে পড়ে যেত, কেউ হাতির পিঠ থেকে পড়ে
যেত, কেউ অস্ত্র ধরে মাটিতে শুয়ে হাত-পা ছড়িয়ে হেসে কুটিপাটি হত। এই করে করে যুদ্ধ'র
অবসান ঘটল সেই দেশে।
- অবসান মানে কি মা?
- শেষ।
শেষ মানে কি পরিণতি না আরেকটা শুরু?
সেঁজুতি বুঝতে পারে না। তবে রামনিধির বাবা আর ঠাকুর্দাকে সে চিনতে পেরেছে একটু বড় হতেই।
বাবার শোয়ার ঘরে মাঝে মাঝেই চা-বাগানের মেয়ে-বউদের আনাগোনা হত। বাবা নাকি চিকিৎসা করতে
পারে। এই নিয়ে ঝামেলাও হয়েছে কয়েকবার। বাবার টাকা আর রাজনৈতিক ক্ষমতা সে সব বাড়তে দেয়নি।
শুধু মায়ের মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে ধীরে ধীরে।
সাড়ে তিনটে বাজে। জুলাই মাস, সকালের
আলো ফুটবে আর ঘন্টাখানেকের মধ্যেই। সেঁজুতি দরজাটা খুলে বাইরে এলো, বিরাট উঠান। চারদিকে
বাঁশ, ফুল, এটা-ওটা ছড়িয়ে। হঠাৎ সেঁজুতির মনে হল, পিছনের বাগানের মধ্যে কে যেন দাঁড়িয়ে।
দেখে মনে হচ্ছে মহিলা। কে এত রাতে?
সেঁজুতি এগিয়ে গেল। তার নতুন শাড়িটা
ঘষটাতে ঘষটাতে বিয়েবাড়ির বাসিফুল সাথে নিয়ে চলল। তার সাজ এলোমেলো। সেঁজুতি জানে না।
কাজলের দাগ কপাল ছুঁয়েছে, থেবড়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো। শাড়িটাকে কোনোরকমে জড়িয়ে এগোচ্ছে
সে। বুকে হাওয়া এসে লাগছে। তার মায়ের আলগা অন্তর্বাস। সামনে দাঁড়িয়ে তার মা, কমলিকা।
সেঁজুতি মায়ের মুখের উপর হাত রাখল।
তারার আলোয় দেখল পোড়া দাগ। আঙুলে পোড়া শুকনো চামড়াগুলো ঢেউয়ের মত খেলে গেল। সেঁজুতি
কমলিকার কপালে চুমু খেল। মাথার চুলগুলো পুড়ে খড়ের মত হয়ে গেছে। কমলিকা সেঁজুতির অন্তর্বাস
ছুঁয়ে বলল, কি রোগা হয়ে গেছিস রে? এ শাড়ি পুনু দিয়েছিল না?
সেঁজুতি আর কমলিকা হাঁটল। কিছুটা দূরে
জঙ্গল। সেখানে মাটিতে মা-মেয়ে শুলো পাশাপাশি। শ্রাবণের আকাশ। মেঘ নেই। তারাগুলো বড্ড
কাছে। সেঁজুতি বলল, মা, রামনিধির কি হল?
কমলিকা বলল, রামনিধি আবার জন্মেছে।
বাচ্চাদের পড়ায়। সে বলে, মানুষ এখন আলোকে ছেড়ে অন্ধকারকে নিয়ে তপস্যা করে। ভাবে, অন্ধকারের
মধ্যে পথ পাবে। এতে করে যে আরো অন্ধকারে তলিয়ে যায় সে বোঝে না। তোমার বাবা, ঠাকুর্দা,
তোমার বর – এরা সবাই সে অন্ধকারের মধ্যের অন্ধকারে তলিয়ে, তুমি ওদের সাথে থেকো, কিন্তু
সাথে হেঁটো না।
- ওরা টানে যে...
- অন্ধকার আলোকে টানে না রে মা, মোহাচ্ছাদিত করে। মোহ কি টান?
সেঁজুতি আকাশের দিকে তাকালো। অসীম
অন্ধকারে এত এত গ্রহ-নক্ষত্রের নাগরদোলা। সেঁজুতিও সেই নাগরদোলায়। ভৃঞ্জু কে? অন্ধকারপুঞ্জ।
মোহ। মরুক সে। সেঁজুতির মোবাইলটা লাগবে এখন, কেমন দেখাচ্ছে তাকে দেখবে না? সেঁজুতি
দৌড়াচ্ছে বাড়ির দিকে, আলুথালু বেশেই দৌড়াচ্ছে। বাসি ফুলগুলো শুধু রয়ে গেছে জঙ্গলে।
কমলিকা ফিরে গেছে রামনিধির স্কুলে। যে তার ছোটোবেলার বন্ধু ছিল, তাকে গান শেখাতো।
No comments:
Post a Comment