হরেনবাবু জঙ্গলে যাবেন। যদিও বা বৈরাগ্যটা গলার কাছে এসে আটকেছিল, কিন্তু চারদিকে এই এত দুর্নীতি আর আকাশ ছোঁয়া জিনিসের দাম- এই দুটোই হরেনবাবুকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিল। কিন্তু কোন জঙ্গল যাবেন? মহাশ্বেতার না, বুদ্ধদেব বসুর? মাওবাদীর না, বাল্মীকির? মনটা অশান্ত, কিছুই স্থির করতে পারছেন না। তা হবে না? জীবনে কিছুই স্থির নেই, জীবন জটিল, এ সব তো জানতেনই। কিন্তু সততা? সেটা এমন মিউজিয়ামের জিনিস হবে?
ঈশ্বরে
কোনোদিনই বিশ্বাস নেই হরেনবাবুর। অনেক গুরু-বাবাজী দেখেছেন, কিন্তু মনে সাড়া পাননি। আজ মনে হচ্ছে একটু নির্জনতা দরকার। রামকৃষ্ণদেব
বলতেন সবাইকে একটু নির্জনে গিয়ে ঈশ্বর চিন্তা করতে। তা ভালো। সংসারে বসে হাজার
একটা দুশ্চিন্তায় আয়ুক্ষয়ের চাইতে নির্জনে গিয়ে কিছু কাব্যিক কল্পনা অনেক
স্বাস্থ্যকর।
কিন্তু
জঙ্গল ঠিক করতে পারছেন না। কোন জঙ্গল, সুন্দরবন না সিমলিপাল?
আজকাল তো জঙ্গলগুলোকে ন্যাশেনাল পার্ক-টার্ক করে একাকার করেছে।
মানুষ যায় কোথায়? মানুষ কি শেষে মানুষেরই চাপে মারা যাবে?
হরেনবাবু
হরিদ্বার যাবেন ঠিক করলেন। সেখান থেকে কোনো একটা জঙ্গল ঠিক করে নেবেন।
হাত পা ছাড়া
মানুষ। গোছগাছ সারা। আগামীকাল ট্রেন। হঠাৎ দারুণ পেটের গোলমাল শুরু হল। এই গেলেন, আবার মোচড়। আবার গেলেন। তারপর আবার গেলেন। তারপর আবার!
পরেরদিন
হাওড়া স্টেশান দূর, পায়খানা অবধি যেতে পারছেন না এত দুর্বল।
পাড়ার একটা নার্সিংহোমে কোনোরকমে নিজেকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করলেন। স্যালাইন চালু হল।
ডাক্তার এসে গম্ভীর মুখে বলে গেলেন, কড়া ইনফেকশন হয়েছে। এক
হপ্তা থাকতেই হবে।
হবে, আর কি করা যাবে। আপাতত জঙ্গল স্থগিত। প্রথম দুটোদিন তো প্রায় ঘুমিয়েই
কাটালেন হরেনবাবু। তারপরের দিন বসে বসে পেপার পড়ছেন, হঠাৎ
কেবিনে একজন বেঁটে মানুষ ঢুকলো। ঢুকেই বলল, জঙ্গলে যাবেন?
হরেনবাবু
বললেন, হ্যাঁ, আপনি?
সে বলল, আমার নাম যতি। আমি নানা ধরণের সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করি। মানে গোপনে
করি। যে যেটা খুঁজছে, তা নজরে রাখি। সেটা না পেলে তা পাওয়ার
ব্যবস্থা করি। আপনি পেয়েছিলেন। আপনার ট্রেনও ছিল দুদিন আগে। কিন্তু এই পেটের
কারণে...
লোকটা, মানে যতি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। হরেনবাবু বেডের থেকে মাথাটা ঝুঁকিয়ে
নীচু হয়ে শুনছেন।
যতি বলল, আপনি ফ্রাস্ট্রেটেড। তাই জঙ্গলে যাচ্ছেন শান্তি খুঁজতে। কিন্তু সেটা স্যার
পুরোনো মডেল। অনেক রিস্ক ফ্যাক্টর তো আছেই। নানা সংক্রমণের আশঙ্কা, পশুর আক্রমণ ইত্যাদি। তার চাইতে আপনি আমাদের কোর্সটা করুন।
হরেনবাবু
তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ওই শ্বাসপ্রশ্বাস… প্রাণায়াম
না কি.. ফুসফুস নিয়ে ছেলেখেলা আমি করব না কিন্তু… যত্তসব
ভাঁওতাবাজি।
যতি বলল, ধুর মশায়, এটা তো শ্বাস চিরকালের জন্য বন্ধ করে
দেওয়ার উপায়। শ্বাস বন্ধ। হার্ট স্টপ। ব্রেন স্টপ। তারপর আপনার নিউরোন থেকে দশ
মিনিটের মধ্যে ডেটা ট্রান্সফার করে নিতে হবে। তারপর আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স
দিয়ে আপনার একটা ইগো বানাতে হবে। ব্যস। এরপর কোন ডেটা রাখা হবে আর কোনটা ডিলিট হবে
সেটা AI ঠিক করে দেবে। মানে artificial intelligence আর কি।
কি করে? হরেনবাবু বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
যতি বলল, সোজা স্যার। আপনার সিস্টেমে একটা হিট সেন্সর লাগানো থাকবে। যে ডেটা আপনার
মধ্যে বেশি হিট তৈরি করবে সেটা আপনার পক্ষে স্ট্রেসফুল। সেটা সঙ্গে সঙ্গে ট্র্যাশবিনে পাঠানো হবে। সাড়ে তিন মাস থাকবে। যদি দেখা যায় আপনার সিস্টেমে
কোনো এরর শো করাচ্ছে, তবে আবার ওকে আপডেটেড করে নিয়ে আসা
হবে। যাতে কম হিট জেনারেট হয়। অনেকের ক্ষেত্রেই করা হয়েছে এটা। সাকসেস রেট
প্রায় ৯২%।
হরেনবাবু
চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, এর চার্জ কত?
যতি পকেট
থেকে একটা রুমাল বার করল। চেয়ারের উপর বসে বেডের উপর রুমালটা পাততেই সেটা একটা
ল্যাপটপ হয়ে গেল। কিসব করতে করতে যতি বলল, স্যার, সোজা কাজ। আপনি আমাদের গ্রীন জোনে পড়ছেন। মানে আপনি সারা জীবন কাউকে তেমন
একটা কষ্ট দেননি। তাই আপনার সিস্টেমে কমপ্লেক্স ফাইল তেমন একটা নেই। আমাদের
সার্ভারে বেশি চাপ পড়বে না। আপনি শুধু আপনার কয়েকটা হ্যাপি ফিলিংস আর মোমেন্টস
আমাদের সঙ্গে শেয়ার করবেন। মানে আপনাকে তার পেটেন্ট ছেড়ে দিতে হবে স্যার। আমরা
ওগুলো স্টোর করে একটা পজিটিভ ভাইব পুল বানাচ্ছি স্যার। সেখান থেকে পুরো জগতের
সিস্টেমটা আবার ফরম্যাট করার কথা হচ্ছে। আপনাদের মত মানুষেরা এগিয়ে এসে যদি
আপনাদের মহামূল্যবান ডেটাগুলো আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেন তবে খুব ভালো হয়। আসলে
আমরা জেনুইন হ্যাপি আর পজিটিভ ডেটা প্রায় পাচ্ছি না স্যার। সব করাপ্টেড ফাইল
বেরোচ্ছে।
হরেনবাবুর
ভালো লাগল। এমনিতেই জগতের উপর আর কিছু আশার আলো নেই। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, ধর্ম থেকে গবেষণা সব দুর্নীতিতে সংক্রমিত। কোনো আশা নেই আশু। তাই রাজি
হয়ে গেলেন। ওনার কোড নাম্বার হল এইচ ২০০০৭। নিকনেম দেওয়া হল হরেনডোম। যতি একটা
ক্যাপসুল বার করল। বলল খেয়ে নিন। আমরা কাজ শুরু করে দিই।
হরেনবাবু
খেয়ে নিলেন। একটা নীল আলো মুহূর্তে ওকে ঘিরে ধরল। চারদিক গোলগোল ঘুরতে শুরু করল
সব। অনেক মুখ এসে এসে ফিরে যাচ্ছে। হঠাৎ সেই আলোর মধ্যে বাবা মা এসে দাঁড়ালো। মা
এসে হরেনের হাতটা চেপে ধরে বলল, আমি খুব খুশি। এরকম একটা কাজ করে
তুমি আমাদের গর্বিত করেছ।
হরেন কি
একটা বলতে যাচ্ছিল মাকে। কিন্তু তার ল্যাঙ্গুয়েজ এই সিস্টেমে সাপোর্ট করল না।
সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেম দেখালো নতুন ল্যাঙ্গুয়েজ কোড ডাউনলোড হচ্ছে। আর চার মিনিট
লাগবে। হরেনের কাছে এই চার মিনিট আরেকটা অনুভূতি নিয়ে এলো। তার মা তার হাতটা ধরে
দাঁড়িয়ে। সে নতুন ভাষা শিখছে। আর কিছুক্ষণ। যেন তার আবার নতুন জন্ম হচ্ছে। ভাষা
ছাড়া ভাষা যেমন সেদিনও মা-ই আগে বুঝত, আজও মা-ই বুঝছে।
আনন্দে চোখে জল চলে এলো হরেনের। সঙ্গে সঙ্গে কানের পাশে একটা সুর বেজে উঠল। নীল
আলোটা জ্যোৎস্নার মত ঘিরে ধরল আরো কাছে এসে তার। হরেন দেখল সে মিহি সুতোর মত
মিলিয়ে যাচ্ছে কোথায়। মিলিয়ে যাওয়া মানে কি হারিয়ে যাওয়া? না তো। তার মাথায় আবার সব সুস্থ চিন্তারা দানা বাঁধতে শুরু করেছে। হরেনের
ইচ্ছা হল আবার মাঠে যায়। ঘাসে শুয়ে থাকে। আকাশ দেখে। কিন্তু সে সব কি আর পাবে সে?
সিস্টেমকে জিজ্ঞাসা করল। সিস্টেম বলল, পাবে।
অপেক্ষা করতে হবে। আগে সবটা ফরম্যাট হোক, তারপর।
No comments:
Post a Comment