ভোলুর জন্ম
এই কলকাতা শহরেই। শহুরে আদবকায়দা, ভাষা, এমনকি
ইঙ্গিতটিঙ্গিতও বুঝতে পারে। বাঙালি উৎসব পুজোপার্বণও মোটামুটি মুখস্থ ভোলুর। ভোলু
জন্মালো যখন, সাদা ধবধবে গা, ছোট্টো
একটা লেজ, চারটে বাঁকা বাঁকা পা, অনেকেই
কোলে তুলে নিয়ে আদর করত ভোলুকে। সেই ছোটো বয়সেই মণ্ডল পরিবারের বড়ছেলের চোখে পড়ে
গেল ভোলু। ভোলু পরিবার পেল।
======
ভোলুর
পরিবারের মালিক মুদির দোকান চালায়। তার দুই ছেলে খগেন আর নরেন। আর মালকিন, দয়ামায়াদেবী। ভোলুর আদর যত্নের কোথাও কোনো ত্রুটি ছিল না। বাড়ির মালিক আর
ছোটোছেলে মাঝে মাঝেই মিছিলে যেত, মিটিং-এ যেত। কয়েকবার ভোলুও
গেছে তাদের সঙ্গে। তাদের মুখে 'লাল সেলাম' শব্দটা অনেকবার শুনেছে। মাঝে মাঝে বাড়ি এসে প্র্যাকটিসও করেছে একা একা।
প্রায়ই শুনেছে বাবা ছেলে বলছে তাদের সরকার নাকি আর থাকবে না। ঘাসফুল চলে আসছে।
ভোলু বাড়ির সামনে ছোট্টো উঠানে ঘাসফুল খুঁজে বেড়ায়। প্রথম প্রথম পেত না, কিন্তু এক বছরে বাড়ির সামনের উঠানে ঘাসফুল ছেয়ে গেল। পাড়ায় পাড়ায় মাইক
লাগিয়ে গান হল। রাস্তায় সবাই সবুজ আবীর নিয়ে রঙ খেলল। ভোলুর গায়েও মাখালো কেউ কেউ।
======
ভোলুর খাতির
বেশি ছিল মালকিনের সঙ্গে। নানারকমের পদ রান্না হলে ভোলুর কপালে জুটত। ভোলুর চেহারা
দেখে পাড়ার অন্য দেশীয় সারমেয়রা রীতিমত হিংসা করত। পাড়ার দু-একটা সারমেয় কুমারীর
ভোলুর দিকে নজরও পড়েছিল। ভোলু পাত্তা দেয়নি। কারণ ভোলুর মালকিন রোজ রাতে কথামৃত
পড়ত, ছোটোছেলে বিবেকানন্দ পড়ত। ভোলুর প্রাণে অল্প অল্প করে একটা
বৈরাগ্যের সুর বেজে উঠত। মাঝরাতে ছাদে গিয়ে দাঁড়াত। কিন্তু কিভাবে ঈশ্বরকে কল্পনা
করবে ভেবে পেত না। কারণ এদের সব ঈশ্বরই মানুষের মত হাত-পা নিয়ে ছবিতে দাঁড়িয়ে বা
বসে। তার মতো করে কি ঈশ্বর কোনোদিন আসেননি? ভোলু শুনেছে তিনি
শূকর হয়ে এসেছেন, তিনি গাভীর প্রতিও দরদী শুনেছেন। কিন্তু
সারমেয়? ভোলু ছাদে উঠে রাতের আকাশের দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে
থাকে। ছোটো ছেলে তাকে কোলের কাছে নিয়ে লুব্ধককে চেনায়। লুব্ধক তাকে দেখে লেজ নাড়ে।
ভোলুর প্রাণে একটা আস্থা জাগে। ছাদের আরেক কোণে বড়ছেলে আর বাবা বসে বিপ্লবের কথা
বলে। বলতে বলতে পায়চারি করে। আবেগের সঙ্গে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে। ভোলু আবার
লুব্ধকের দিকে তাকায়। ঘুমিয়ে পড়ে।
======
বড়ছেলে বড়
চাকরি পেল। বেশ বড়। আইটিতে। প্রচুর টাকা মাইনে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সবাই বড়
ফ্ল্যাটে চলে গেল। ছোটো ছেলেও বড় চাকরি পেল সরকারি। দুটো ফ্ল্যাট আলাদা হল। সমস্যা
হল ভোলুকে নিয়ে। ভোলুর মত নেড়ি দেশীয় সারমেয়কে আর কি করে রাখা যায়? একদিন বড় গাড়ি করে দুই ফ্ল্যাটে দুটো বিদেশী সারমেয় ঢুকল। ভোলুর পিছনে
লাথি পড়ল। ভোলু এক রাত্তিরে এসে রাস্তায় দাঁড়ালো।
এরকম একটা
কিছু হবে ভোলু বুঝতে পারছিল। মা ঠাকুরন আজকাল কথামৃত পড়েন না। দারুণ মার্বেল দিয়ে
ঠাকুরঘর বানিয়েছেন, তারই সাজগোজ করতে ব্যস্ত থাকেন। ঠাকুরের
জন্য রোজ নিত্য পোশাক আসে। মায়ের জন্য গয়না আসে। সোনার থালা, প্রদীপ এলো। ভোলু সারাবাড়ি কথামৃত খুঁজে বেড়ায়। দেখে আলমারির এত উপরে যে
পাওয়া ভার।
======
ভোলুর জন্য
কেউ কাঁদল না। সবাই ভোলুকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে বড় গাড়ি করে মঠে গেল, আজ ঠাকুরের জন্ম উৎসব। ভোলু কাঁদল না। ভোলু কারোর কান্নার অপেক্ষাও করল
না।
রাস্তায় এসে
কয়েকদিন অন্যান্য রাস্তার সারমেয়দের ব্যঙ্গবিদ্রুপ সামলাতে হল। ভোলু কাউকে কিছু
বলত না। সমস্যা হত খাওয়া নিয়ে। রাস্তার এইসব খাওয়া অভ্যাস নেই। পেট ব্যথা হত।
বমি-পায়খানা হয়ে যেত। ধীরে ধীরে সব অভ্যাস হয়ে গেল।
বহু বছর
পেরিয়ে গেল। আগে আগে ভোলু মালিকদের ফ্ল্যাটদুটোর দিকে আসা যাওয়া করত। আগে আগে ওরা
তাকাতও। তারপর তাকালেও চিনতে পারত না। এতটা ভোলু নিতে পারত না। তাই এখন সে রাতদিন
হেঁটে বেড়ায়। ভোলুর আশেপাশের অনেক সারমেয় মারা গেল। আর সারমেয়, কি ভয়ংকর মহামারী দেখে তাজ্জব হয়ে গেল ভোলু। কত কত মানুষ মারা গেল। তার
মালকিন আর মালিকও মারা গেছে খবর পেল। ভোলু লুব্ধকের কাছে তাদের জন্য প্রার্থনাও
করল। কিন্তু সে বুঝল তার আয়ু এত তাড়াতাড়ি ফুরাবার নয়। তার বয়েস বাড়ছে, কিন্তু বুড়ো হচ্ছে না।
======
ভোলু কলকাতা
আর তার আশেপাশের শহরগুলো হেঁটে বেড়ায়। কখনও লোকাল ট্রেনেও চড়ে। হাওড়া, শিয়ালদা যায়। মাসে একবার করে দক্ষিণেশ্বরের দিকে যায়। ইচ্ছা আছে ওদিকেই
থেকে যাওয়ার। ইদানীং ভোলু লুব্ধকের ভাষা বুঝতে পারে। ওই একমাত্র সঙ্গী ভোলুর। যার
সঙ্গে দুটো কথা বলে। লুব্ধক সব কিছু অনেক দূর থেকে আর অনেক উপর থেকে দেখে বলে অনেক
গভীর জ্ঞান লুব্ধকের। তাছাড়া কালপুরুষের সঙ্গেও নাকি অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়
তার। ভোলু বালি ব্রীজের উপর বসে বসে লুব্ধকের সঙ্গে কথা বলে।
ক'দিন আগে ভোলু হাওড়া গিয়ে ফিরে এলো। ট্রেনের গোলমাল। কোথায় কি গোলমাল হচ্ছে,
রাস্তা বন্ধ। রাম, হনুমান শব্দ নিয়ে প্রচুর
কথা হচ্ছে। এইসব কথা কথামৃতে শুনেছে ভোলু। কিন্তু সেখানে কোথাও গোলমালের কথা
শোনেনি। রামনাম শুনতে শুনতে ঠাকুর সমাধিস্থ হয়েছেন, চোখের
কোণে জল এসেছে, এসব শুনেছে ভোলু। কিছুটা অনুভব করতে চেষ্টাও
করেছে, কিন্তু মনে তো অশান্তি হয়নি কোনো?
======
লুব্ধক বলল, সব বদলে যাচ্ছে ভাই। যুগে যুগে এমন হয়েছে।
ভোলু বলল, তাই দেখছি দাদা। এই এত এত সাধু, এত এত মঠ, মিশন, আশ্রম, এত এত সম্প্রদায়,
অথচ দেখো সারা বাংলার মানুষের উপর প্রভাব আছে এমন কেউ নেই। সবার আলো
ছোটো প্রদীপের আলোর মত। ঝড়ে বেরোতে ভয়, পাছে নিভে যায়। মা
ঠাকুরনের কথামৃত পাঠে শুনেছি, সবাই যাকে মানে গণে তার মধ্যে
ঈশ্বরের শক্তি আছে… তবে কি কেউ নেই? ঠাণ্ডা
ঘরে, চেয়ারে বসে বসে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
সুক্ষ্ম বুদ্ধিচর্চার অনেক সাধু দেখি, রাস্তায় নেমে মানুষকে
সুপথে আনার তো কাউকে দেখি না। কেন গো? জোর নেই, না বিশ্বাস নেই, না রোক নেই?
লুব্ধক বলল, সময়ের গতি বোঝা বড় দায় ভাই। কুন্তী বলেছিলেন না মহাভারতে, আমার ছেলেদের শৌর্য, বীর্য, বিদ্যা…
কি নেই। তবু দেখো তারা জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই হল সময়ের
গতি ভায়া। তত্ত্ব বইয়ের পাতায় কালো অক্ষর, কাজ করে মানুষের
শক্তি। তেমন শক্তি, তেমন আলো কি সব যুগে আসে? আসে না। ছোটো ছোটো প্রদীপ, নিজেকে রক্ষা করতেই জীবন
যায়, যুক্তি সাজায়, বড় কাজে জ্বলার
মশাল চাইলেই কি আসে?
ভোলু গঙ্গার
দিকে তাকালো। উদাস হল। বাড়ির মালিকের বড়ছেলের কথা মনে পড়ল, দুই ভাইতে একবার বেজায় ঝগড়া লেগেছিল। বড় ভাই বলছিল, আরে
ভায়া সেকুলার হতে অনেক পড়াশোনা লাগে, তোদের মত মানুষের সে
কম্ম নয়। তার ভাই গর্জে উঠে বলেছিল, ধর্মের ইতিহাস, দর্শন বুঝতেও অনেক পড়াশোনা লাগে…
ভোলু
ভেবেছিল সেকুলার মানে আরেক ধর্ম হয় তো। পরে জানল তা নয়।
লুব্ধক বলল, কথাটা মানা, না মানা নয় ভায়া, কথাটা কতটা গভীরে দেখি, কি দেখি না। পড়াশোনা যে কোনো
বৃত্তকেই বৃহৎ করে। কিন্তু উদার হতে পড়াশোনার চাইতে বোধবুদ্ধি লাগে বেশি। সে
অহংকারীর বোধের বাইরে।
======
ভোলু
বাংলায় নতুন নতুন পুজো দেখছে। কেউ কেউ বলে বাঙালি হুজুগে জাতি, তাই যখনই যেটা পায় সেটা নিয়েই মেতে যায়। ভোলু জানে দুই বাংলা ভাগ হয়েছে
ধর্মের উপর ভিত্তি করে। বাংলার মাটি দাঙ্গার রক্তে ভিজেছে। তাতে মানুষের কি লাভ
হয়েছে বুঝতে পারে না ভোলু। অবশ্য মানুষই বুঝতে পারে না, তো
সে আর কি করে বুঝবে।
বাঙালি এখন
ছটপুজো করে, ধনতেরাস করে, গণেশ
পুজো করে, রামনবমী করে, হনুমান পুজো
করে। এ অবশ্যই আশ্চর্যের কিছু না। বাঙালি এককালে পশ্চিমি হতে গিয়েছিল। হলিউডিও হতে
চেয়েছিল। এখন বাঙালি বলিউডি হতে চাইছে। সেদিন ইংরেজি ফরাসী ছিল, এখন নানাবিধ হিন্দি বলছে। ইয়ার্কি করে একদিন বাঙাল বলত, এখন ভোজপুরি, দেহাতি বলছে। মানে বলতে চাইছে। আজও
অনেক বাঙালি চৈতন্য, হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মদিনে শুভেচ্ছা
জানায় না, বৈপ্লবিক মানবতার মুখ দেখে না, যা খ্রীষ্টের জন্মদিন, গুড ফ্রাইডেতেই দেখে, শুভেচ্ছা জানায়।
ভোলু
আহেরিটোলা থেকে বেহালা, রাণাঘাট থেকে গোঘাট, সুন্দরবন
থেকে দার্জিলিং ঘুরে ঘুরে অনেক বাঙালি দেখেছে। সব বাঙালি সব বাঙালিকে বাঙালি বলে,
কিন্তু প্রাণে স্বীকার করে না। কলকাতা থেকে একটা বৃত্ত আঁকলে কয়েক
কিলোমিটারের বাইরেই ওরা কারা? হইহই করে সবাই সুন্দরবনে যায়,
পশুপাখির শান্তিভঙ্গ করে, পুরুলিয়া যায়,
পলাশ তোলে, নাচে, দার্জিলিং
যায়, কফি-চা খায়, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে
হাপিত্যেশ করে। সবাইকে বলে, এরা কি সরল, এরা কি সুন্দর, মন চায় “এদের”
সঙ্গেই থেকে যাই… এই সব বলে সব লণ্ডভণ্ড তছনছ
করে চলে আসে। মোবাইলের ক্যামেরা হৃদয়ের থেকে বেশিবার স্পন্দিত হতে থাকে ক্ষণে
ক্ষণে। ওদিকেও পাঁকের গন্ধ জন্মাতে শুরু করে। ভোলু গন্ধ পায়। ভোলু বোঝে মাঝে মাঝে
চিড় জন্মিয়ে আছে। অদৃশ্য পাঁচিল আছে। কৌতুহল আছে, আহারে-বাহারে
আছে, কিন্তু প্রাণের যোগাযোগ নেই। লুব্ধক বলে, বাঙালি রাবীন্দ্রিক হয়েছে, ভদ্রলোক হয়েছে, পণ্ডিত হয়েছে কিন্তু উদার হয়নি। কার্মাটাড়ে আর রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রে
তার আভাস আছে, আর গোটা বাংলায় গ্রামেগঞ্জে তার উদাহরণ আছে।
======
ভোলুর মাথায়
ঘা হয়েছে। ভোলু বেশ বুঝতে পারছে চারদিকে মাকড়সার জাল তৈরি হচ্ছে। জালের উপর নানা
নক্সা আঁকা হচ্ছে। এক একটা জালে এক এক দল আটকে পড়ে যাচ্ছে। ভোলুর শরীরে জোর কমে
এসেছে। আজকাল হাঁটতে চলতে গেলে পায়ে, গায়ে, তুণ্ডে, কানে, চোখে জাল আটকিয়ে
যাচ্ছে। প্রচুর কথা হচ্ছে। কিন্তু কেউ জালের কথা বলছে না। জালের কথা বললেও জাল
কাটার শক্তি বা সাহস কোনোটাই দেখাচ্ছে না।
লুব্ধক বলে, কালের চক্রে এমন এক-একটা করে জাল আবৃত সময় আসে। তখন পণ্ডিতে, তর্কে, হইহট্টগোলে চারদিক ছেয়ে যায়, কিন্তু উদার, অনুভবী, দরদী
একটা প্রাণের অভাব ক্রমশ প্রকট হতে থাকে। সবাই ভাবে বেড়ালের গলায় কেউ না কেউ ঘন্টা
বাঁধবে। আর সবাই দুধ আনবে, ভেবে সবাই জল আনে, দুধপুকুর জলপুকুর হয়ে যায়। সত্যের চাইতে জল্পনা বেড়ে যায়। জালে আটকা পড়ে
ঘুমের ওষুধ চায়। চোখের জন্য ঠুলি চায়। সেও পাওয়া যায়। ঠুলি-যুক্তি, ঘুম-যুক্তি জন্মে যায়।
একদিন কেউ
আসে।
ভোলু এখন
কোথাও যায় না। শুধু বালিব্রীজের উপর পায়চারি করে। মাঝে মাঝে জলের দিকে তাকিয়ে
দেখে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে। কালপুরুষ আর লুব্ধককে বলে, আশ্চে জন্মে আমায় আর যা কোরো মানুষ কোরো না, আমায়
আবার সারমেয় কোরো।
লুব্ধক
মাঝরাতে ডেকে ওঠে, সারা আকাশে তার ডাক ছড়িয়ে পড়ে। জাগো জাগো…
কেউ বলে, বাউলের সুরে শিশির বিন্দুতে সূর্যের
আলো জ্বলে ওঠে, শুধু মানুষ জাগে না, জ্বলে
ওঠে না। ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে 'হ্যাঁ' আর 'না', 'আছে' আর 'নেই'-এর যুদ্ধ ফেঁদে ভাবে জিতে যাচ্ছে। হৃদয়ে কান
পাতে না। আলো আসে না। সুর ওঠে না।
ভোলু
লুব্ধকের দিকে মুখ তুলে বসে থাকে। গঙ্গা বয়ে যায়। সময় বয়ে যায়।
No comments:
Post a Comment