১
====
আমার গল্পটা ঠিক সেরকম না। আমি গল্পটা জানি। আবার জানিও না। যেমন ধরো আমি।
আমার মতামত। আমার ইচ্ছা। আমার রাগ। এরা কি আমি পুরোটা? না।
আবার এরাও আমি। এরা আসে আবার চলে যায়। আবার আসে। মানে একটা আবর্ত চলে। আবর্ত কাকে
কেন্দ্র করে ঘোরে? জানি না। জানার দরকার কি আছে? যেমন বুধ বা মঙ্গল থেকে পৃথিবীর কতটা দূরত্ব জেনে আমার কি হয়েছে? কয়েকটা পরীক্ষা পাস দিয়েছি। ব্যস। হ্যাঁ, আমি যদি
ভূগোলের মাস্টার হতুম কিম্বা ধরো খুব বড় একজন বিজ্ঞানী, তবে
তো রাতদিন ওইসব ভাবতুম। কেন ভাবতুম? কেন না ওগুলো আমার
জীবিকা যে? জীবিকা মানে কি? উপার্জনের
সমাজ অনুমদিত ব্যবস্থা। যেমন ধরো চোর। যদিও চুরি তার জীবিকা। কিন্তু দিনের বেলায়
ভেলুদার দোকানে বসে যখন সে দুকিলো চিনি, দশ কেজি চাল,
গায়ে মাখার সাবান ইত্যাদি কেনে, তখন যদি কেউ
জিজ্ঞাসা করে, ও দাদা আপনি কি করেন? সে
কি দন্তপাটি বিকশিত করে নোটের টেকোবুড়োর মত সত্যবাদী হয়ে বলবে, ইয়ে কত্তা চুরি করি? কখনও বলবে না। সে কি বলবে?
বলবে, এই তো মিস্তিরির কাজ করি, কিম্বা কলকাতার মিলে কাজ করি, কিম্বা বলবে সে মেলা
কাজ আপনি বুঝবেন না। অথচ তার মাথার মধ্যের সব কটা নিউরোন আসল কথাটা জানে। টাকার
উপর যার ছবি, তার কথা সে যতই অমান্য করুক, সেই টাকায় বিড়ি থেকে মাসকাবারি সব হল। উফ কোথাকার কথা কোথায় এনে ফেললাম
বলুন দিকিনি। এই জন্যেই আমি দার্শনিক কথা বেশিক্ষণ বলতে পারি না। কোত্থেকে গল্প
বলার নেশা জুটে যায়। দাঁড়ান, আমি একটু গায়ে হাওয়া লাগিয়ে এসে
আগের কথার খেই ধরে আবার বলছি। যাবেন না কিন্তু, মাইরি দিয়ে
গেলাম।
২
===
কি যেন বলতে বলতে উঠে গেলাম, হ্যাঁ, জীবিকা। যদিও কথাটা একটা দার্শনিক কথা দিয়ে শুরু হয়েছিল, সে হোক গে। আমি যদি অন্য কথা বলি তোমরা কিছু মনে করবে? আচ্ছা ভণিতা ছাড়ি। তোমরা যদি সাহিত্য সমালোচক হয়ে থাকো তবে বাপু এসব পড়তে
যেও না, মুখ ভর্তি মাটি হবে। কয়েকটা কেঁচোও যেতে পারে মুখে।
তখন আমায় গাল পাড়বে। তা পেড়ো, ও সব শোনা আমার ঢের অভ্যাস
আছে।
মানুষ কেন একপেশে হয় না বলো তো? কারণ মানুষ আসলে
নদী। দেখোনি হঠাৎ করে বান চলে এলো, তুমি হয়ত বেশ নদীর ঠাণ্ডা
জলে পা ডুবিয়ে আমেজ করে একটা বিড়ি খাচ্ছিলে ( বিড়ি খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে খারাপ,
ক্যান্সার হয়, টাটায় যেতে হয় পয়সা থাকলে,
নইলে চিত্তরঞ্জন বা ঠাকুরপুকুর...আসলে আজকাল সিনেমায় এসব লেখে তো,
তাই ভাবলাম কোনো সিনেমার মানুষ যদি এ লেখা পড়ে তো খারাপ ভাববে না,
তাই লিখে রাখলুম আর কি), হঠাৎ করে দৌড় দৌড় দৌড়,
কেন? না বান আসছে। ওভাবে মানুষের মধ্যেও বান
আসে। নদীর মত মানুষও শুকিয়ে যায়। তার শুকনো পাড়ে আগাছার মত স্বপ্নগুলোও মরে পড়ে
থাকে। আমি নিজের চোখে দেখেছি। কি করে? একটা গল্প বলব?
বানানো গল্প না কিন্তু। একজন মেয়ে ছিল। যদি বলো মেয়ে বললেই তো হয় না,
কেমন দেখতে, কি ঘর, তার
বাপের আয় কত, এসবও তো বলতে হয়। আমি বলছি। মেয়েটাকে দেখতে
ভালো নয়, মানে কালো, লম্বা রোগা। যেমন
টিভিতে সিনেমায় দেখা যায় অমন নয় গো। ওই কল পাড়ে, মুদির
দোকানে দুপুরে একটা ওড়না মাথায় দিয়ে, লোকাল ট্রেনের স্টেশানে
কম দামি চটি পায়ে, অপুষ্ট শরীরে অপরাধী মুখ করে যে মেয়েগুলো
দাঁড়িয়ে থাকে তাদের মত মেয়েটা। ওর বাবা নেই। মা ছিল, কিন্তু
মাথায় ছিট। মেয়েটার দাদা ছিল দুটো। কি হারামজাদা সে দুটো দাদা কি বলব আপনাদের,
নিজের বোনটাকে নষ্ট করল, বিয়ে দিল না! এদিকে
নিজেরা বিয়ে করে ঘর সংসার করলি, মেয়েটার তো সব্বনাশ করলিই,
তা বিয়েটা দিতে তোদের কিসে বাধছিল? দিল না।
এখন দেখি মেয়েটা একটা ভাঙা কেয়া গাছের মত এই স্বার্থপর সংসারের স্রোতের পাশে
রাতদিন দাঁড়িয়ে থাকে। তার ঠেসমূলগুলো এতই আলগা যে একটু হাওয়াতেই দুলে প্রায় মাটি
ছুঁয়ে যায়। কত মানুষ দুলিয়ে গেল, মাটিতে মুখ থুবড়ে দিল। তার
পেটে খিদে নেই, কিন্তু চোখগুলো যেন জ্বলছে। তা জ্বলবে না?
আরে শরীরটার সাথে নছল্লা করলি, কিন্তু আত্মা
নেই? তার কি হবে? আত্মার তো আর মরণের
ভয় নেই, সে তো ভগবানের জ্যোতি, এসব আমি
শাস্ত্রে পড়ে জেনেছি, তার কি হবে? তাই
জ্বলে। তার মধ্যের জীবন নদীটা শুকিয়ে মরে পড়ে আছে, আর শ্বাস
নিলেই যদি জীবন হত তবে তো পশু আর মানুষে কিছু পার্থক্যই হত না। মানুষ বাঁচে সখে,
সখ মিটলে সুখ। আত্মা সূর্যটার যত জ্বালা, সে
না পারে নীচে নামতে, না পারে জীবনটাকে নিজের মধ্যে নিতে।
৩
===
আমি না বলেই উঠে গিয়েছিলাম। মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আচ্ছা মানুষে মানুষে
গিঁট বেধে যায় দেখেছ? একটা মানুষের চাকে আরেকটা মানুষ এসে
মধু খেয়ে যায় দেখেছ? আমি দেখেছি। তোমরাও দেখেছ। এই নিয়ে কত
গল্প লেখা হল। কত দার্শনিক কত তত্ত্বকথা আওড়ালেন। আমি সেই নিয়ে আর কিছু বলছি না
আপাতত। মানুষের কথা মানুষ হয়ে কি করে উপসংহার টানা যায়। তবে গল্প তো বলাই যায়।
আচ্ছা নিজের কথা বলা কি খারাপ? খারাপ কেন হবে? তবে নিজেকে যদ্দিন না সবাই মনে হয় তদ্দিন নিজের কথা বলে লাভ নেই। ঝুড়ি
ঝুড়ি মিথ্যাকথার পাহাড় জমবে। সব সময় হয় বাড়িয়ে নয় কমিয়ে বলতে চাইব। আর এ তো জানোই
অর্ধসত্য মিথ্যার চাইতেও ভয়ংকর। কিরকম? একটা গল্প বলে আজকের
মত আসি বুঝলে।
একটা মানুষ নিজেকে খুব সোন্দর মনে করত। খুব গুণী মনে করত। তা মিথ্যা বলব
না বাপু, দেখতে শুনতে খুব ভালো না হলেও ছেলেটার গুণের কম ছিল
না। কলেজে পড়তে প্রেম করল। বিয়ে করল। এমন একটা বাড়িতে বিয়ে করল যে সেই মেয়েটার
দাদার বউয়ের সাথে তার প্রেম হয়ে গেল। কি অবস্থা বুঝতে পারছ। আমায় এসে বলল, আমি কি অন্যায় করছি? আমার শুনে এমন রাগ হল, দিলুম কয়েকটা বেধড়ক খারাপ গালাগাল পেড়ে। সে দমে গেল না, আমায় এড়িয়ে গেল। তারপর অনেকদিন বাদে আমার সাথে রেলস্টেশানে দেখা। কি
চোখমুখ হয়েছে তার! মনে হচ্ছে যেন আমার কাকাবাবু। কিছু বললাম না, মনে মনে ভাবলাম, বেশ হয়েছে, পা
এবার পাপের শাস্তি। তা ধম্মের কল বাতাসে নড়ে এ আমাদের বেদে লেখা তো আছেই। নেই?
আছে আলবাত আছে, ওই যে গো যে পাতায় অণু-পরমাণুর
তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা আছে না? আরে যা পড়ে রাদারফোড অণু
আবিষ্কার করল গো, তার আগের দশটা পাতা ছেড়ে পড়লেই পাবে। তা
আমি আর সে একটা খাবার দোকানে ঢুকলাম। আমার তো বেশ লাগছে। শুনব তার সিরিয়ালমার্কা
গল্প। তবে যা শুনলাম তাতে আমার চক্ষু চড়কগাছ।
তার দুইমুখী প্রেম বেশ চলছিল। তারপর জানাজানি হয়ে যায়। দুইপক্ষেরই
ডিভোর্স হয়ে যায়। এখন সে নাকি ওই বউদির সাথেই থাকে, মানে
আরকি তার বউ এখন সে। আর তার আগের বউ কলেজে মাস্টারি করে। ওর দাদা আর বোন কেউই আর
বিয়ে করেনি। কিন্তু এরা দুজন খুব সুখে আছে। ছেলে হয়েছে। আগের পক্ষের মেয়েটাও ভালো
আছে। তারা সবাই মিলে ওবাড়ি বেড়াতেও যায়। কারোর কিছুই মনে হয় না তাতে। আমার মুখের
কচুরীগুলো পুরো পচা লুচির মত বেস্বাদ ঠেকতে লাগল। ভালো করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে
দেখলাম, কই খারাপ দেখতে হয়ছে? এই তো
মুখে সর পড়ার মত মসৃণ চামড়া। হাসিটাও ঠিক রাজপুত্তুরের মত।
যাক গে, এইবার ভাবো আমার আগের গল্পের মেয়ের সাথে এই
মেয়েটার গল্প। তার নদী যেমন শুকিয়ে গেল, এর গেল বাঁক ঘুরে।
মানে যে কলেজের মাস্টারনি তার কথা বলছি। দুজনের যদি দেখা হত? একজন শূন্যের এদিকে দাঁড়িয়ে, আরেকজন ওদিকে। ভালোবাসা
তো কেউই পেলো না বলো? সত্যি বটে, মানুষে
মানুষে যে কত গিঁট কি বলি? কার সাথে কে যে কোথায় বেঁধে হোঁচট
খেয়ে পড়ে কেউ জানে না। এমনকি এত বড় বড় খনা বরাহমিহিরের ভাইপো ভাইঝিরা যে টিভিতে
গলা ফাটিয়ে মরে, এগুলোও জানে না। এসব জানে শুধু মহাদেব।
তোমরা কি ভাবছ মন্থন শেষ হয়ে গেছে? হুঁহুঁ বাবা, শাস্ত্রর অর্থ বড়ই গূঢ়। মন্থন চলছে। অমৃত আর বিষ দুই উঠছে। অমৃত কোন
পার্লামেন্টে যাচ্ছে জানি না বাবা। কিন্তু বিষ যে আমার সেই নীলকন্ঠবাবা একাই গলায়
ধরে থাকছে সে নিয়ে আমার কোনো সংশয় নেই। সামনেই চড়ক। চড়ক মানে কি জানো তো? চরকি। পিঠে গেঁথে ঘোরো, তারপর ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে পড়ে
রক্তারক্তি হয়ে বাবাকে তুষ্ট করো। হুম, আমাদের গ্রামে এসো
দেখাবো। ভক্তি কি আর অতই কোমল গো? যে ফুলে পূজো হয়, সেই ফুলেই মরণও হয়। কি নাম বলো তো সেই ফুলের – ধুতরো।
বাবার পূজোয় লাগে। এবার একবার দুহাত মাথার কাছে তুলে জয় দাও দিকিনি... জয় বাবা
নীলকণ্ঠের জয়... জয়...
আসি বুঝলে, অনেকবেলা হল... ছোটো মুখে বড় কথা বলে
ফেললাম অনেক... মাফ করবেন... আসলে আমার তুমি আপনিতে চিরটাকাল গুলিয়ে যায়... যাক গে
এসব কথা ভুলে যেও... আসি... টাটা... ও হ্যাঁ এদিকে এলে আমার সাথে একবারটি দেখা করে
যেও... আমার কোনো কাজ নেই তেমন... মানুষ দেখি খালি... টাটা...
No comments:
Post a Comment