এত আলো জ্বালা কেন?
আমি হয়রান হয়ে যাচ্ছি একটু অন্ধকারের জন্য
আমার বিশ্বাস আর আমার ধর্মের জন্য
কিছুটা জায়গা তো দাও!
আমি হয়রান হয়ে যাচ্ছি একটু অন্ধকারের জন্য
আমার বিশ্বাস আর আমার ধর্মের জন্য
কিছুটা জায়গা তো দাও!
দুটো
কথা আছে। এক, কে বলেছেন আর দুই, কি বলছেন। আমরা প্রথমটা দ্বারা
বেশি প্রভাবিত হই। আমাদের গুরু, আমাদের ধর্মগ্রন্থ, আমাদের অবতারের হায়ারার্কি, আমাদের দেশীয় আচার,
লোকাচার এরা একদিকে। অন্যদিকে আমাদের ভালোবাসার পছন্দের নেতারা। কি
বলছেন সেটা বড় কথা নয়, কে বলছেন সেটা তো দেখো!
কারণটা প্রাচীন, আমরা অথোরিটিতে বিশ্বাসী।
কেউ একজন অথোরিটি হবে আমাদের দ্বন্দ্বের, সংশয়ের, বিবেকের, ভবিষ্যতের, এমনকি
ভালোবাসার পর্যন্ত। আমাদের শেখানো হয়েছে ছোটোবেলা থেকে চিন্তা করতে নয়, ওরকমভাবে চিন্তা করতে। এই ‘ওরকম’ কথাটা অথোরিটির। অথোরিটি মানে জীবনের প্রতি অনুরাগহীনতা। অথোরিটি মানে লোভ,
ভয়, ঈর্ষা। কারোর মধ্যে যদি অনুরাগ থাকে তবে
তার সাথে তার দায়বদ্ধতাও থাকে। যেহেতু আমাদের সে অনুরাগ নেই, তাই আমাদের নিয়ম আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’
এর ভাষায় কৃষ্টি। কে বলছেন – এর বাইরে ভাবাটা
আমাদের অশ্রদ্ধা। এটা খুব একটা কঠিন সমস্যা। চিন্তার ঘূর্ণী ভেদ করে নৌকা বের করা
যে কঠিন, আর তাও যদি এত শতাব্দী পুরোনো হয়।
দুটো
কথা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের অভ্যাস করাতে শুরু করতে হবে গোড়া থেকে। এক, কোনো কিছু বলা
হয়েছে, ঘটে আসছে, কয়েকটা সুফল পাওয়া
গেছে ইত্যাদি মানেই সেটা সত্যি নয়। আর দুই, আমি যেটা অনুভব
করছি মানেই সেটা সত্যি নয়।
যা
কিছু আছে, যা কিছু মহৎ বলে স্বীকৃত, যা কিছু
প্রথা-বিশ্বাস-ঐতিহ্য ইত্যাদির নামে চলে আসছে তাকে প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি করতে
হবে। প্রশ্ন করার অভ্যাস দুই রকমে হয়। এক জন্মগত অনেকে এই স্বভাবটা নিয়ে জন্মায়।
দুই, পড়ার অভ্যাস যদি বেশি হয় তবে হয়। আমি দ্বিতীয়টাতে জোর
দেব বেশি। কারণ জন্মগত, বাড়ির পরিবেশগত ইত্যাদি বিষয়গুলোর
উপর আমার নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু পড়ার উপর আছে। একজন যখন অনেক পড়ে তখন অনেক বিরুদ্ধ
মতামত, প্রমাণ, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদির
মুখোমুখি হয়। তার মধ্যে সংশয়ের বীজ জন্মায়। এই সংশয়ই তাকে বাঁচার রাস্তা করে দেয়।
মোহ কাটে। ভ্রম মেটে। কারণ বিরুদ্ধের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করতে তাকে চিন্তা করতে
হয়, কাউকে অথোরিটি মানলে অন্য অথোরিটি তার মধ্যে দ্বন্দ্বের
সৃষ্টি করে, সে আবার নিশ্চিত সুরক্ষিত অবস্থান থেকে অজানাকে
সামনে রেখে ভাসতে আরম্ভ করে, নতুন দ্বীপের সন্ধান পায়। এ
কলম্বাসের দেশ আবিষ্কারের থেকে কম উত্তেজক নয়। অন্যের আবিষ্কৃত দেশের চাইতে নিজের
খুঁজে পাওয়া মাটিতে সে বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়। এ সবই সম্ভব হয় যদি মননশীল পাঠের
অভ্যাস তৈরি করা যায়। সিরিয়াস প্রশ্নের আঘাতে সুখ-শান্তির আপাত মধুর বিষাক্ত
জীবনযাত্রার অবসান ঘটে। নিজেকে ‘সাধারণ’ দেগে কঠিন কর্তব্যকে এড়িয়ে গা এলিয়ে ঈর্ষাবাণে আর ‘আঙুরফল
টক’ অভিঘাতে জর্জরিত হতে হয় না। হিপোক্রেসির আঁতুড়ঘর করে ফেলতে
হয় না নিজের মস্তিষ্ক আর বিবেককে। এ গেল এক জ্বালা।
দ্বিতীয়
কথাটা আরো কঠিন। আমার অনুভব সত্যের প্রমাণ নয়। সে আমার অনুভব যতই অকৃত্রিম হোক না
কেন। যতই তীব্র হোক না কেন। যতই মধুর সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্ভাবনাশীল মনে হোক না কেন।
আখেরে ওতে তরী ডুববেই। যখনই আমি কোন বাক্য শুরু করি যে “আমার মনে হয়”
বা “আমি অনুভব করি” তখনই
মনে করাতে হবে নিজেকে, অনুভব মানে সত্য নয়। সে যতবারই তা
সত্য প্রমাণিত হোক না কেন। তখন আমি জানব যে সেটা কাকতালীয়, তার
উপর নির্ভর করে জীবন চালানো মানে লটারি কেটে জীবিকা নির্বাহের সামিল। সে কারোর যদি
সারা জীবনে সব লটারি অব্যর্থ ভাবে লেগে গিয়ে থাকে তবু সে নিতান্তই চান্স। সত্য নয়।
সত্যের একমাত্র কষ্টিপাথর – যুক্তি। যুক্তি আবেগ নয়, অনুভব নয়। তা প্রমাণসাপেক্ষ, পরিমাপসাপেক্ষ, বিচারসাপেক্ষ।
আজ
সব কিছুই ‘হে ক্ষণিকের অতিথি’। আমাদের সব কিছু ভীষণ আবেগ আর
অনুভব নির্ভর। আমাদের সিনেমা, সাহিত্য মায় বিজ্ঞানের অবধি
সমালোচনা করতে, মতামত দিতে কোনো প্রাকশিক্ষার প্রয়োজন আমরা
দেখিনা। ‘আমার মনে হয়’... ব্যস...” আমার গাট ফিলিংস”... ব্যস... ইত্যাদিতে জগত
ঝালাপালা। এ এক ভয়ানক নার্সিস্টিক বা ঘন অযৌক্তিক স্ব-আসক্তির বিকার। সব কিছু এখনই
বুঝে নিতে চাই, সব অনুভব এখনই করে নিতে চাই, সব সত্যি এখনই জেনে নিতে চাই। তা হয় না। ফলে আমাদের চিরদিনের যে
চিত্তবৃত্তি সে থাকছে উপবাসী। আমাদের যে সত্যের সাধনা, আমাদের
আরো বেশি পরিচ্ছন্নতার, আরো বেশি মানবিক হয়ে ওঠার, আরো বেশি যুক্তি-নির্ভর হয়ে ওঠার সাধনা, সেও থাকছে
অবহেলায়। ভাঁড়ার ভরছে ক্ষণিকের ঘরের, মিলিয়েও যাচ্ছে
মুহূর্তেই। আবার শূন্যতার হাহাকার, আবার নতুন উন্মাদনার
খোঁজ।
নতুন যারা জীবনের দোরগোড়ায় তাদের এ দুটোর অভ্যাস করতে শেখাতে হবে।
নইলে হাতের মুঠোয় যে যন্ত্রটা এখন প্রায় প্রত্যেকের, সেই
স্মার্টফোনে তারা ভুলেই যাবে যে সেটা জীবনের একটা অসম্পূর্ণ বিকৃত ছায়ামাত্র। সেটা
জীবন নয়। জীবনের মানে চিরকালই একটা - সংগ্রাম, অ্যাচিভমেন্ট
নয়, ওটা একটা ডাঁহা মিথ্যা কথা।
No comments:
Post a Comment