ছাতার বাইরেটা বৃষ্টিতে ভিজে
যাচ্ছে। চারদিকে ঘিরে নামছে সশব্দে সোল্লাসে বৃষ্টির সহস্রধারা। ছাতাটা যে
মানুষটার মাথায়, সে ক্ষেতের এক কোণে দাঁড়িয়ে। চোখ বন্ধ।
অন্ধ। একটু পর ছাতাটা বন্ধ করে দেবে। বৃষ্টি থামার আগেই বন্ধ করে দেবে। খালি পা
দুটোর আঙুলের ফাঁক দিয়ে জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। মানুষটা মাটির ভিজে শরীরকে ছুঁয়ে
অনুভব করছে কিছু, যেন নিজেকে। যেন সে মাটি। যেন সে বৃষ্টি।
যেন সে এই ভিজে হাওয়া। খিদেটা মরে গেছে। আজ ভিক্ষাও করেনি। গান গাইতে ইচ্ছা করে
না। বৃষ্টির আওয়াজে সুর শুনছে। এই সুরটা ছেলেবেলার সুর। তখনও সে অন্ধ। কিন্তু
আশেপাশে অনেকগুলো চেনা গলা ছিল, ঘিরে রাখত – বাবা, মা, ভাই। ভাই কোথায় আছে
জানে না। বাবা-মা কোথায় আছে জানে। যাওয়া যায় না সেখানে।
মানুষটা ছাতাটা বন্ধ করল।
বৃষ্টির জোর আরো বেড়েছে। ক্ষেতের মাঝ বরাবর হাঁটতে শুরু করল। সামনে একটা বিশাল বড়
আমগাছ। ওর তলায় গিয়ে দাঁড়াল। খিদেটা বুঝছে। একবার ডাকল – মা।
বাজ পড়ল। কাছেই কোথাও। আরেকবার ডাকল, মা। আবার বাজ পড়ল,
তার কাছেই প্রায়। আবার ডাকতে যাবে, এমন সময়
চুপ করে গেল। ডাকবে না। সাড়া তো পেয়েছে। মরতে ভয় করে। মরলে যেন আরো অন্ধকার। লাঠিও
নেই। ধরবে কিসে? হাতটা শ্মশানে পুড়ে যাবে। শ্মশানে? কে নিয়ে যাবে। ভাগাড়ে পচে যাবে।
গাছটা জাপটে জাপটে কিছুটা উঠে
গেল। বৃষ্টির ছাঁট আসছে – অল্প। ছাতাটা গাছের নীচে রেখে
এসেছে। ছাতাটায় আসলে অনেকগুলো ফুটো। কয়েকটা আমপাতা চিবিয়ে খেল। আগেও খেয়েছে। ভিজে
পাতার গন্ধটা অন্যরকম। পিঠের উপর একটা কাঠবিড়ালী উঠল। ঘাড়ের কাছে এসে বসল।
হঠাৎ চমকে গিয়ে ঘুমটা ভাঙল।
বৃষ্টিটা ধরে গেছে। নামল গাছ থেকে। ছাতাটা নিল। মন্দিরে যাবে, পুরোহিত ভোগ রেখে দেয়, বাসি ভোগ। তিনটে কুকুর আর সে
খায়। একটা কুকুরের চারটে বাচ্চা হয়েছে। সে গিয়ে তাদের পুকুরে ফেলে এসেছে। অনেক
দূরে, মরেছে কিনা জানে না। এত লোক খেলে ভগবানই বা ভাত পায়
কোথায়? ভগবান তাই স্বপ্নে বলেছে তাকে, ওরে
ওদের পুকুরে দিয়ে দে...
মন্দিরে কাছে আসতেই হইচই
আওয়াজ শুনল। মন্দিরের মাথায় বাজ পড়েছে। পুরোহিত মারা গেছে। বাসি ভোগ নেই। লোকটা
জিভে ভিজে আমপাতার স্বাদ পেল। সে জিজ্ঞাসা করল, ভগবান পুড়ে গেছে?
কে যেন গালে ঠাস করে একটা চড় দিল। গালটা জ্বলে গেল। লোকটা হড়হড় করে
আমপাতাগুলো বমি করে দিল। এই প্রথম তার বমি হল। মায়ের শেষদিনগুলোর মত।
No comments:
Post a Comment