বাঙালি ভ্রমণ পিপাসু জাত। কালকূটের লেখায় আসে মানস ভ্রমণের কথা।
আমাদের অনেকেরই অভিজ্ঞতায় আছে মানস ভ্রমণের স্বাদ। ও দাঁড়ান, মানস ভ্রমণ বলতে আবার মানস সরোবর ভাববেন না কিন্তু। ভাগ্যে আপনারা হিন্দী
ভাষা সাহিত্যে তেমন দড় নন, নইলে কেউ কেউ আবার হয়ত
রামচরিতমানসের ভাবজগতে ভ্রমণ ধরে বসতেন। না না, আমাদের কথা
হল, মানসভ্রমণ নিয়ে। বাঙালি ইংরাজি-আমুদে জাত, তাই বলি মেন্টাল ট্যুরিজম।
বাঙালির অনেকগুলো মেন্টাল ট্যুরিস্ট স্পট আছে। বিশেষ বিশেষ দিনে বাস ছাড়ে,
অবশ্যই মানসলোকের বাস, বাঙালি কাতারে কাতারে
ওঠে, সেই সব মানসলোক পরিভ্রমণ করতে করতে আবেগাপ্লুত হয়,
পুলকিত হয়, গর্বিত হয়, তারপর
দিন ফুরালে আবার নিজের লোকে ফিরে আসে, আবার চিরপরিচিত
ঈর্ষা-কলহ শৃঙ্খলিত জীবনচর্যার আবর্তে দিনযাপন।
আজকের ট্যুরিস্ট স্পট – বিদ্যাসাগর। মানস ভ্রমণের
জন্য বাঙালিকূল রেডি। আবেগ গলার কাছে দলা পাকিয়ে। বাণীর বাণ 'সাঁ সাঁ' করে সোশ্যাল মিডিয়া ধাওয়া করছে। অবশ্যি
বাঙালির সোশ্যাল মিডিয়া মানেই ফেসবুক, টুইটারে ঠিক বাঙালি
নিজেকে জমাতে পারেনি। কেন পারেনি সে অন্যকথা, অন্য আলোচনা।
পাখিটাকে পছন্দ হয়নি? মাত্র ওইক'টা
শব্দে লিখতে আপত্তি? টু দ্য পয়েন্টে বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের
মধ্যে থেকে নিজের মতটুকু তুলে আনতে ব্যর্থতা বা অসমর্থ হওয়া? জানি না, তবে আমাদের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সেলিব্রিটিকূলও
সেখানে তেমন প্যালা জমাতে পারেননি দেখেছি। কষ্ট পেয়েছি। কারণ ভারতের অন্যান্য
জায়গার রথীমহারথী সব দেদার টুইট করছে আর হাজার হাজার ফলোয়ার হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে ইত্যাদি দেখছি তো। অবশ্য রাজনীতি মহলে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী
বেশ জনপ্রিয়, সে অন্য কথা।
তা আজকের এই 'বিদ্যাসাগর ট্যুরিস্ট স্পট'-এর মূল আকর্ষণ কি? দু'শো বছর।
তাঁর শিক্ষা-আচরণ-দর্শন-ভাবনার সাথে একটা বড় সংখ্যার যোগ? নাকি
শুধুই ঐতিহাসিক সেলিব্রিটির গর্ব করার মত একজনের একটা রাউণ্ড ফিগার অ্যাচিভমেন্টের
সেলিব্রেশান? জটিল প্রশ্ন।
প্রথমে দেখতে হবে, কেন ভ্রমণ? কারণ
হল, সেখানে আমরা যেতে পারি, থাকতে পারি
না। কেন থাকতে পারি না? সোজা কথা, আমাদের
হাঁফ ধরে, পা টনটন করে, বসার জায়গা
খুঁজে পাই না, আর যদিও বা পাই, শোয়ার
জায়গা তো পাই-ই না। ফলে ঘোরা হয়ে গেলেই অনেকগুলো বেলুন গর্বের উষ্ণ হাওয়ায় বাতাসে
ভাসিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কল্পনা করি সে বাতাসে উড়ে উড়ে
বিশ্বের সব দেশের আকাশে ছেয়ে যাচ্ছে, ক্রমে সবাই বাঙালিদের
জয়গান করছে, বিস্মিত হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাবতে ভাবতে
চোখে জল চলে আসে, ঘুম এসে যায়, ঘুমিয়ে
পড়ি। পরেরদিন যখন জাগি আবার সেই কঠোর অনাড়ম্বর নিষ্ঠুর একঘেয়ে বাস্তব, বিরক্তিকর জীবিকা-যাপন, প্রেমহীন হৃদয়ে প্রেমের
সরঞ্জামের পসরা সাজানো, অনুকম্পাহীন চেতনায় “আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে”, ক্লান্তি
লাগে। বিষন্নতার টিয়া আয়ুর খাঁচায় শেখানো বুলি বলে চলে, কর্মক্লান্ত
বাঙালি আরেকটা হুজুগ খোঁজে, একটু ইন্টেলেকচ্যুয়াল টাচ থাকলে
ভালো হয়।
মুশকিল একটা আছে, বাঙালি বোঝে না যে জগতে সব উৎকর্ষতাই
অভৌগলিক, ক্ষুদ্র কালের খণ্ডের বাইরে। যেমন মহাত্মা হয়ে যান
ভারতীয়, গ্লোবাল, গুজরাটি নন, সুভাষ থেকে রবীন্দ্রনাথ হয়ে থাকেন বাঙালি, কেবল
বাঙালিই। আমি কি হওয়া উচিত বলছি না, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী বলছি,
কারণ রবীন্দ্রনাথকে হাজার চেষ্টা করলেও শুধু বাঙালি করে রাখা বেশ
কঠিন। এই কথাটাই বেশ করে রবীন্দ্রনাথ ওনার বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উপর লেখা
প্রবন্ধগুলিতে উল্লেখ করেছেন। সে আর পুনরাবৃত্তি করছি না। আরো কি কি বলেছেন সে তো
আমরা জানিই, না জানা থাকলে একবার পড়ে নিলে হয়, আর ভুলে গিয়ে থাকলে একবার ঝালিয়ে নিলে হয়। মোদ্দা কথা যে কথাগুলো বলেছেন
তা সুখকর অবশ্যই নয়।
এখন এই ট্যুরিজমের লাভ কি? এ প্রশ্ন নির্বোধের
প্রশ্ন। একটা কথা বলি, একটা বই আছে – দ্য
লাস্ট গার্ল। নাদিয়া মুরাদের লেখা। কে এই নাদিয়া মুরাদ? যাকে
তালিবানেরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল আরো হাজার হাজার মেয়ের মত। তাকে বিক্রী করে।
উপর্যুপরি ধর্ষণের পর ধর্ষণ করে, তাকে যৌনদাসী বানানো হয়। সে
সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হয়, নিজের ভাগ্যের আর সাহসিকতার
জোরেই তা ঘটে। বর্তমানে বাকি মেয়েদের মুক্তির জন্য নানা জায়গায় ক্যাম্পেন করে
বেড়াচ্ছে সে, আলকায়দা'র নির্মম
অত্যাচারের কথা জানাচ্ছে। সে নোবেল পায়। অবশ্যই একটা স্বীকৃতি, তার কাজ এখনও অব্যাহত। (ও একটা কথা, এখানে বলে রাখি,
যারা বইটা অর্ডার করবেন বা পিডিএফ খুঁজবেন টানটান কিছু নিখুঁত
ধর্ষণের বর্ণনার জন্য, তাদের বলি, বইটা
আপনাদের জন্য না, এ কথা এই জন্যেই বলে রাখলাম, লেখাটা ফেসবুকে পোস্টিত হবে যেহেতু, আর এখানে বেশ
কিছু এমন সব মানুষ আছেন যাদের অকুন্ঠ উদার প্রেমের অত্যাচারে মেসেঞ্জারে অনেক
মহিলার কি যে করুণ অভিজ্ঞতা সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের উদ্দেশ্যেই বলা।)
বইটা পড়তে ভীষণ যন্ত্রণা হবে। আপনি কাঁদবেন, গলা
ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করবে, বালিশে মুখ গুঁজে নিজের গোঙানির
আওয়াজ হয়ত বা চেপে রাখতে চেষ্টা করবেন, তবু পড়বেন, শেষ অবধি পড়বেন, মেয়েটা পালাতে পেরেছিল এই
আশ্বাসটুকু আগে থাকতে জানা বলেই পড়বেন। ধর্মের অপব্যাখ্যা শুনে শিউরে উঠবেন। তবু
বিশ্বাস করতে চাইবেন মনুষ্যত্ব ছাপা অক্ষরের দায়ে বাঁচে না, বাঁচে
নিজের জোরে প্রাণের আকুতিতে, বিশ্বজনীন বিধানের আলোতে।
আজ যদি এই বইটা বিদ্যাসাগর পড়তেন, মানে মুরাদের
বইটা। আজ যদি প্রতিদিনের কাগজে মেয়েদের উপর অত্যাচারের কথা পড়তেন। কি হত? না, আপনি কল্পনা করতে পারবেন না। আমরা কেউই কল্পনা
করতে পারব না। কারণ আমাদের যে ওরকম একটা হৃদয় নেই। মানুষ তাই-ই চিন্তা করতে পারে
যা সে অনুভবে সত্য বলে জানে। একজন অত্যন্ত ক্ষুদ্র অনুভবী মানুষ বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা ইত্যাদি নিয়ে বড় বড় কথা বুনতে পারে, জীবনে
প্রতিফলিত হতে দেখা যায় না তার। যেমন একজন ফেসবুক মাদার টেরিজাসম মানুষ কথায় কথায়
আমায় বলেছিলেন, “কতজন কাজের লোক পুষব”? এই পোষার অনুভবটা সত্যি, তাই ভাষাটা অমন আড়ম্বরহীন
তার গলা থেকে উচ্চারিত হয়েছিল। তার নানা পোস্টের মত অত নরম কোমল কৃত্রিম ভাষার
ব্যবহার করতে হয়নি তাকে। আমি থমকেছিলাম। নিরুত্তর ছিলাম কিছুক্ষণ।
ভারতে একটা কথার মাহাত্ম্য খুব – সৎসঙ্গ।
শঙ্করাচার্যের লেখায় সেই সৎসঙ্গ আমাদের মুক্তি পর্যন্ত নাকি দিয়ে দিতে পারে। অনেকে
বিশ্বাস করেন মহাপুরুষদের এই জীবনীচর্চায় আমাদের সেইরকম একটা কিছু হওয়ার সম্ভাবনা
আছে। যদিও আমার বিশ্বাস হয় না, কারণ যে পরিমাণ মহাপুরুষ
আমাদের দেশে এযাবৎকাল জন্মেছেন, তাদের সঙ্গগুণে খুব একটা
পরিবর্তন কি বাঙালির ঘরের দেওয়াল ছাড়া বাঙালির জীবনে কিছু এসেছে? সেখানে নানা ছবির সম্ভার বেড়েছে এ সত্য বটে। “বাঙালি
মণীষীদের জীবনী” বইগুলোর বপুও বেশ তৃপ্তিকর, সে নিয়েও কোনো ক্ষোভ রাখার জায়গা বিধাতা দেননি। কিন্তু তারপর?
আর রইল বাঙলা ভাষার কথা। সে তো ক্রমে অস্তাচলের দিকে এগুচ্ছে। সে নিয়ে
মেলা আলোচনা হয়েছে, আর কিছু বলার নেই। তবে মানুষটার কাছে
বেড়াতে গিয়ে কি নিয়ে আসবেন বলুনদিকি?
একটাই কথা বলব – সহানুভূতি। সহানুভূতির দু'শো বছর হয় না। এই একটাই শব্দটিকে নিয়েই নীতি-বিদ্যা যাই বলুন। আপনার
বিশ্ববিদ্যালয় যত বড়ই হোক না কেন, আপনি যতই বিস্ময়কর
ব্যতিক্রমী চিন্তা করে জগতে তাক লাগাতে সক্ষম হোন না কেন, আপনি
যতই প্রগ্রেসিভ হয়ে ২০১৯ -এর এই এঁদো ভারতে বাস করে ৩০১৯ -এর মত চিন্তা করতে,
বিধান দিতে সক্ষম হোন না কেন? কিস্যু হয় না
ওতে, জাস্ট কিস্যু হয় না। কাগজের বানানো প্লেন কব্জীর জোরে
উড়ে এই মাটিতেই গোঁত্তা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। আপনি দেখেও দেখেন না, আপনি তখন আরেকটা প্লেন ওড়াতে ব্যস্ত, কাগজের প্লেন।
মানুষের সব নীতি, সব ভালো কথা, সব উন্নতি এই একটা কথাতেই আটকে যায়, সহানুভূতি। যদি
সেটিই না রইল তবে তো শুধুই বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ ট্যুরিস্ট স্পটই রইল, তাই না? আর এই ট্যুরিস্ট স্পটের সাথে ওই ট্যুরিস্ট স্পটের তুলনা করে ধুন্ধুমার
কাণ্ড বাঁধানো। ওতে কিস্যুটি হয় না। মনে রাখবেন মানুষটি বেঁচে থাকতেই আমাদের হাত
থেকে রক্ষা পেতে কার্মাটারে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছিলেন সাঁওতাল গ্রামে গিয়ে। আজ
দুশো বছর পর তিনি যে আবার বাবু হয়ে বসে আমাদের আদিখ্যেতার রকমসকম দেখবেন এমনটা আশা
করাই যায় না। তাঁর স্বপ্নের শিক্ষিত বঙ্গ ললনাদের সারা সন্ধ্যে অসামান্য ঘটনা ও
সংলাপ সজ্জিত সিরিয়াল ঘনঘটামুখী হয়ে থাকা, বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের
আহামরি শিক্ষানুকূল পরিবেশ ইত্যাদি ইত্যাদি দেখে, বলি
মুষ্টিমেয় ব্যাতিক্রমী উদাহরণে কি প্রাণ জুড়াবে মানুষটার আজ এই দুশো বছর পরে তার
বঙ্গ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে? জানি না।
তবু যদি নাগাল পাই, তবে কি চাইব বলুনদিকি? শুধু ওই উষ্ণ হৃদয়টার হাতমুঠো করে আনা পরশ। যেমন আরতির পর আঁচলে নেওয়া হয়।
তারপর জাগিয়ে রাখতে চেষ্টা করা সেই তাপটা, যদ্দিন জাগিয়ে
রাখা যায়।
"হে মহাজীবন, হে মহামরণ, লইনু
শরণ, লইনু শরণ..."
No comments:
Post a Comment