Wednesday, May 25, 2022

হৃদয়, অতিজাগতিক



মানুষের হৃদয় আসলে অতিজাগতিক। নইলে মানুষ কাঁদে কেন, সেকি শুধু নিজের জন্যে? প্রিয়জনের দুশ্চিন্তায় জেগে রাত কাটায় কেন? তাতে কি সুখ তার? কোনো সুখ নেই। কোনো স্বার্থ নেই। কারণ তার ইহজগতে গড়া শরীরে অতিজাগতিক হৃদয়কে নিয়ে বাঁচছে সে তো। সীমার মাঝে অসীমের সুর একে বলে কিনা জানি না। তবে মানুষই তো একমাত্র যে তার অতীতকে বুকে আঁকড়ে বলে, যেও না। হারিয়ো না। যে নশ্বর শরীর ছেড়ে চলে গেছে, সে কি করে কারোর চোখের জল হয়ে ফিরে আসে? তার বলে যাওয়া কথা কি করে আরেকজনের গলায় আবেগে বেজে ওঠে? কারণ মানুষই বলে, আমি ভুলিনি যে! এই জগতের মধ্যে আরেক জগতকে মানুষ ছাড়া আর কে সৃষ্টি কর‍তে পারে?

হৃদয় সুখী হতে চায়, এ বিশ্বাস করব যে তার উদাহরণ পাই না। হৃদয় সুখ, দুঃখের পরোয়া করে না। যদি সে সবল হয়। সে অভিযান চায়। অথবা আরো গভীরে বললে, সে অভিসারে যেতে চায়। অভিসারে গন্তব্যের থেকে অভিসারের পথের বর্ণনা কবির কল্পনায় বেশি। কারণ সে পথ দুর্গম, কষ্টবহ। তবু হৃদয় রাজী। কারণ সে অতিজাগতিক। সে এ জগতের মধ্যে আরেক জগতে যাওয়ার পথে পেয়েছে। সে সীমাকে অতিক্রম করার স্পর্ধা দেখিয়েছে।

এ অভিসার দেখেছি হাসপাতালের সামনে, শ্মশানের সামনে, রাস্তার মোড়ে, রেলের প্ল্যাটফর্মে। কষ্টের পর কষ্টের ধাক্কা। তবু সহ্য করে দিনের পর দিন লড়াই করে যাচ্ছে। আমার করুণা জন্মায় না। শ্রদ্ধা জন্মায়। জীবনকে কোনো একটা সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলতে কোনোদিন পারিনি। জীবন জগত আর পরাজগতের মধ্যে হৃদয় আর প্রয়োজনকে নিয়ে যে সমীকরণে চলে, তাকে এক কথায় বর্ণনা করবে কে? কেউ পারে না।

হৃদয়ের দাবী ভোরের সূর্যের মত। আজ মেঘে ঢাকে, কাল ঢাকে। কিন্তু একদিন না একদিন ভোরকে ছেড়ে দিতেই হয়। কত বড় বড় অভিমানী, অহংকারী মানুষকে দেখলাম শেষে নিজের হৃদয়ের কাছে মাথা নত করে বলে, আমি ভুল ছিলাম। যে পারে না, সে তো অসুর। তার কথা স্বতন্ত্র। তার ব্যাখ্যাও স্বতন্ত্র। মানুষ অসুরও নয়, দেবতাও নয়। তারা দুজনেই নিজেদের স্বভাবে সীমাবদ্ধ। মানুষই মুক্ত। তাই আমাদের শাস্ত্রে মানুষের জীবনকে পারে যাওয়ার তরী বলেছে। মানুষের জন্যেই এই হৃদয়ের তন্ত্রী। সেখানে ব্যথা যেমন আছে, আনন্দও আছে। ব্যথা চলার ছন্দে। আনন্দ চলার বেগে। দুটোই সত্য।

নিজের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। নিজেকে নিন্দা করা পাপ। এ অতি সত্য কথা। জীবন কেবল হিসাবে চলে না। জীবন শুধু প্রয়োজনে চলে না। মানুষ তবে হামাগুড়ি দিয়েই চলত আজীবন। সে যে স্পর্ধা দেখিয়ে দাঁড়িয়েছিল, আকাশের দিকে তাকিয়েছিল, সে প্রকৃতির তাড়নে না। হৃদয়ের স্পর্ধায়। শুধু শরীরে নয়। তার চিত্তও যখন সরীসৃপ হতে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, উঠে দাঁড়ায় নিজের অনুভবে, তখন ভীরু যে সে শিকল নিয়ে তেড়ে আসে। চোখ রাঙায়। কারণ শিকলে আর শাসানিতেই তার সবটুকু ভরসা। সে চিন্তা করতে পারে। কিন্তু অনুভব করতে পারে না। চিন্তার এক লোক থেকে আরেক লোকে নিয়ে যায় যে অনুভব সে শক্তি তার নেই। সাধুত্ব একটা সিদ্ধান্ত নয়, চিন্তার জাল নয়। সাধুত্ব একটা সহজ, সরল, সবল, উদার অনুভব। তা অতি জাগতিক। সে হৃদয়ে সত্য আলোকিত হয়, সিদ্ধান্তে না; শান্তিতে, জ্যোতিতে। সে অলৌকিক নয়। সে ভৌতিকও নয়। সে আনন্দময়। স্বতঃস্ফূর্ত। সে-ই জীবন। বাকি তো শুধু পুনরাবৃত্তি।

 

(ছবি Debasish Bose)

 

No comments:

Post a Comment