একটা লোকের দুটো মন ছিল। লোকটা দুটো মনকেই পুষতো। একটা ছিল পাজি মন, তার নাম ছিল কাদু। আর একটা ছিল উদার মন, তার নাম ছিল আদু। দুজনের খাঁচাই ছিল পাশাপাশি। লোকটা ভোরে উঠে দুজনকেই নাইয়ে খাইয়ে দিত নিজের হাতেই। আদর করত। সে চলে গেলেই কাদু নানাভাবে আদুকে উত্যক্ত করতে শুরু করত। আদু কিছু বলত না। চুপ করে শুনতো। আসলে সে কিই বা করবে, মালিক তো দুজনকেই ভালোবাসে। এক একদিন মালিক এসে দেখত আদুর গায়ে লাল আঁচড়ের দাগ। মালিক বুঝত কে করেছে। তাও কিছু বলত না। জানত আদু সহ্য করে নেবে।
তবে একটা মজার জিনিস আদু খেয়াল করত।
মালিক যখনই বাইরে যায়, বা কারোর বাড়ি যায়, কি নেমন্তন্ন বাড়ি যায়, তখন শুধুই
কাদুকে নিয়ে যায়। কাদু যখনই বাড়ি ফেরে ওর মুখে থাকে রক্তের দাগ লেগে, কি কারোর
মাথার চুল, কি কারোর পোশাকের ছেঁড়া অংশ। আর কাদুকে খুব হৃষ্টপুষ্টও দেখায়।
মালিক যখন আয়নার সামনে বসে, তখন পাশে
আদুকে নেয়। তার গায়ে হাত বোলায়, আদর করে। সে সময়ে কিছুতেই কাদুকে ঘরে ঢুকতে দেয়
না। কাদু খাঁচায় শুয়ে শুয়ে গর্জন করে, লাথি মারে দেওয়ালে দরজায়।
একদিন আদু গেল হারিয়ে। কি করে হারিয়ে গেল মালিক কিছুতেই বুঝেও
পেল না, আর তাকে খুঁজেও পেল না। এদিকে কাদুর বাচ্চা হবে। সে মালিককে বলল, আদু যখন
আসছেই না তখন ওর ঘরটা, থুড়ি, খাঁচাটা আমার নামে লিখে দাও দেখি… আমি একটু হাত পা
ছড়িয়ে থাকি!
মালিক তাই দিল। কিন্তু তারা খাঁচায়
থাকলে তো। এখন মালিকের সারা বাড়ি ঘরদোর কাদুর বাচ্চারা ঘোরাফেরা করে। এটা ভাঙে,
সেটা ভাঙে, এটা ছড়ায়, সেটা ছড়ায়। মালিকে নাজেহাল করে। মালিক এখন আর আয়নার সামনে
বসে না। বসলেই সব ক'টা বাচ্চা এসে তাকে ভেঙায়। মালিক ছাদে ওঠে না। ছাদে উঠলেই সবাই
মিলে এমন ডাকাডাকি করে জঙ্গল থেকে সব শেয়ালেরা এসে বাড়ির সামনে ভিড় জমায়। তারা এখন
প্রায়ই বাড়ির সামনেই বসে থাকে। জঙ্গলে যেতেই চায় না। ক্রমশ সব কেমন বদলে যেতে লাগল
মালিকের। তার খাওয়া, দাওয়া, পোশাক-আশাকের ঢং, সব বদলে যেতে লাগল।
কাদু আর তার বাচ্চারা সারাদিন তাকে
ঘিরে থাকে। আর ফিসফিস করে কি যে বলেই যায়, বলেই যায় মন্ত্রের মত। মালিকের শুনতে
শুনতে নেশা ধরে যায়। তার গায়ে মাথায় ঝিম ধরে যায়।
একদিন মালিকও হয়ে গেল বেপাত্তা।
বাড়িটা পুরো ফাঁকা। আসলে তো কেউ খেয়ালই করেনি। বাড়ির সামনে যে শেয়ালের দল বসে আছে,
সেই দলে একটা নতুন শেয়াল এসে জুটেছে। যে সারাদিন খালি ঝিমায়।
গল্প তো এখানেই শেষ। কিন্তু কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে তবে আদুর কি
হল? সে কোথায় গেল?
সে-ও আছে। সে দূর থেকে মালিকের অবস্থা দেখে আর দীর্ঘশ্বাস
ফেলে। আর ভাবে মালিক যে কেন তাকে নিয়ে কোনোদিন বেড়াতে বেরোয়নি, তবে তো সে মালিককে
এই পাহাড়ের উপর চূড়াটা দেখাতে পারত, যেখানে সব সময় রামধনু উঠে থাকে আকাশে, আর কি
চমৎকার সব ফুল ফুটে থাকে বাগানে! কিন্তু মালিক কি আর কোনোদিন আসবে এদিকে?
No comments:
Post a Comment