যতীন মাঠের মাঝখানে মাটির রাস্তায় দাঁড়িয়ে। খালি গা। কোমর থেকে একটা ছেঁড়া লুঙ্গি। দক্ষিণের আকাশ জুড়ে নামছে কালো মেঘ। যতীনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। সুখের ঘাম। কারণ যতীনের মুখে কোনো উদ্বেগ নেই। উদ্বেগহীন মানুষ সুখী মানুষ। ঘাম গড়িয়ে নামছে দুই কানের সামনে দিয়ে। যতীন আনমনা। তার দুটো গরুই মরেছে। বউ বাপের বাড়ি থেকে আর আসবে না বলেছে। বাচ্চাটা বাবা ছাড়া বড় হতে শিখে গেছে। যতীনের আগে অনেক ক্ষোভ ছিল। এখন নেই। গরীব মানুষ সে। কেন বউ থাকবে? ভালোবাসার কথা পেটে ভাত না থাকলে আসে না। ভাতের অভাব নেই। কিন্তু কিসের যেন অভাব আছে। বউ বলে শ্রী নেই তার। সত্যিই নেই। কোনোদিন ছিল না। অন্যের ঘরে শ্রী দেখে আগে বুক জ্বলত। এখন সহ্য হয়ে গেছে। সে যেন অন্যগ্রহের মানুষ। তার জন্য হিসাবনিকেশ মালিকের আলাদা। যে সকালে সূর্য ওঠায়, যে সূর্যকে আবার ধুতির আঁচলে মুছে ঘরে তোলে, সে তাকে বলেছে, তোর মুখে এক দলা ভাত আমি তুলে দেব যতীন। তুই ভাবিসনি। তুই শুধু মনে ক্ষোভ রাখিস না। ক্ষোভে আলো নিভে যায়। ক্ষোভ হল জানলার পাল্লা ভাঙা ঘরে ঝড়ের হাওয়া। সব ভেঙে যায়। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে মানুষ। কিচ্ছু করতে পারে না।
নিতাই দাদা ঘরে ফিরছে। ডাকল, ঘরে যাবি
না যতীন? ঝড় আসতাসে বাপ আমার… যা… ঘরে যা…
নিতাই গরু নিয়ে ফিরছে। পিঠে হাত রাখল
যতীন। গরুটার পিঠটা কেঁপে উঠল। তার আঙুলটাকে কি মাছি ভাবল গরুটা? খোদা কি আশ্চর্য সব
কাণ্ড করে রেখেছে। গরুর পিঠে মাছি তাড়ানোর ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। কই সে চাইলে তো আর
এমন পিঠের চামড়া কাঁপাতে পারে না। মালিক সব পারে। মালিকের পারার হিসাব করতে যায় মূর্খ
মানুষ। হিসাবে জাল ধরে। মানুষ শ্বাস আটকে মরে। আবার মালিক ছাড়িয়ে দেয় এসে, পাগল করে।
পাগল মানে জাল ছাড়ানো মানুষ।
নিতাইদা চলে গেল। মাঠে সে এখন একা।
বাড়ি বাড়ি শাঁখ বাজছে। সন্ধ্যে নামছে, এত এত মেঘ নিয়ে। একটা লণ্ডভণ্ড হবে। হোক। আজ
সে লণ্ডভণ্ডের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকবে। আকাশ থেকে নেমে আসবে মালিকের হাত। আজ কোলে তুলে
নেবে বলেছে মালিক। স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছে, যতীন, আজ মাঠ থেকে ফিরিস না রে। আমি আসব।
আকাশে তৈরি হল ঘূর্ণী। সঙ্গে বাজ পড়ার
আওয়াজ। যতীন হাতে তালি দিয়ে নেচে উঠল। যেন একদল সাঁওতাল এসে জুটেছে আকাশ জুড়ে। তারা
হাত ধরে ধরে নাচছে। যতীন নাচতে শুরু করল। সাঁওতালি নাচ সে জানে তো। তার বউও জানত। তারা
দু'জনেই নেচেছে সাঁওতালদের সঙ্গে।
যতীন মাঠে ঘুরে ঘুরে নাচছে। মাঠজুড়ে
নেমেছে তুমুল ঝড়। মাঠের ধারের দিকে নারকেল গাছগুলো একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়ছে। যতীন
বলল, এরই মধ্যে চড়িয়েছিস? মত্ত মাতাল সাঁওতালি যুবক ওরা। এ যে উৎসব! দূর থেকে কেউ ডাকল,
য… তী… ন……
কার ডাক? তাকে ডাকার মত কে আছে গ্রামে?
হয় তো চেনা কেউ তার। ডাকুক। আজ যে মালিক আসবে। আজ তো ফিরলে চলবে না তার।
যতীন হাঁটু মুড়ে বসল মাটিতে। হাতটা
সামনের দিকে মেললো। এসো মালিক… এসো, ঘাসে নামো। আমার পায়ে মাড়ানো মাটিতে আমায় ক্ষমা
করে নামো। আমায় তোমার ক্ষমায়, তোমার দয়ায় ধুইয়ে দিয়ে নামো।
বৃষ্টি নেমে এলো। যতীনের পরনের লুঙ্গি
লুটিয়ে আছে ঘাসে। ভিজে জড়সড়ো হয়ে সেটাকে দেখাচ্ছে যেন সদ্য জন্মানো মানুষের বাচ্চা
একটা। যতীন চোখ বন্ধ করে ডাকছে। এসো, এসো, এসো… প্রভু, আমার দিকে তাকাও, এই যে আমি,
তোমার বানানো মাটিতে, তোমার বৃষ্টিধারায় ভিজে স্নান করে যাচ্ছি। আমায় নাও। আমায় তোমার
ঘরে নিয়ে যাও। আমায় আমার করার মত কিছু কাজ দাও। আমায় এভাবে বসিয়ে রেখো না। আমায় ডাকো।
হঠাৎ খুব জোরে একটা বিদ্যুতের ঝলক
যতীনের কপাল চিরে নেমে গেল। যতীন, “আহা” বলে মাটিতে শুয়ে পড়ল। একটা দমকা হাওয়ায় ভিজে
ছেঁড়া লুঙ্গিটা তার গায়ের উপর পড়ল, তার লজ্জা ঢেকে। মালিকে তো লজ্জাই ঢেকে আসে, যতীনের
অনাবৃত অঙ্গ আবৃত অঙ্গকে বলল।
বৃষ্টির ঝাঁপি নিয়ে মেঘ গেল চলে। চাঁদ
ঝলমল করে উঠল আকাশের আয়নায়। একদল ভেজা পাখি ‘যতীন…যতীন…”, ডেকে চলে গেল। নারকেলগাছগুলো
হাওয়ার কানে ফিসফিস করে বলল, যাও ওকে ডাকো, বলো মালিক দাঁড়িয়ে যে।
যতীন শরীরটা নিংড়ে বেরিয়ে এলো। সারা
মাঠ দেখল মুক্তো ছড়িয়ে। চাঁদ তার সাদা হাতে ভেজা ঘাসের উপর বিন্দু বিন্দু মুক্তো বানাচ্ছে।
আকাশের তারারা অক্ষরের মত হয়ে স্তব লিখছে। বাতাসে সে স্তবের সুর ভাসছে। কই মালিক? যতীন
চোখ মেলে তাকালো।
অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে কেউ একজন।
যাকে জ্যোৎস্না স্পর্শ করছে না। যাকে আকাশ স্পর্শ করে দাঁড়িয়ে আছে। তারারা জোনাকির
মত তার সর্বাঙ্গে ঘিরে ঘুরছে।
যতীন বলল, আলোয় এসো… আমি যে অপেক্ষা
করছি…
সে অন্ধকার থেকে উত্তর এলো… তুমি আলোয়
এসো… বেরিয়ে এসো… আমি আর তুমি চিরকালই তো আলোয়… তুমি এলেই দেখবে, সব আলোর মুখে তোমার
চোখ মুখ বসানো… তুমি দেখছ আমায়… আমি দেখছি তোমায়… আলোয়…
No comments:
Post a Comment