Sunday, May 29, 2022

গদিও আছে, রাস্তাও আছে

বিশ্বাস ভেঙে যায় যাক। বিশ্বাস যদি আরাম কেদারা হয় তবে সে যাওয়াই ভালো। আরামের বিশ্বাস আর কাজের বিশ্বাস তো এক জিনিস নয়।

আরামের বিশ্বাস, কুঁড়ের বিশ্বাস, এসকেপিস্টের বিশ্বাস আর ভালোবাসার বিশ্বাস, খোঁজের বিশ্বাস এক নয়। কিন্তু দুটোকেই বিশ্বাস বলে চালানো যায়।

বিজ্ঞান শিক্ষা আর বিজ্ঞান থেকে শিক্ষা, এ দুটো আলাদা জিনিস। আমাদের স্কুলে, কলেজে পাঠ্যে বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা যেভাবে আছে, আমাদের বাড়িতে, পাড়ায়, সমাজে বিজ্ঞান থেকে শিক্ষা নেওয়ার চল সেভাবে এখনও নেই।

বিজ্ঞান থেকে শিক্ষার প্রধান কথা কি? তাকিয়ে দেখে শিক্ষা। চোখ বুজে শিক্ষা নয়। কোথায় তাকাবো? বাইরে না ভিতরে? যেদিকেই তাকাও একটা না একটা শিক্ষা আসবেই। বিজ্ঞানমনস্কতা কোনো বিষয় নয়। একটা চলনের ধারা।

ভিতরের দিকে তাকিয়ে মানুষ দেখেছিল, আমরা আমাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ, বিষাদ - ইত্যাদি সবকিছুকে এক অনুভবে অনুভব করছি। যে অনুভবের একটা নিজস্ব আমিবোধ আছে। আকাশে ভাসা মেঘের মত সব অনুভব আসছে যাচ্ছে। কিন্তু অনুভবকারী যাচ্ছে না। অনুভবকারী নিজেকে অনুভবের সঙ্গে না এক করে দেখলে, সব অনুভবকেই অভিজ্ঞতা হিসাবে জমিয়ে রাখতে পারে সে তার স্মৃতিতে। সেই স্মৃতির ধারাবাহিকরূপকে সে নাম দিল আত্মা। আত্মা মানে কোনো অতিজাগতিক বস্তু বলতে চাইল না, বলতে চাইল আমার অনুভবের, বোধের গভীরে যে বোধকারী একা সবটা সামলাচ্ছে, তার কথা। তাকে জল ভেজায় না, আগুনে পোড়ায় না, বাতাসে শুকায় না - এতটা কাব্যিকও হয়ে উঠল মানুষ। সে তো তাকিয়েই।

এখন এই থেকে যদি এমন ধারণা করা যায়, আমার মধ্যে একটা এমন বস্তু আছে যা অমর, সে বিশ্বাস আরামের বিশ্বাস। সে না তাকানো বিশ্বাস। স্বপ্নের ঘোর। ওতে মানুষ অকর্মণ্য হয়, বিকারগস্ত হয়। যে বিশ্বাসের ঘোরকে সে কিছুতেই ছাড়তে চায় না। কারণ তাতে তার চিত্তের আরাম যায়। কিন্তু কেউ যদি বলে তার নিজের গভীরে সব অনুভবের কেন্দ্রবিন্দুকে সে জানবে, সে তখন আর আরামের বিশ্বাসকে ধরে বসে থাকে না। সে চলার বিশ্বাসকে ধরে। চলার বিশ্বাসকে বলা যায়, প্রথম ধাপের বিশ্বাস। এর পরে তার আর কোনো কাজ নেই।

যেমন যে খেলার মাঠে ঢুকল, কি টিভির চ্যানেলে খেলা খুলে বসল, সে বিশ্বাস করেই শুরু করল যে সে খেলা তাকে আনন্দ দেবে। এরপর খেলা যত এগোলো, তার বিশ্বাস হয় টিকল, না হয় অন্য কিছু হল। যাই হোক, সে বিশ্বাস তার মধ্যে মোহ জন্মাতে দিল না। আমাদের শিক্ষা থেকে শুরু করে যাবতীয় যা কিছুর প্রথম ধাপটা একটা বিশ্বাসেই এগিয়ে নিয়ে যায়। পরে আসে নানা অভিজ্ঞতা।

আরামের বিশ্বাসে উদ্যমের কোনো অবকাশ নেই। আমি বাড়ি বসে বসেই, কোনো উদ্যম ছাড়া নিজেকে প্রবল জ্ঞানী একজন ঠাওরাতেই পারি। আমার গ্রামের কোনো একটা কুসংস্কারকে বিশ্বজনীন সত্যের বাহ্যিক বিকাশ ধরে নিয়ে নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমাতেই পারি। আরামের বিশ্বাসে এমনই যাদু সম্ভব। মোহ কিছু কালের জন্য আমার বোধকে আবৃত করে সে সুখে থাকার ব্যবস্থা করেও দেবে। নানা আতঙ্ক, সংশয় আমার চারদিকে ক্রমে ঘুণের মত বাসা করলেও তাকে 'নেই' বলে চালিয়ে দেওয়ার মত অজ্ঞতাও আমি জোগাড় করে নেব। শুধু চোখটুকু কিছুতেই খুলব না।

রামকৃষ্ণদেব বলতেন, পুকুরে মাছ আছে জেনে বসে থাকলেই তো হবে না, ছিপ বানাতে হবে, ধৈর্য ধরে বসে থাকতে হবে। জলে নড়াচড়া হবে। ছিপে টান পড়বে। আনন্দ হবে। তবে মাছের দেখা পাওয়া যাবে।

আরো গল্প বলছেন, কাঠুরের গল্প। যে জঙ্গলে কাঠ কাটতে আসে। তাকে এক ব্রহ্মচারী বলল, আরো এগিয়ে যাও। সে এগিয়ে যত গেল তত রূপা, সোনা, হীরের খনি পেলো। এও সেই কাজের বিশ্বাসের গল্প, আরামের বিশ্বাসের না।

যে বিশ্বাস আমার মাথায় ঘুমের বালিশ জোগায়, সে ওই আরাম হারাম হ্যায় ধর‍ণের বিশ্বাস। যে বিশ্বাস আমায় আমার চৌকাঠের বাইরে নিয়ে গিয়ে ফেলে, আমার চারদিককে অনিশ্চিত করে তোলে, সে-ই কাজের বিশ্বাস। বুদ্ধ যেদিন ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন, সেদিন তিনি জানতেন তিনি সত্যকে জানবেনই। এর মধ্যেই আসল কথাটা আছে, মানুষের মধ্যে এক প্রাথমিক বিশ্বাস আছেই, সে সত্যকে জানতে পারে। এমনকি ইন্দ্রিয়ের, মনের ছলনাকে এড়িয়ে গিয়েও সে জানতে পারে। সেই জন্যেই তার পরীক্ষানিরীক্ষা, গবেষণা আর ধ্যানের উপর এত আস্থা।

কাজের বিশ্বাস নিজের সমস্ত সত্তাকে এক জায়গায় এনে একমুখী করে তোলে। তার মনসংযোগ নিবিড়, অখণ্ড হয়। তার অন্বেষা তখন গভীরে প্রবেশ করার ছাড়পত্র পায় ধাপে ধাপে। সে সৃষ্টির আনন্দে ডোবে। সত্যকে উপলব্ধি করার আনন্দই সৃষ্টির প্রাথমিক আনন্দ, তাকে প্রকাশ করাটা তো গৌণ। উপলব্ধি হলে প্রকাশ আপনিই হয়। শুধু চর্চার অপেক্ষা সেখানে।

মানুষ তার দর্শনে, বিজ্ঞানে, শিল্পে-সাহিত্যে এই সত্যকেই জানার স্পর্ধা দেখিয়েছে। সেখানে ঝুঁকি যেমন আছে, আনন্দও তেমন আছে। সেখানে সহায় ওই একটাই সে-ই প্রথম দিনের, প্রথম পদক্ষেপের বিশ্বাস - সত্যকে জানার ক্ষমতা আমার আছে।

তবে সত্য অনন্ত। সবটুকু সত্যকে কেউ-ই কোনোদিন জানবে না। এই জানাকেই বলে অধ্যাত্মজ্ঞান। আমি যে জানি আমি সবটা জানব না, এই জ্ঞানকেই বলে প্রজ্ঞা। যা সত্য অর্থে মানুষকে স্থির করে। মুক্ত করে। নির্মোহ করে।

মানুষ তার মানসিক গঠন আর অভিব্যক্তির অধিকার অনুযায়ী সত্যকে নিজের মত করে পায়। নিজের সবটা দিয়ে যদি পায়, তবে তার সে পাওয়া তাকে বদলে দেয়। সে শিল্পী, দার্শনিক, কি বিজ্ঞানী হয়ে ওঠে। এক খণ্ড সত্যকে জানাই একটা জীবনের জন্য অনেক। কারণ সত্যকে জানা মানে, একটা তত্ত্বকে জানা নয়, সত্যকে জানা মানে একটা পথকে জানা। তাই যে মানুষ অণু-পরমাণু নিয়ে গবেষণা করছেন, কি কেউ কোনো রাগরাগিণী নিয়ে গবেষণা করছেন, তাদেরও বলার জো নেই যে আমি সবটা জেনে ফেলেছি। সেও বলে, আমি কিছুটা জেনেছি, তবে জানার পথ এখনও অনেক।

এইভাবেই সে আজীবন ছাত্র হয়। কাজের বিশ্বাস দিয়েই। আরামের বিশ্বাস দিয়ে নয়। এখন কোনটাকে আমি বেছে নেব, সে আমার সিদ্ধান্ত। জগতে দুই-ই আছে। বিশ্বাসের গদিও আছে, রাস্তাও আছে।

No comments:

Post a Comment